× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

দুই বিষফোড়ায় দিশেহারা প্রিমিয়ার লিজিং

আহমেদ তোফায়েল

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫০ পিএম

আপডেট : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৫০ পিএম

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড গভীর সংকটে পড়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড গভীর সংকটে পড়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বাংলাদেশের আর্থিক খাতে দীর্ঘদিন ধরে কার্যক্রম চালিয়ে আসা প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড গভীর সংকটে পড়েছে। টানা লোকসান, খেলাপি ঋণের চাপ এবং শেয়ারহোল্ডারদের আস্থাহীনতা কোম্পানিটিকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে। শেয়ারবাজারে দরপতন, লেনদেনের অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির বোঝা দিন দিন বাড়ছেই।

২০২৫ সালের প্রিমিয়ার লিজিংয়ের অন্তর্বর্তীকালীন আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, কোম্পানির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) নেতিবাচক। প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস ছিল-১.৭৭, দ্বিতীয় প্রান্তিকে-২.৪৪ ও নয় মাস শেষে দাঁড়িয়েছে-৪.৬৭। বাজারদরও একই সময়ে ধীরে ধীরে কমে আসে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে শেয়ারদর নেমে দাঁড়ায় ১.৫ টাকা।

গত পাঁচ বছর ধরে কোম্পানিটি ধারাবাহিকভাবে লোকসান করেছে। ২০২০ সালে লোকসান ছিল ৩৮৯ কোটি টাকা, ২০২১ সালে লোকসান বেড়ে দাঁড়ায় ২,৪১৬ কোটি টাকা। ২০২২ সালে লোকসান হয় ২,১২৩ কোটি টাকা, ২০২৩ সালে লোকসান আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৩,৭৯৫ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০২৪ সালে লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩,৬৫৬ কোটি টাকা। এই ধারাবাহিক লোকসান কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্যনুযায়ী, কোম্পানির রিজার্ভ ও সারপ্লাসে ঘাটতি স্পষ্ট। ২০২৪ সালের শেষে রিজার্ভ ও সারপ্লাসে ঘাটতি দাঁড়ায় প্রায় ১১,৬৪৪ কোটি টাকা। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য ৭৯৬৫ কোটি টাকার বেশি। এই ঋণের ভার কোম্পানির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমকে আরও জটিল করে তুলছে।

প্রিমিয়ার লিজিং অতীতে নিয়মিতভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ ও বোনাস ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারা ভেঙে গেছে। সর্বশেষ নগদ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে, আর বোনাস শেয়ার দেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালে। এরপর থেকে কোম্পানি আর কোনো ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি।

শেয়ারহোল্ডার কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০২৪ সালের শেষে যেখানে জনসাধারণের হাতে ছিল ৫৩ শতাংশ শেয়ার, ২০২৬ সালের মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭০ শতাংশে। অন্যদিকে স্পন্সর ও পরিচালকদের হাতে শেয়ারের পরিমাণ কমে এসেছে ২৩ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশে। প্রতিষ্ঠানগত বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্বও কমেছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পরিবর্তন বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের ইঙ্গিত দেয়। জনসাধারণের হাতে শেয়ারের অংশ বাড়লেও প্রতিষ্ঠানগত বিনিয়োগকারীদের সরে যাওয়া বাজারে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। কোম্পানিটি বর্তমানে শেয়ারবাজারের ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে, যা সাধারণত দুর্বল আর্থিক ফলাফল ও ডিভিডেন্ড না দেওয়া কোম্পানির জন্য নির্ধারিত হয়। 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি আর্থিক খাতের সামগ্রিক সংকটের প্রতিফলন। দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপ, টানা লোকসান এবং রিজার্ভ ঘাটতি কোম্পানির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানির আর্থিক ভিত্তি দুর্বল থাকায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।

বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোম্পানির আর্থিক পুনর্গঠন ছাড়া বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। অতীতে নিয়মিত ডিভিডেন্ড দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে যাওয়া বিনিয়োগকারীদের হতাশ করেছে। প্রিমিয়ার লিজিংয়ের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ঋণের ভার কমানো ও লোকসান থেকে বেরিয়ে আসা। আর্থিক খাতের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে টিকে থাকতে হলে কোম্পানিকে কার্যকর পুনর্গঠন ও নতুন কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রিমিয়ার লিজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকট কাটিয়ে ওঠা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারে আস্থা ফেরাতে কোম্পানিকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কোম্পানিটির সর্বশেষ ২০২৪ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক হিসাব অনুযায়ী, প্রিমিয়ার লিজিং থেকে ১ হাজার ৩০৭ কোটি ৬১ লাখ টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৯৮৯ কোটি ৭৭ লাখ টাকা বা ৭৬% খেলাপি হয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠানটির অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে বিপাকে পড়েছেন এর আমানতকারীরা। মেয়াদ শেষে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না।

প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি সুবাস চন্দ্র মৌলিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “আমরা আছি, সামনে হয়তো ভালো হবে। বিনিয়োগকারীদের পাওনা কিছু কিছু দিচ্ছি, রেশনিং করে। একসঙ্গে তো আর এত টাকা দেওয়া যাবে না। এখনও আমানতকারীদের প্রায় ৭০ থেকে ৭২ কোটি টাকার বকেয়া আছে।”

কবে নাগাদ বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবেÑ এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “এভাবে সব অর্থ ফেরত দিয়ে দিলে প্রতিষ্ঠান চলবে কীভাবে? এটা আসবে যাবে, এটা তো একটি কনটিনিউয়াস প্রসেস।”

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোম্পানিটি যদি দ্রুত আর্থিক পুনর্গঠন না করে, তবে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়তে পারে। বিশেষ করে ঋণ ব্যবস্থাপনা ও মূলধন ঘাটতি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অন্যথায় বাজারে আস্থা ফেরানো কঠিন হবে। প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেডের বর্তমান আর্থিক সংকট বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধারাবাহিক লোকসান, শেয়ারদরে পতন এবং আস্থার সংকট কোম্পানিটির ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলেছে। আর্থিক খাতে স্থিতিশীলতা ফেরাতে কোম্পানিকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। 

গতকাল রবিবার কোম্পানির শেয়ারদর দাড়িয়েছে ২.৮০ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ৭.৬৯ শতাংশ বেশি। দিনের লেনদেনের পরিসরে শেয়ারদর ওঠানামা করেছে ২.৬০ থেকে ২.৮০ টাকার মধ্যে। মোট লেনদেন হয়েছে ১২ লাখ ৯১ হাজারের বেশি শেয়ার, যার বাজার মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ টাকা। বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩৪৫.৭২ কোটি টাকা, আর ফ্রি ফ্লোট মার্কেট ক্যাপ প্রায় ২৭৪ কোটি টাকা। ফ্রি ফ্লোট মার্কেট ক্যাপ হচ্ছেÑ কোনো কোম্পানির মোট বাজার মূলধনের সেই অংশ, যা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য উন্মুক্ত থাকে ও বাজারে অবাধে লেনদেনযোগ্য।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা