× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

জ্বালানি তেল সংকটের নেপথ্যে অব্যবস্থাপনা

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৪ এএম

জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে অপেক্ষা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

জ্বালানি তেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে অপেক্ষা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের মাসিক চাহিদা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন। সেখানে গত মার্চ মাসে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৫৪ হাজার টন, যা মাসিক চাহিদার তুলনায় ৭৯ হাজার টন বেশি। তবুও ফিলিং স্টেশনগুলোতে গিয়ে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে গ্রাহকদের। চাহিদার তুলনায় বেশি আমদানি থাকা সত্ত্বেও এমন সংকট সৃষ্টি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে- এই অতিরিক্ত তেল কোথায় গেল?

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আমদানি বেশি হলেও সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে বিপিসির অব্যবস্থাপনার কারণে। তাদের মতে, সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে এমন হাহাকারের পরিস্থিতি তৈরি হতো না। বিপিসি হয়তো ফিলিং স্টেশনগুলোতে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করেনি, অথবা যথাযথভাবে মনিটরিং করা হয়নি। এর ফলে অসাধু চক্র তেল মজুদ করার সুযোগ পেয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ক্যাবের সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সরকার বলছে দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আমদানির তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ মাসেও আমদানি বেড়েছে। তবুও জ্বালানি তেলের যে সংকট বা হাহাকারের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা তিনি অব্যবস্থাপনার ফল বলেই মনে করেন।

তিনি বলেন, হাহাকার সৃষ্টির মূল কারণ হলো ফিলিং স্টেশনগুলো সার্বক্ষণিক খোলা না থাকা। যদি স্টেশনগুলো সার্বক্ষণিক খোলা থাকত, তাহলে গ্রাহকরা নিজেদের সুবিধামতো সময়ে গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে পারতেন। স্টেশনগুলো বন্ধ থাকার অর্থ হয় হয়তো পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা হয়নি, অথবা সরবরাহ থাকলেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে সেই তেল ফিলিং স্টেশনে পৌঁছায়নি কিংবা মজুদ হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, কোন পাম্পে কী পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছে—এই তথ্য প্রকাশের দাবি তারা জানিয়েছিলেন, কিন্তু বিপিসি তা প্রকাশ করেনি। বিপিসি বলছে, গত বছরের মার্চ মাসে যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছিল, এবারও একই পরিমাণ সরবরাহ করা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়— এই তেল গেল কোথায়?

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চÑ এই তিন মাসে ডিজেল, জেট ফুয়েল, বেইজ অয়েল, ইঞ্জিন অয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ১২ লাখ ২৮ হাজার ২৩৮ টন। এর মধ্যে ডিজেল আমদানি হয়েছে ৮ লাখ ৫৬ হাজার ৬২৮ টন এবং জেট ফুয়েল আমদানি হয়েছে ১১ হাজার ৫৭২ টন। 

অন্যদিকে চলতি বছরের একই সময়ে (জানুয়ারি–মার্চ) আমদানি হয়েছে ১৪ লাখ ৫৪ হাজার ৫৬০ টন জ্বালানি তেল। এর মধ্যে ডিজেল আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮০ টন এবং জেট ফুয়েল আমদানি হয়েছে ২১ হাজার ৯২৬ টন। এই হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মোট জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার ৩২২ টন, যা প্রায় ১৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে এককভাবে ডিজেল আমদানিই বেড়েছে ১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৫২ টন এবং জেট ফুয়েল বেড়েছে ১০ হাজার ৩৫৪ টন।

শুধু মার্চ মাসের জ্বালানি তেল আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করেও দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে ডিজেল, জেট ফুয়েল, বেইজ অয়েল ও ইঞ্জিন অয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে। রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দেশে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৮৬ টন। এর মধ্যে ডিজেল আমদানি হয়েছে ৩ লাখ ৩১ হাজার ৮১০ টন।

অন্যদিকে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি হয়েছে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৭১৮ টন। এর মধ্যে ডিজেল আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৬ টন। এই হিসাবে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের মার্চ মাসে জ্বালানি তেল আমদানি বেড়েছে ১ লাখ ২৪ হাজার ৬৩১ টন, যার মধ্যে শুধু ডিজেল আমদানিই বেড়েছে ১ লাখ ২২ হাজার ৮২৮ টন।

আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ডিজেল আমদানি বাড়লেও এই সময়ে সামগ্রিকভাবে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত ডিজেল আমদানি হয়নি। ফলে গত তিন মাসে জ্বালানি তেল আমদানি কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও এর ইতিবাচক প্রভাব বাজারে দেখা যায়নি; ফিলিং স্টেশনে গিয়ে এখনও তেল পাচ্ছেন না গাড়ির মালিকরা।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেলের দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার ৫০০ টন। সে হিসাবে তিন মাসে (প্রায় ৯০ দিনে) মোট চাহিদা দাঁড়ায় ১১ লাখ ২৫ হাজার টন। এর বিপরীতে ওই সময়ে ডিজেল আমদানি হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৪৮০ টন। একই সময়ে জেট ফুয়েল আমদানি হয়েছে ২১ হাজার ৯২৬ টন। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তিন মাসে চাহিদার তুলনায় কিছুটা কম ডিজেল আমদানি হলেও এককভাবে মার্চ মাসে চাহিদার চেয়ে বেশি আমদানি হয়েছে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের মাসিক চাহিদা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টন, সেখানে গত মার্চ মাসে আমদানি হয়েছে ৪ লাখ ৫৪ হাজার ৬৪৬ টন।

বাংলাদেশ ট্রাক, কাভার্ডভ্যান অ্যান্ড ট্রান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসের শুরুতে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফিলিং স্টেশনে গিয়ে এখনও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। একই ধরনের ভোগান্তি থাকলেও এর মধ্যে তেলের দাম ১৫ টাকা বেড়েছে বলে তিনি জানান।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তারা এখনও চাহিদা অনুযায়ী তেল সরবরাহ পাচ্ছেন না। বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রী, জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বিপিসি চেয়ারম্যানকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এরপর পর্যাপ্ত তেল সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে। সেখানে তাদেরকে যেসব ডিলারের কাছ থেকে তেল সংগ্রহ করা হয়, সেই তালিকা দিতে বলা হয়েছে। সে অনুযায়ী গতকাল সোমবার নৌ বাণিজ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।

পারভেজ আহমেদ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী তেল না পাওয়ায় লাইটার জাহাজগুলো গড়ে তিন থেকে ছয় দিন অলস পড়ে থাকতে হচ্ছে। এতে বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (বড় জাহাজ) থেকে পণ্য খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম বেড়ে যাচ্ছে এবং আমদানিকারকদের ব্যয়ও বাড়ছে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের ওপর পড়ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি বেশি হওয়ার পরও গ্রাহকরা কেন চাহিদা অনুযায়ী তেল পাচ্ছেন নাÑ এ বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানকে মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

পরে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব মুনির হোসেন চৌধুরীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আগে সংকট থাকলেও সোমবার থেকে তা অনেকটা কমেছে। এখন ফিলিং স্টেশনে গিয়ে গ্রাহকরা চাহিদামতো তেল সংগ্রহ করতে পারছেন।

মার্চ মাসে আমদানি বেশি হওয়ার পরও কেন সংকট তৈরি হয়েছিল— এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্চ মাসে আমদানি বেশি হয়েছেÑ এমন তথ্য তার কাছে নেই।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা