দীপক দেব
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১১ এএম
আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধিত আইনের গেজেট পেলে আচরণবিধিমালা ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেবে ইসি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আইনি জটিলতা দূর হওয়ার পর এ নির্বাচন নিয়ে ভাবনা শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ পাস হওয়ার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। এখন আনুষ্ঠানিকভাবে সংশোধিত আইনের গেজেট পেলে আচরণবিধিমালা ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেবে ইসি। পাশাপাশি সরকারের গ্রিন সিগন্যাল পেলেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোর আয়োজন প্রস্তুতিও নেবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুরোধে ইসি স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করে। এজন্য সরকারের অনুরোধ আসার পরে ইসি যেন যেকোনো সময় নির্বাচন আয়োজন করতে পারে সেই প্রাথমিক প্রস্তুতি আগামী সপ্তাহেই শুরু করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। ঈদের পর থেকেই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখার কথা ভাবছে ইসি। যদিও ঈদুল ফিতরের পরেই গরম ও এরপর বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার কথা বিবেচনায় নিয়ে এই বছরের শেষদিকে অর্থাৎ নভেম্বর বা ডিসেম্বর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রাথমিক পরিকল্পনা করছে সরকার। কারণ এর মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকেও বিবেচনার মধ্যে রাখা হচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সরকার গঠন করে বিএনপি। জাতীয় নির্বাচনের পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক মাঠে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এ আলোচনার মধ্যেই আইনি জটিলতা নিরসনের দিকে তাকিয়ে ছিল ইসি। পাশাপাশি নিজেদের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মাঠপর্যায়ে চিঠি দিয়েছে কমিশন। গত ১০ মার্চ মাঠপর্যায়ে দেওয়া চিঠিতে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তথ্য হালনাগাদ করার লক্ষ্যে অঞ্চলভিত্তিক সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের তথ্যাদি নির্দিষ্ট ছক অনুযায়ী চাওয়া হয়। মাঠপর্যায় থেকে এরই মধ্যে এ সংক্রান্ত তথ্য ইসিতে পৌঁছেছে। তবে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ইসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। আর সংসদে আইন পাস হওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে চার নির্বাচন কমিশন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সচিব এখনও একসঙ্গে বসেননি।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের মোট ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে এ বছর নির্বাচন উপযোগী হবে ৩ হাজার ৭৫৫টি। আগামী বছরে আরও ৩৪৯টি। এ ছাড়া ভেঙে দেওয়া ৩৩০ পৌরসভা, ৪৯৫ উপজেলা, ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৬১ জেলা পরিষদ এখনই নির্বাচন উপযোগী অবস্থায় রয়েছে। এই অবস্থায় গত ৯ এপ্রিল সংসদে ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘উপজেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘জেলা পরিষদ সংশোধন বিল, ২০২৬’, ‘স্থানীয় সরকার পৌরসভা সংশোধন বিল, ২০২৬’ এবং ‘স্থানীয় সরকার সিটি করপোরেশন সংশোধন বিল, ২০২৬’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। এরপর থেকেই প্রাথমিক প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কাজ শুরু করেছে ইসি।
বিধিমালা সংশোধন নিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু আগামী সপ্তাহে : স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পাঁচটি সংশোধনী বিল জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার জন্য নির্বাচনী আচরণবিধিমালায় ব্যাপক পরিবর্তন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, সংসদে আইন পাসের পরেই নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা নির্বাচনী আইন-বিধি পর্যালোচনা করছেন। সংশোধনী আইনের গেজেট হাতে পেলেই চূড়ান্ত কাজ শুরু হবে। তবে নির্বাচন কমিশনের হাতে নির্দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের আচরণবিধি ও বিধিমালা মডেল থাকায় সংশোধনীর কাজ শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ গতকাল শনিবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আইন পাস হওয়ার পর কমিশনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো নির্দেশনা আসেনি। কমিশনের নির্দেশনা আসার পরেই আমরা বিষয়গুলো নিয়ে কাজ শুরু করবো। ইসি বর্তমানে সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছে জানিয়ে তিনি বলেন, আইন পাস হওয়ার পর যে বিধিমালা পরিবর্তন করতে হবে তা নিয়ে আগামী সপ্তাহ থেকে কাজ শুরু করা হবে।
বছরের শেষে ধাপে ধাপে শুরু করতে চায় সরকার : জুন ও জুলাই মাসে প্রচণ্ড গরম এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে বর্ষার মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নজির খুব কম। যদিও ২০২৪ সালের মে ও জুন মাসে চার ধাপে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজন করেছিল আগের সরকার। এ ছাড়া চলতি বছরের ২১ এপ্রিল থেকে এসএসসি পরীক্ষা শুরু হয়ে শেষ হবে ২০ মে। এরপর ব্যবহারিক পরীক্ষা চলবে ৭ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত। এরপর জুন-জুলাই মাসে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে। পরীক্ষার মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সরকার সংশ্লিষ্ট অনেকেই। সব মিলিয়ে শীতের সময়টিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সুবিধাজনক বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সরকারের মনোভাবের পরেই ঠিক হবে কোন নির্বাচন আগে : সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক বসানোর পর থেকে আলোচনায় আছে স্থানীয় সরকারের এই দুই স্তরে শিগগিরই নির্বাচন দিচ্ছে না সরকার। এজন্য শুরুতে ওপর থেকে, অর্থাৎ সিটি করপোরেশন থেকে নিচের দিকে অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন করার পরিকল্পনা করা হলেও এখন তা হচ্ছে না সেটা মোটামুটি নিশ্চিত। এই অবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ অর্থাৎ নিচ থেকে ওপরের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হতে পারেÑ এমনটা ধারণা করছেন অনেকেই।
যদিও এর আগে একটি অনুষ্ঠানে উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ না দিয়ে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের কথা জানিয়েছেন সরকারের সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম সম্প্রতি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন করে প্রশাসক নিয়োগের কোনো পরিকল্পনা নেই। বর্তমানে যেসব স্থানে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি) ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করা হবে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নেবেন।