× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে নতুন কৌশলে সরকার

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব

প্রকাশ : ২১ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩২ এএম

মোটরসাইকেলের জ্বালানি শেষ হওয়ায় হেঁটে পাম্পের পথে এক ব্যক্তি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

মোটরসাইকেলের জ্বালানি শেষ হওয়ায় হেঁটে পাম্পের পথে এক ব্যক্তি। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশে চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মন্ত্রিসভার সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে গৃহীত এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করাই এখন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে এ-সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন (ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল) জমা দিতে বলা হয়েছে। আগামী রবিবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রতিবেদন উত্থাপন করার কথা।

প্রসঙ্গত, সরকারের গৃহীত নীতিনির্ধারণীমূলক সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মূল্য সমন্বয় এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কঠোর বার্তা

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকারের অবস্থান আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠোর। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এ ব্যাপারে একাধিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেসবের মধ্যে রয়েছেÑ অফিসে শেয়ারড পরিবহন ব্যবহার, অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ রাখা, এসির তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রিতে সীমাবদ্ধ রাখা, গাড়িতে এসির ব্যবহার কমানো ও অপ্রয়োজনীয় প্রটোকল পরিহার করা। এছাড়া দেশব্যাপী তিন মাসের জন্য আলোকসজ্জা পরিহারের নির্দেশনাও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা গেলে বাস্তবে বিপুল বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সামসুল আলম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কৃচ্ছ্রসাধনের এই পদক্ষেপগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বিদ্যুৎ সাশ্রয় সম্ভব। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকির ব্যবস্থা থাকাও খুব জরুরি। এতে করে সব ক্ষেত্রেই অপচয় রোধ করা সম্ভব।’

সাশ্রয়ের লক্ষ্য ৩১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

বিদ্যুৎ বিভাগ যে সমন্বিত কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছে, তাতে প্রতিদিন প্রায় ৩১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে কয়েকটি খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ কৃষিতে সেচ কার্যক্রম অব্যাহত রাখা; সার উৎপাদন ও বিতরণ নিশ্চিত করা এবং শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ বজায় রাখা। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একদিকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখাÑ দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ। সরকার এই ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে, সেটিই সবচেয়ে যুক্তিযুক্ত পথ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম. তামিম সোমবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পক্ষ থেকে যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে তা নিঃসন্দেহে ভালো। কারণ কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে, কোথায় শৃঙ্খলার ঘাটতি; সেগুলো চিহ্নিত করতে এই উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। এখন দেখার বিষয় এটি কতটুকু কার্যকর করা যাবে।’

মূল্য সমন্বয়ে উচ্চপর্যায়ের কমিটি

চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে বিদ্যুতের পাইকারি ও খুচরা মূল্য সমন্বয়ের বিষয়টি সামনে এসেছে। এ লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির দায়িত্ব হচ্ছেÑ বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ের বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব মূল্যায়ন, ভর্তুকি কাঠামো পুনর্বিবেচনা ও টেকসই মূল্য নির্ধারণের প্রস্তাব তৈরি। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। মন্ত্রিসভার সম্মতি পেলে প্রস্তাব পাঠানো হবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি)।

মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য তৈরি বিদ্যুৎ বিভাগের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে এই খাতে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় সাড়ে ৫৬ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি কমাতে তিনটি বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রস্তাব অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে ৫ হাজার থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ভর্তুকি কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি লাইফলাইন গ্রাহক বাদে অন্য আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

গবেষক ও অধ্যাপক ড. শহীদুজ্জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি এড়ানো কঠিন। তবে তা যেন ধাপে ধাপে এবং লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকির মাধ্যমে করা হয়। কারণ জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি জনজীবনের ওপর প্রভাব ফেলে। এক্ষেত্রে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।’

নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে জোর দিচ্ছে নতুন কমিটি

সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর জোর দিচ্ছে। এই খাতে বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ হবে। এর জন্য নতুন নীতিমালা, বিনিয়োগ সহজীকরণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব মডেল চালু করা হচ্ছে। গঠন করা হয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় কমিটি। যার কাজ হচ্ছে বিনিয়োগ সহজীকরণ, নীতি ও আইনি কাঠামো সংস্কার, প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করা ও বাস্তবায়ন তদারকি। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা অনেক বেশি, কিন্তু নীতিগত জটিলতা বিনিয়োগে বড় বাধা। এই কমিটি এ ব্যাপারে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারলে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির বিশাল চাপ থেকেও সরকার মুক্ত হতে পারে।

প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও আইন প্রণয়নে নতুন নির্দেশনা

মন্ত্রিসভার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো আইনের খসড়া উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪ কঠোরভাবে অনুসরণ করা। এর মাধ্যমে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা ১৪টি অধ্যাদেশকে আইনে রূপান্তরের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক সময় অধ্যাদেশ জারি হয়, কিন্তু তা আইনে রূপান্তর হয় না। তবে নতুন সরকারের নেওয়া এই উদ্যোগ আইনি কাঠামোকে শক্তিশালী করবে।’

বাস্তব প্রয়োগের চ্যালেঞ্জসমূহ

সরকারি ও বেসরকারি অফিসের সময়সূচি সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা নির্ধারণ এবং সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার প্রস্তাব বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয় নিশ্চিত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানোই হবে মূল চাবিকাঠি। কারণ শুধু নির্দেশনা দিয়ে পরিবর্তন আনা যায় না। পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সচেতনতা এবং প্রণোদনাÑ দুটিই প্রয়োজন।

সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবায়নই বড় পরীক্ষা

মন্ত্রিসভার ধারাবাহিক সিদ্ধান্তগুলো বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, সরকার একটি বহুমাত্রিক কৌশল নিয়েছে। এতে রয়েছে স্বল্পমেয়াদি কৃচ্ছ্রসাধন, মধ্যমেয়াদি মূল্য সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিনিয়োগ। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ যে নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন চেয়েছে, তা থেকে বিশ্লেষকরা অনুমান করছেন, এবার শুধু সিদ্ধান্ত নয়, কার্যকর বাস্তবায়নই বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য। আগামী মাসগুলোতে দেখা যাবে, এই উদ্যোগগুলো কতটা বাস্তব ফলাফল দিতে পারে এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে চাপ কতটা কমানো সম্ভব হয়।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা