প্রবা প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪০ এএম
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সোমবার থেকে দেশজুড়ে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করছে সরকার। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম দিনই টিকা পাবে প্রায় ১১ লাখ শিশু।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় (শনিবার সকাল ৮টা থেকে গতকাল রবিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) হামে আক্রান্ত হয়ে ১ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৮১ জন এবং হামে আক্রান্ত হয়ে ৩৬ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
গতকাল রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় উপসর্গজনিত মৃত্যুবরণ করা ৩ শিশুর মধ্যে ১ জন ঢাকা, ১ জন রাজশাহী এবং ১ জন বরিশাল বিভাগের বাসিন্দা। অন্যদিকে ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া শিশুটি ঢাকা বিভাগের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ১৯৭ জন। এর মধ্যে চিকিৎসার জন্য ৮০৪ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ফলে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত (৩৬ দিনে) সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ৬০৬ জনে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১৬৫ জন। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত মোট নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৪৪৩ জনে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসা শেষে ৬৪৫ জন রোগী হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩৬ দিনে হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে মোট ১২ হাজার ৩৯৬ জন রোগী।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগী সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে ৩৬১ জন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫৪ জন, রাজশাহীতে ৯৬, খুলনায় ৭১, বরিশালে ৫২, সিলেটে ৪৪, রংপুরে ১৫ এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ১১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এছাড়া গত ২৪ ঘণ্টায় ল্যাব পরীক্ষায় নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ১৬৫ জন রোগীর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ১৪৮ জন, রাজশাহীর ১৪ জন এবং চট্টগ্রামের ৩ জন। একই সময় খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রংপুর ও সিলেট বিভাগে নতুন করে কোনো হাম রোগী শনাক্ত হয়নি।
হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে আজ
হামের প্রাদুর্ভাব রোধে আজ সোমবার থেকে সারা দেশে একযোগে শুরু হচ্ছে বিনামূল্যের হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি। এই কর্মসূচির আওতায় ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। সিটি করপোরেশন এলাকায় এ কার্যক্রম চলবে ২০ মে পর্যন্ত এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় ১২ মে পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সব স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে এই টিকা প্রদান করা হবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ সোমবার বগুড়ায় এই টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধন করবেন। অন্যদিকে আজ সকাল সোয়া ৮টায় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার জিন্দা পার্কের ‘লিটল অ্যাঞ্জেল সেমিনারি’তে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। এছাড়াও প্রতিটি জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন এলাকায় স্থানীয় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসমূহের উদ্যোগে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এ টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গতকাল রবিবার বিকালে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশুদের এ রোগ থেকে সুরক্ষিত রাখতে সরকারের উদ্যোগে চলতি মাসের ৫ তারিখে ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় আগেই হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়, যা চলমান।
তিনি আরও বলেন, ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সকল শিশুর জন্য বিনামূল্যে এক ডোজ হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হবে। একটি সুস্থ প্রজন্ম ও রোগমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে শিশুদের হাম থেকে সুরক্ষিত রাখতে তিনি অভিভাবক, কিশোর-কিশোরী, শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, ধর্মীয় নেতা, উন্নয়নকর্মী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতি আহ্বান জানান। সবাইকে একসঙ্গে এগিয়ে এসে শিশুদের এই বিনামূল্যের টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সোমবার থেকে তিন সপ্তাহ (১১ কর্মদিবস) ১ কোটি ৭০ লাখ ২১ হাজার ৯৩৮ জনকে টিকা দেওয়া হবে। ইপিআইয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২ লাখ ৮২ হাজার ৫১০টি কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের ওয়ার্ড পর্যায়েও টিকাদান কার্যক্রম চলবে। এর মধ্যে অস্থায়ী কেন্দ্র রয়েছে ১ লাখ ৩০ হাজার।
এদিকে ইপিআই সহকারী পরিচালক হাসানুল মাহমুদ জানান, ৩০ উপজেলা ও ৪ সিটি করপোরেশনসহ সব এলাকা মিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনা হবে। তিনি জানান, ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া কর্মসূচি আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত এবং ১২ এপ্রিল শুরু হওয়া কর্মসূচি ১২ মে পর্যন্ত চলবে। অন্যদিকে ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া দেশব্যাপী এই বিশেষ অভিযানটি সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০ মে পর্যন্ত এবং দেশের অন্যান্য স্থানে ১২ মে পর্যন্ত চলবে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সব স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রে এই টিকা দেওয়া হবে।
যেসব শিশুকে দেওয়া যাবে না হামের টিকা
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেসব শিশুর জ্বর রয়েছে বা বর্তমানে অসুস্থ, তাদের এই সময়ে টিকা না দিয়ে সুস্থ হওয়ার পর টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রথম ডোজ নেওয়ার পর চার সপ্তাহ পূর্ণ না হলে হামের টিকা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
প্রসঙ্গত, হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় গত ৫ এপ্রিল থেকে ১৮ জেলার উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ৩০ উপজেলায় জরুরি টিকাদান শুরু করে সরকার। পরে ১২ এপ্রিল থেকে এই কর্মসূচি ঢাকা দক্ষিণ, ঢাকা উত্তর, ময়মনসিংহ ও বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকায় সম্প্রসারিত করা হয়।