× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সুদ-ভর্তুকির চাপে নতুন বাজেট

আরমান হেকিম

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৩ এএম

ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং নগদ ঋণ- এই চার খাতে আটকা পড়ছে বাজেটের বড় অংশ।

ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং নগদ ঋণ- এই চার খাতে আটকা পড়ছে বাজেটের বড় অংশ।

প্রায় ২০ বছর পর বাজেট করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটকে ঘিরে জনগণের প্রত্যাশা বড়, তবে পুরনো কাঠামো থেকে বের হওয়ার সুযোগ সীমিত। যার ফলে ঋণের সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং নগদ ঋণÑ এই চার খাতে আটকা পড়ছে বাজেটের বড় অংশ।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রথমিক হিসাব অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই চার খাতে মোট ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের প্রাথমিক আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে মোট বাজেটের তিন ভাগের এক ভাগের কাছাকাছি অর্থ ‘বাধ্যতামূলক ব্যয়ে’ আটকে যাচ্ছে। যেগুলোর পরিবর্তন করার সুযোগ তুলনামূলক কম। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই চার খাতে ব্যয় ছিল প্রায় ২ লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সেই তুলনায় আগামী বাজেটে প্রায় ৮ শতাংশ ব্যয় বৃদ্ধি সরকারের সামগ্রিক আর্থিক চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের রাজস্ব, মুদ্রা ও বিনিময় হার সংক্রান্ত সমন্বয় পরিষদের বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। 

বাজেট প্রণয়নে চাপের কথা পরোক্ষভাবে স্বীকার করেন অর্থমন্ত্রীও। গত শুক্রবার সংসদে তিনি বলেন, নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম বাজেট ঘিরে জনগণের ব্যাপক প্রত্যাশা রয়েছে। একই সঙ্গে আমরা আশা করি, অতীত থেকে পাওয়া নানা সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও জনগণ বিবেচনায় নেবেন।

অর্থ বিভাগের অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। তেল ও এলএনজির দামের ওঠানামা, সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সৃষ্ট ক্রমবর্ধমান ভর্তুকি অর্থনীতিতে ব্যাপক চাপ বাড়াচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সার খাতে ভর্তুকির ওপর।

কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় দ্বিগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। ফলে ভর্তুকির হিসাব এখনই একটি পরিবর্তনশীল ও অনিশ্চিত কাঠামোর মধ্যে রয়েছে। প্রাথমিক বাজেট প্রণয়নে তাই ভর্তুকি খাতে সতর্ক অবস্থান নেওয়া হলেও বৈশ্বিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে এই হিসাব দ্রুত বদলে যেতে পারে।

দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতাও বাজেটের ওপর চাপ কমাচ্ছে না। ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি সরকারের সুদ পরিশোধ ব্যয়কে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি না এলে এবং সুদের হার উচ্চ পর্যায়ে থাকলে সুদ ব্যয় আরও বাড়বে, যা পুরো বাজেট কাঠামোকে আরও অনমনীয় করে তুলবে।

আগামী বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। দেশীয় উৎস থেকে ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তুলনামূলকভাবে বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা আগের বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি নতুন ঝুঁকির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই কাঠামোর মধ্যে সবচেয়ে বড় চাপ তৈরি করছে সুদ পরিশোধ খাত। আগামী বাজেটে শুধুমাত্র সুদ বাবদ ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ ২৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই ব্যয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি বাজেটকে ধীরে ধীরে অনমনীয় করে তুলছে, যেখানে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে নমনীয়তা সীমিত হয়ে আসছে।

ভর্তুকি ও প্রণোদনা খাতেও চাপ কমছে না। বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, সার খাতে ২৭ হাজার কোটি টাকা, এলএনজি খাতে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করছে সরকার। সব মিলিয়ে ভর্তুকি, প্রণোদনা এবং নগদ ঋণ খাতে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার কোটি টাকা। এই ব্যয় কাঠামো স্থির নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তনশীল।

অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, চলতি অর্থবছরের মার্চ থেকে জুন সময়কালে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির কারণে অতিরিক্ত প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি চাপ তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ ঝুঁকির একটি বাস্তব উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী বাজেটে ভর্তুকি চাপ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

প্রণোদনা খাতে তুলনামূলকভাবে বড় কোনো কাঠামোগত পরিবর্তন না এলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে প্রবাসী আয়ে প্রণোদনা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এই খাতে ৮০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। রেমিট্যান্সকে অর্থনীতির স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে ধরে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় সংকট আয় বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং বাধ্যতামূলক ব্যয়ের অনিয়ন্ত্রিত সম্প্রসারণ। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরীর মতে, সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সীমিত হলেও ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিন্যাস না করলে দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক ভারসাম্য আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।

সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, আগের সরকারের তৈরি অর্থনৈতিক সংকটের বোঝা নিয়ে বিএনপি এবার বাজেট দিতে যাচ্ছে। এর মধ্যে নতুন করে শুরু হয়েছে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের ভয়াবহতা। ফলে আগামী বাজেটকে সংকটকালীন বাজেট বলা যেতে পারে। তাই বাস্তব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে সরকারের উচিত হবে অগ্রাধিকার ঠিক করা। এ জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট ১০টি পদক্ষেপ নিয়ে একটি স্পষ্ট পথরেখা থাকা উচিত।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা