লোডশেডিং
দীপক দেব
প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৮ এএম
তীব্র গরমে চাহিদানুপাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ার কারণে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বৈশাখের দ্বিতীয় সপ্তাহ আসতে না আসতেই দেশের ৯টি জেলার ওপর দিয়ে মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। এ অবস্থা চলবে আগামী শুক্রবার পর্যন্ত। রাজশাহী, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, ঢাকা, ফরিদপুর, খুলনা, যশোর, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়ার ওপর দিয়ে বইছে এ তাপপ্রবাহ। এমন প্রেক্ষাপটে তীব্র গরমে চাহিদানুপাতে বিদ্যুৎ উৎপাদন না হওয়ার কারণে দেশজুড়ে বেড়েছে লোডশেডিং।
রই মধ্যে এটি প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন, শিল্প-কারখানা ও কৃষি খাত। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ থাকছে না দীর্ঘ সময় ধরে। কোনো কোনো গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং হচ্ছে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত। এ পরিস্থিতিতে কৃষকরা চোখে অন্ধকার দেখছেন। মাথায় হাত পড়েছে শিল্পোদ্যোক্তা ব্যবসায়ীদের। অন্যদিকে পড়ালেখা ব্যাহত হচ্ছে বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের।
পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী গতকাল মঙ্গলবার শুরুর প্রথম ঘণ্টায় অর্থাৎ রাত ১টায় সারা দেশে ১ হাজার ৮৫৬ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। এই সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট; যার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ৪৫৭ মেগাওয়াট। একই দিন দুপুর ১২টায় ১৫ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদার বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১৪ হাজার ৬৯ মেগাওয়াট। অর্থাৎ তখনও ১ হাজার ৪৬২ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। জ্বালানি ও গ্যাস নিয়ে চাপে থাকা বিদ্যুৎ খাত চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনজনিত ঘাটতির কারণে লোডশেডিং ও তীব্র গরমে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ মেনে এসেছে। লোডশেডিংয়ের ফলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। গতকাল থেকে সারা দেশে শুরু হওয়া এসএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, লোডশেডিংয়ে তাদের লেখাপড়া চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে সময়মতো সেচ দিতে না পারার কারণে কৃষক পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। সেচনির্ভর বোরো ধানের ফলনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এদিকে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ শিল্পাঞ্চলগুলোতেও দিনে ৫-৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। যার ফলে কারখানার উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে বলে অভিযোগ করছেন শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীরা।
মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে অবস্থিত ১৩৯টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২৯ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট। তবে বছরের পুরো সময় এ সক্ষমতার অর্ধেক অলস বসে থাকে।
ঘাটতি রয়েছে চাহিদা ও জোগানে
বেশকিছু বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকা অথবা সক্ষমতার চেয়ে কম উৎপাদন করায় সরবরাহের ঘাটতি আরও বেড়েছে। এতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের ২৮টি কেন্দ্র ও প্রধান ইউনিটের মধ্যে ৯টিই বন্ধ। রাউজান ও জুলধার প্রধান ইউনিটগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বেশ কয়েকটি ইউনিট বর্তমানে বন্ধ। খুলনায় ১০টি কেন্দ্রের মধ্যে অন্তত ৬টি বর্তমানে বন্ধ। এর মধ্যে খুলনা (৩৩০ মেগাওয়াট), ফরিদপুর (৫০ মেগাওয়াট), নর্থ ওয়েস্ট পাওয়ার কোম্পানি (২২৫ মেগাওয়াট), মধুমতী (১০০ মেগাওয়াট) ও রূপসা (১০৫ মেগাওয়াট) উল্লেখযোগ্য। ফলে এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে। অন্যদিকে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সিলেটে তিনটি কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ। এখানে মোট চাহিদা প্রায় ৪৭৭ মেগাওয়াট (বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবির অধীনে ১৭০ মেগাওয়াট ও পল্লী বিদ্যুতের অধীনে ৩০৭ মেগাওয়াট)। এর বিপরীতে সিলেটে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে যথাক্রমে ১৩০ ও ১৬৭ মেগাওয়াট। ফলে বড় ধরনের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার কারণেই এই কেন্দ্রগুলো বন্ধ রয়েছে। এক্ষেত্রে এলএনজি ও জ্বালানি আমদানিতে সমস্যার পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটিও কাজ করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে লোডশেডিংয়ের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
জনজীবন বিপর্যস্ত
ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার এক পৌরসভা ও ১৮টি ইউনিয়নের নাগরিকরা। তীব্র গরমের প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎবিভ্রাটে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা। গতকাল থেকে শুরু হওয়া এসএসসি, দাখিল ও সমমনা পরীক্ষার আগের রাত সোমবারও এ পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল। চকরিয়া উপজেলার কাকারা ইউনিয়নের জয়নব বেগমসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের নাগরিকদের অভিযোগ, বিদ্যুৎ আসা-যাওয়ার এই চক্রে ঘুম, কাজ, পড়াশোনাÑ সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের অবস্থা খুবই চরম। ঠিকমতো বিদ্যুৎ না থাকায় উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানের নিত্যদিনের কাজেও ঘটছে বিপত্তি। দেখা দিয়েছে বিপত্তি, যার দরুন এসব প্রতিষ্ঠানে উদ্বেগ ও ভোগান্তি সৃষ্টি হচ্ছে দিন দিন।
চকরিয়ার পিডিবি সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানিয়েছেন, জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ সংকটে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের আদানি প্লান্ট ও আশুগঞ্জের একটি বড় কেন্দ্রসহ একাধিক কেন্দ্র যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চকরিয়া পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম এমরান গণি বলেন, “জাতীয় গ্রিড লাইন থেকে সরবরাহ কম পেলে লোডশেডিং করতেই হয়। সম্প্রতি এ কারণেই চকরিয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে।”
অন্যদিকে জ্বালানি সংকট ও তাপপ্রবাহের সঙ্গে ভ্যাপসা গরমের মধ্যে চুয়াডাঙ্গা জেলাজুড়ে শুরু হয়েছে ঘন ঘন লোডশেডিং। চাহিদার তুলনায় গড়ে ৩৫ শতাংশ থেকে ৪৬ শতাংশ বিদ্যুতের ঘাটতি। প্রায় ১ ঘণ্টা পরপর লোডশেডিং হচ্ছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ। পৌর এলাকার বাসিন্দা রিফাত রহমান, আতিয়ার রহমান, আজাদ হোসেন জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে মিলিয়ে ১২ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। একবার বিদ্যুৎ গেলে ১ ঘণ্টার আগে ফেরে না।
সেচ নিয়ে চিন্তায় কৃষক
বিদ্যুৎ ঘাটতি ও লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতে। সেচনির্ভর চলমান বোরো মৌসুমে লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে ফসলের ফলন নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। চুয়াডাঙ্গার কৃষক জামাল হোসেন, আসান আলী প্রমুখ বলেন, ‘সেচ পাম্পের আওতায় ধান চাষ করেছি। ইরি-বোরো ধান কাটার সময় ঘনিয়ে এলেও সেচ সংকটে আমরা দুশ্চিন্তায় পড়েছি। বিশেষ করে বোরোর জন্য সেচ জরুরি হলেও বিদ্যুৎ না থাকায় তা সম্ভব হচ্ছে না। ভোল্টেজ ওঠানামার কারণে সেচযন্ত্রও নষ্ট হচ্ছে।’ জেলার বিভিন্ন পৌর এলাকার বাইরে যেসব এলাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ সরবরাহ করে, সেসব জায়গায় লোডশেডিংয়ের অভিযোগ সবচেয়ে বেশি।