ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৬ এএম
আপডেট : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০৬ এএম
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়ালেও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পুরনো প্রভাব এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সামাজিক মাধ্যমে কয়েকটি অস্ত্রসহ বিশেষ ভঙ্গিমায় তোলা ছবি আপলোড করার মাধ্যমে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার। চাকরিজীবনে তার প্রভাব, বিশেষ করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক অন্দরমহলে বহুদিন ধরেই আলোচিত। ওই মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলোও আবারও আলোচিত হচ্ছে। আর এই আলোচনার সূত্রে বেরিয়ে আসছে যে, এই প্রকল্পে বিশেষত প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পদায়নের বিষয়গুলো এখনও একটি শক্তিশালী ‘অভ্যন্তরীণ চক্রে’র মাধ্যমে সাবেক সিনিয়র সচিব নিয়ন্ত্রণ করে চলেছেন।
২০২০ সালে ফেনী জেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণে ‘টেকসই মুহুরী বাঁধ ও নদী ড্রেজিং’সহ ৮২৫ কোটি টাকার একটি বড় প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটিতে নদী খনন, ব্রিজ নির্মাণ, ৯২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ, বাঁকা অংশ সোজাকরণসহ নানা কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু শুরু থেকেই প্রকল্প বাস্তবায়নÑ বিশেষ করে ঠিকাদার নির্বাচন এবং ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়ন থেকে শুরু করে অনুমোদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় এই চক্রের প্রভাব ছিল। পরিকল্পনা শাখার মাধ্যমে ডিপিপি তৈরি, পরে তা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদন করিয়ে নেওয়াÑ সব ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট কিছু কর্মকর্তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই সময় মন্ত্রণালয়ে কর্মরত সাবেক এত অতিরিক্ত সচিব প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রকল্প অনুমোদনের ক্ষেত্রে যদি একই গোষ্ঠী ধারাবাহিকভাবে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তাহলে স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হওয়াই স্বাভাবিক। এতে শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, প্রকল্পের মানও নষ্ট হয়।”
‘সিন্ডিকেট’ গঠনের কৌশলÑ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের লোক
সূত্র বলছে, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুব প্রভাবশালী এই সচিব কবির বিন আনোয়ার পরিকল্পনাসহ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের পদায়ন করেন। এর ফলে তার একটি স্থায়ী প্রভাববলয় তৈরি হয়, যা তিনি অবসরের পরেও সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আত্মগোপনে চলে যান সাবেক এই মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এরপর দুই বছর পেরোলেও তারই সুপারিশে পদায়ন হওয়া কর্মকর্তারা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করে রেখেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
দীর্ঘদিন ধরে একই মন্ত্রণালয়ে
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, মাঠ প্রশাসন ও বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সাধারণত তিন বছরের বেশি একই কর্মস্থলে রাখা হয় না। তবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। যেমন, দীপান্বিতা সাহার (যুগ্ম সচিব, পরিকল্পনা উইং) পদায়ন ঘটে ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রিল। কিন্তু টানা প্রায় ৭ বছর ধরে তিনি একই মন্ত্রণালয়ে বহাল। আরেক উপসচিব নাসরিন আলম সাথীও ২০২১ সালের ৭ জুলাইতে পদায়ন পান। প্রায় ৫ বছর ধরে তিনিও কাজ করছেন একই স্থানে। এর আগে এই কর্মকর্তা গাজীপুরের সহকারী কমিশনার, এই জেলার কালিয়াকৈরের সহকারী কমিশনার (ভূমি), টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যানের একান্ত সচিব হিসেবে কাজ করেছেন।
উপসচিব সুজিত হাওলাদার ২০২২ সালের ৭ জুন পদায়ন পেয়ে দায়িত্বে রয়েছেন প্রায় ৪ বছর ধরে। আরেক উপসচিব মোহাম্মদ মোবাশশেরুল ইসলাম রয়েছেন ২০১৯ সালের ১৫ অক্টোবর থেকে, প্রায় ৭ বছর ধরে। এই দীর্ঘস্থায়ী পদায়ন ‘পাওয়ার সেন্টার’ তৈরির মাধ্যমে প্রশাসনিক ভারসাম্য ও নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নষ্ট করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
নতুন সরকার, পুরনো কাঠামোয় পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন প্রশাসনিক কাঠামো দাঁড়ালেও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে পুরনো প্রভাব এখনও পুরোপুরি দূর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া শহীদ উদ্দীন চৌধুরীর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ মন্ত্রণালয়ের ভেতরে যদি পূর্ববর্তী প্রভাববলয় সক্রিয় থাকে, তাহলে নতুন নীতিমালা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। নীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, “শুধু মন্ত্রী পরিবর্তন করলেই হবে না। প্রশাসনিক স্তরে কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। বিশেষ করে পদায়ন ও প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে।”
প্রকল্প বাস্তবায়নে ডিপিপি সংশোধনের ‘খেলা’: সূত্রগুলো জানায়, ডিপিপি সংশোধনের মাধ্যমে নিয়মিতভাবে প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশ করে এই কাজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতি বছর সংশোধনের নামে বরাদ্দ বৃদ্ধিÑ এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়া বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এসবও দুর্নীতির বড় মাধ্যম।
কারিগরি দক্ষতা নাকি প্রভাববলয়
যুগ্ম সচিব দীপান্বিতা সাহা পূর্বে ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা হওয়ায় পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গে তার যোগাযোগ ও বোঝাপড়া ভালোÑ এমনটি বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এই দক্ষতাকে ব্যবহার করে প্রকল্প অনুমোদন সহজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এটি কি প্রশাসনিক দক্ষতা, নাকি প্রভাব খাটানোর কৌশল?
এ বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা বলেন, “যদি কোনো কর্মকর্তা তার পেশাগত দক্ষতা ব্যবহার করেন, সেটা ইতিবাচক। কিন্তু যদি সেটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা সমস্যা।”
অভিযোগ রয়েছে, বিগত সরকারের আমলের কিছু কর্মকর্তা সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। ফলে প্রকল্প বাস্তবায়ন একটি ‘পারস্পরিক লাভজনক’ ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বর্তমান পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে কতটা স্বচ্ছতা রয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। যার অন্যতম হচ্ছেÑ নিয়মিত পদায়ন ও রোটেশন নিশ্চিত করা। প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, স্বাধীন অডিট ও তদারকি জোরদার করা। পাশাপাশি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং ব্যক্তিনির্ভর প্রশাসনিক কাঠামো থেকে বের হয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
এ প্রসঙ্গে সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “প্রশাসনে একটি বড় সমস্যা হলো ‘নেটওয়ার্কভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ’। একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা তার আস্থাভাজনদের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বসিয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক শক্তিকাঠামো তৈরি করেন।
“এই কাঠামো অনেক সময় সরকার পরিবর্তনের পরও টিকে থাকে। ফলে নতুন সরকারের নীতিমালা বাস্তবায়ন ব্যাহত হতে পারে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন হতে পারে।”
তিনি বলেন, “ডিপিপি প্রণয়ন ও সংশোধন একটি কারিগরি প্রক্রিয়া। কিন্তু যদি এটি বারবার সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে তা গুরুতর অনিয়ম। এখানে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ থাকা উচিত। যদি এই ভারসাম্য ভেঙে যায়, তা হলে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।”