কবির হোসেন
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:৪৮ পিএম
খুলনায় গত শনিবার নিজের রাইফেল দিয়ে নিজেকে গুলি করে আত্মহত্যা করেন খুলনা রেলওয়ে পুলিশের সদস্য সম্রাট বিশ্বাস। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া
বর্তমানে পুলিশে কনস্টেবল থেকে আইজিপি পর্যন্ত ২ লাখ ১৩ হাজার সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে কনস্টেবল প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার। এই বিশাল সংখ্যক পুলিশ কনস্টেবল কর্মক্ষেত্রে নানাভাবে বঞ্চিত ও অবহেলিত। অতিরিক্ত ডিউটি, আর্থিক অসচ্ছলতা ও অসুস্থতাÑ এসব যেন নিত্যসঙ্গী। যার প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে। এর ফলে অনেকে আত্মহত্যার মতো পথও বেছে নিচ্ছেন। গত শনিবার খুলনায় নিজের রাইফেল দিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে আত্মহত্যা করেন সম্রাট বিশ্বাস (২৭) নামে খুলনা রেলওয়ে পুলিশের এক সদস্য। এর আগে গত বছর একইভাবে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন পলাশ সাহা (৩৭) নামে এক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি)। তিনি চট্টগ্রামের র্যাব-৭-এ কর্মরত ছিলেন। দুটি ঘটনার পেছনেই পারিবারিক কলহের চিত্র উঠে এসেছে। শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়, কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার বহু উদাহরণ রয়েছে। এদিকে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যেমন উদ্বেগ বাড়ছে, তেমনি বিষয়টি নিয়ে খোদ বাহিনীসহ বিভিন্ন মহলে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
আত্মহত্যার পেছনে পারিবারিক কলহের বিষয়টি বারবার সামনে এলেও তাদের অতিরিক্ত ডিউটি, ছুটি না পাওয়া আর আয়-ব্যয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্য জীবনযাপনকে দায়ী করছে অনেকে। প্রশ্ন উঠেছে তাদের কর্মজীবনের পেশাদারত্ব নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটানা কাজের চাপ, জীবনের ঝুঁকি এবং পরিবার থেকে দূরত্বের কারণে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে মানসিক অবসাদে আত্মহননের প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে এ পর্যন্ত ৪ পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১ জন, মার্চে ১ জন এবং সর্বশেষ চলতি মাসে ১ জন। এর আগের বছর ২০২৫ সালে আত্মহত্যা করেছেন ১৩ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, মার্চে ১ জন, এপ্রিলে ১ জন, সেপ্টেম্বরে ১ জন, নভেম্বরে ৩ জন এবং ডিসেম্বরে ৩ জন। ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করেছেন ৩ জন। এর মধ্যে জানুয়ারিতে ১ জন, মে মাসে ১ জন এবং অক্টোবরে ১ জন। এ নিয়ে ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২০ পুলিশ সদস্য আত্মহত্যা করেছেন।
একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত ডিউটি, সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার অভাব (দৈনিক ১২-১৪ ঘণ্টা বা তার বেশি), সাপ্তাহিক ছুটির অভাব, পর্যাপ্ত আবাসন ও পারিবারিক জীবনের ব্যাঘাত এবং অত্যধিক মানসিক চাপ তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য নষ্ট করছে। ফলে তারা চরম ক্লান্তি, অবসাদ এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগেন।
২০১১ সালে ৬ হাজার ৪০০ টাকা বেতনে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন হানিফ হাসান (ছদ্মনাম)। চাকরির ১৫ বছর পর অর্থাৎ ২০২৬ সালে এসে সাকল্যে তার বেতন দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার টাকা। বাবা-মা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এ টাকায় সাংসারিক চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যে আবার ব্যাংক লোন পরিশোধ করতে হচ্ছে।
তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশে কনস্টেবল হিসেবে যারা আছেন, কেবল তারাই জানেন এ চাকরিতে কত কষ্ট। আমি নিজেও কয়েকবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম এ চাকরি ছেড়ে অন্য কিছু করব। শেষ পর্যন্ত সংসারে কথা চিন্তা করে আর যেতে পারিনি।
এই পুলিশ সদস্য আরও বলেন, চাকরির বয়স যখন চার বছর, তখন বিয়ে করি। এরপরই নানান চাপে পড়তে থাকি। মানসিক চাপের জন্যই তখন চাকরি ছেড়ে দেওয়া, আত্মহত্যার মতো চিন্তা মাথায় এসেছিল। আমাদের প্রধান সমস্যা অতিরিক্ত ডিউটি, বেতন কম, ঝুঁকি ভাতা কম, হুটহাট বদলি। বদলি হলে নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এ ছাড়া ছুটি কম হওয়ায় পরিবারকে সময় দিতে না পারা, স্ত্রীর সঙ্গে মনোমালিন্যÑ এমন অর্ধশত সমস্যা রয়েছে।
খুলনা রেলওয়ে পুলিশ সুপার আহমেদ মাঈনুল হাসান বলেন, ভোরে অস্ত্রাগার (ম্যাগাজিন গার্ড) এলাকায় দায়িত্ব পালন করছিলেন সম্রাট বিশ্বাস। আনুমানিক সাড়ে চারটা থেকে পাঁচটার মধ্যে নিজের ইস্যুকৃত চাইনিজ রাইফেল দিয়ে মাথায় গুলি করেন তিনি। ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
তিনি বলেন, সম্রাট বিশ্বাস একজন ভালো ও কর্মঠ কনস্টেবল হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রাথমিকভাবে জানা যাচ্ছে, পারিবারিক বিভিন্ন কারণে তিনি হতাশায় ভুগছিলেন। তবে এ বিষয়ে তিনি সহকর্মীদের কখনও কিছু জানাননি। মাঈনুল হাসান আরও বলেন, নিহত সম্রাট বিশ্বাসের স্ত্রী পূজা বিশ্বাস একজন পুলিশ সদস্য, তিনি সাতক্ষীরা জেলায় কর্মরত।
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পুলিশের অনেকেই পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে থাকতে পারেন না। কর্মস্থলে তাদের আবাসনের ব্যবস্থাও নেই। এ ছাড়া যে বেতন-ভাতা পান, সবার পক্ষে ভাড়া বাসায় থাকাও সম্ভব নয়। ফলে একটা নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে সবাইকে পালাক্রমে ছুটি দেওয়া যায়। অন্যান্য দেশে পুলিশ তিন শিফটে আট ঘণ্টা করে দায়িত্ব পালন করে। বাংলাদেশে এখনও সেটা কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। ১২ ঘণ্টা কাজ করলেও এর জন্য কোনো ওভারটাইম চালু নেই। তিনি বলেন, আমাদের অনেক কিছুর স্বল্পতা রয়েছে। অন্যান্য দেশে পুলিশ বাহিনীর জন্য পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট থাকলেও বাংলাদেশ পুলিশে তা নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশের মাঠ পর্যায়ে যারা কাজ করেন, তারা অনেকে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেনÑ এর কারণ পারিবারিক কলহ। তবে প্রকৃত অর্থে এর পেছনের কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যায়, বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে তার পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়। পুলিশ মানুষের নিরাপত্তা দেবে এটা যেমন ঠিক, তেমনি তাদেরও ব্যক্তিনিরাপত্তা বা পেশাগত নিরাপত্তার প্রয়োজন। তার নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা, সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে নির্ধারণ না করতে পারলে তারা উৎসাহের সঙ্গে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। পেশাগত সমস্যা থেকে তাদের অনেকের মধ্যে পারিবারিক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে, তারা একটি অনীহার মধ্যে পড়ে যান। যারা এসব চাপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন, তারাই আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন।
তিনি বলেন, সকল পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে তার নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত প্রয়োজন, পেশাগত দায়িত্ব পালনের পরিবেশ, প্রাপ্য ছুটি এসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে তা যেন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এসব পেশায় কিছু প্রতিবন্ধকতার ব্যাপার থাকে, যা তাদের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করে। আর সেটি যদি সামাল দিতে না পারেন তাহলে আত্মহননের কথা চিন্তা করেন। এসব সংস্থার সদস্যদের মনস্তাত্ত্বিক ওরিয়েন্টেশন দেওয়া প্রয়োজন। আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত কিন্তু রোগের একেবারে শেষ পর্যায়। এর আগে অনেক উপসর্গ থাকে। যখন এই উপসর্গ দেখা দেবে তখনই তার প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। চাপ নেওয়ার মতো ক্ষমতা তৈরি করতে হবে, সেজন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে। জীবনযাপনের ক্ষেত্রে তারা সুস্থ জীবনধারা চান। ফলে চাপ মোকাবিলা করার সঠিক কৌশলগুলো ফোকাস করে তাকে জানানো উচিত।