ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৪ এএম
স্থানীয় সরকার বিভাগ। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। গ্রামীণ সড়ক, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, নগর ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে দুর্যোগকালীন সহায়তাÑ সবক্ষেত্রেই এই খাতের ভূমিকা অপরিহার্য। এমন প্রেক্ষাপটে মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্য আগামী তিন অর্থবছরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে বরাদ্দ। তবে বাড়তি এই অর্থ বরাদ্দ কতটা কার্যকরভাবে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজে লাগবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজেট বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে এর কার্যকর বাস্তবায়ন। এজন্য তাদের মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
অর্থ বিভাগের জারি করা বাজেট পরিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগের মোট বাজেট ধরা হয়েছে প্রায় ৪২,৪৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে পরিচালন ব্যয় প্রায় ৬,৩৩১ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন ব্যয় ৩৬,১০১ কোটি টাকা। পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে এই বাজেট আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মোট বাজেট প্রাক্কলন করা হয়েছে ৪৪,৩২৫ কোটি টাকা, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে তা বেড়ে ৪৬,৯৮৪ কোটি টাকা এবং ২০২৮-২৯ অর্থবছরে প্রায় ৪৯,৮০৩ কোটি টাকায় পৌঁছবে। এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি প্রমাণ করে, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে।
উন্নয়ন বাজেটই মূল চালিকাশক্তি : স্থানীয় সরকার বিভাগের বাজেট কাঠামো বিশ্লেষণ করে জানা যায়, উন্নয়ন ব্যয়ই এখানে প্রধান ভূমিকা পালন করছে। মোট বাজেটের প্রায় ৮৫ শতাংশের বেশি উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা অবকাঠামো উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই উন্নয়ন ব্যয়ের আওতায় রয়েছেÑ গ্রামীণ সড়ক, ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ; হাটবাজার ও গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন; উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ; স্কুল কাম সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ; পানির উৎস স্থাপন, পাইপ ওয়াটার স্কিম, পানি শোধনাগার নির্মাণ; আর্সেনিক ঝুঁকি মোকাবিলা; স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়ন; সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপদ পানি সরবরাহ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন সম্ভব, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
পরিচালন ব্যয়ে সামাজিক নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কাঠামো : পরিচালন বাজেট মূলত প্রশাসনিক ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের জন্য ব্যয় করা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের ক্ষেত্রে এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ যায় ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি এবং গ্রাম পুলিশের বেতন-ভাতায়। বর্তমানে প্রায় ৪,৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের সম্মানী এবং ৪৫ হাজার ৮১০ জন গ্রাম পুলিশের বেতন এই খাত থেকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যয়ও এই বাজেটের আওতায় পড়ে। এটি একদিকে স্থানীয় প্রশাসনকে সচল রাখে, অন্যদিকে নাগরিকসেবা নিশ্চিত করতে ভূমিকা রাখে।
দপ্তরভিত্তিক বরাদ্দ এবং অবকাঠামো ও পানি খাতে জোর : উন্নয়ন বাজেটের দপ্তরভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। দেশের গ্রামীণ সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান দায়িত্ব এই সংস্থার ওপর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাচ্ছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই), যা পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন উন্নয়নে কাজ করে। এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা ওয়াসা নিরাপদ পানি সরবরাহে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ পাচ্ছে। সিটি করপোরেশনগুলোও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে বড় অঙ্কের অর্থ পাচ্ছে। এই বরাদ্দ কাঠামো থেকে সরকার পানি, স্যানিটেশন এবং অবকাঠামো উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
অগ্রগতি আছে কিন্তু চাহিদা আরও বেশি : ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগ বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ৫ হাজার ৪০০ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ; ২১ হাজার ৫০০ মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ; ১০৪টি হাটবাজার ও গ্রোথ সেন্টার উন্নয়ন; ৮ হাজার ৭৫০ কিলোমিটার পাকা সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ; ২০ হাজার মিটার ব্রিজ-কালভার্ট রক্ষণাবেক্ষণ; ৩৫টি উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ বা সম্প্রসারণ; ৫৫টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ। অর্জনগুলো নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিবেচনায় এসব অর্জন এখনও কম।
অর্থায়ন, সুশাসন ও সক্ষমতাই বড় চ্যালেঞ্জ : সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের সামনে বেশ কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যা বাজেট বাস্তবায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ এখনও সীমিত। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব রাজস্ব আয় কম, ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরতা বেশি। তৃতীয়ত, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় অনেক প্রকল্প দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। চতুর্থত, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা এবং দুর্নীতির ঝুঁকি একটি বড় সমস্যা। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ এবং মান নিয়ন্ত্রণের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষে ব্যাহত হতে পারে এলজিইডির লক্ষ্য : স্থানীয় সরকার বিভাগের উন্নয়ন বাজেটের সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এলজিইডি। কিন্তু গত ২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির একটি পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে সদর দপ্তর থেকে মাঠ পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে।
জানা গেছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে দীর্ঘ স্থবিরতার সুযোগে একটি পক্ষ প্রকল্পের কাজে গতি আনার বিষয়টি সামনে এনে নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্য পদে পদায়নের তোড়জোড় শুরু করে। গত ২ এপ্রিল ১৯৭ জন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলীকে নির্বাহী প্রকৌশলীর শূন্য পদে চলতি দায়িত্ব হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে গ্রেডেশন বা জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পর গত ২১ এপ্রিল নতুন করে গ্রেডেশন লিস্ট প্রকাশ করা হয়েছে, যা নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। গ্রেডেশন লিস্ট চূড়ান্ত হওয়ার আগেই কিসের ভিত্তিতে পদোন্নতির তালিকা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংক্ষুব্ধ একাধিক পক্ষ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক কর্মকর্তা। গতকাল বুধবার বিষয়টি নিয়ে একাধিক প্রকৌশলী নিজেদের মধ্যে কথাও বলেছেন। চলমান ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রতিষ্ঠানটির কাজের গতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
এলজিইডির মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতি নিয়ে যে ক্ষোভ-অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছে, তা প্রকল্প বাস্তবায়ন তথা গ্রামীণ উন্নয়নের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তাকে ঝুঁকিতে ফেলবে বলে মনে করেন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সদস্য ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাÑ টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন : স্থানীয় সরকার বিভাগ টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কয়েকটি পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেÑ আরসিসি ও সিসি সড়ক নির্মাণ বৃদ্ধি; আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা; জলাবদ্ধতা নিরসন; সুপেয় পানির শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা; স্যানিটেশন সুবিধা সম্প্রসারণ; জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ। এ ছাড়া উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগত মান নিশ্চিত করতে তথ্যপ্রযুক্তি-নির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।
পরিমাণ নয়, গুণগত উন্নয়নই এখন লক্ষ্য : এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব ড. মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমান সরকার এখন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে গুণগত উন্নয়ন নিশ্চিত করা, যাতে মানুষ বাস্তব সুবিধা পায়।’ তিনি বলেন, ‘বাজেট বৃদ্ধি অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এর কার্যকর বাস্তবায়ন। এজন্য তাদের মন্ত্রণালয় প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।’ দুর্নীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের অবস্থান জিরো টলারেন্স। প্রকল্প মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি টাকা সঠিকভাবে ব্যয় হয়।’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। তাই সরকার জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।’
বাস্তবায়নই সাফল্যের চাবিকাঠি : স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় সরকার বিভাগের বাজেট বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনবল ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহিতা। গ্রাম থেকে শহরÑ প্রতিটি স্তরে সেবার মান উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনাও জরুরি।’
এই প্রসঙ্গে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) সদস্য ও স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. ফেরদৌস আরফিনা ওসমান গতকাল বলেন, ‘অবশ্যই বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও বাড়াতে হবে।’ সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সুপারিশ করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন দরকার সেসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’