× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ‘সোনার পাথরবাটি’

আসাদুজ্জামান সম্রাট

প্রকাশ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯ এএম

সংবিধান সংস্কার পরিষদ ‘সোনার পাথরবাটি’

ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের অনড় অবস্থানের কারণে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ আপাতত সোনার পাথরবাটির মতো অধরাই থাকছে। জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য’ হিসেবে শপথ নিলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধান সংশোধনের পথে হাঁটছে। সরকার পরিষ্কারভাবে বলছে, সংবিধান সংশোধন করে যদি সংস্কারের মতো রূপ দেওয়া যায়, তাহলে এই ‘সংস্কারের’ কোনো প্রয়োজনীয়তা নেই। তবে এ নিয়ে জাতীয় সংসদ ও রাজনৈতিক মহলÑ সবখানেই চলছে বিতর্ক।

প্রসঙ্গত, ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে। নির্বাচনে বিপুল বিজয় পাওয়ার পর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো পরিষদ বাংলাদেশের সংবিধানে নেই। আর এ কারণেই সংসদ সদস্য হিসেবে বিএনপির এমপিরা শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেননি। তা ছাড়া সংবিধানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) এমপিদের শপথ পড়ানোর এখতিয়ার থাকলেও দেশের কোনো আইন বা সংবিধানে সিইসিকে এমন অস্তিত্বহীন কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে কাউকে শপথ পড়ানোর এখতিয়ার নেই।

বিএনপি জোটের সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলেও এবং তাদের বক্তব্যে অকাট্য যুক্তি থাকলেও এ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। জাতীয় সংসদে জামায়াত-এনসিপির সদস্যরা এ নিয়ে প্রতিদিনই কথা বলছেন। বিএনপির পক্ষ থেকেও একের পর এক ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বিরোধীদলীয় এমপিরা সে ব্যাখ্যা গ্রহণ করছেন না। ইতোমধ্যে এ ইস্যুতে তারা রাজপথে একটি কর্মসূচিও পালন করেছেন। 

তবে সরকার ও বিরোধী দলের এই বিতর্কের মধ্যেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ছাড়াই জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করা যায়। সরকারি দল যেখানে বলেছেন, তারা জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে পালন করবেন, সেখানে এই সংস্কার পরিষদ গঠন ছাড়াই সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা সম্ভব। এতে জামায়াত-এনসিপি জোট সমর্থন না জানালেও সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে বিএনপি জোটের কোনো সমস্যা হবে না। সংবিধান সংশোধনের জন্য তাদের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।’

এ বিষয়ে সরকারের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সংবিধান পুনর্লিখনের মতো পরিস্থিতি হয়নি। তবে তাদের বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন বা বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় হলোÑ পঞ্চদশ সংশোধনীর বিতর্কিত অংশ পুনর্বিবেচনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচন কমিশনের কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব। এ ছাড়া সংবিধানের ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতির কিছু বিষয় সংশোধন করা যেতে পারে। 

এ ব্যাপারে সরকারের সদিচ্ছার বিষয়টি উল্লেখ করে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ‘আমরা সংবিধান সংশোধনের জন্য ইতোমধ্যে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব দিয়েছি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে তাদের প্রতিনিধিদের নাম দেওয়া হলে স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠন করতে চাই।’ এ ব্যাপারে বিরোধী দলকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

প্রসঙ্গত, ৫ আগস্টের গণভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং পরে গণভোটের মাধ্যমে এ বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। এই সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান-সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্বিন্যাস, নির্বাচন ব্যবস্থার পরিবর্তন, সংসদীয় সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়। সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হিসেবে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ধারণা দেওয়া হয়। কিন্তু সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের বিধান না থাকায় শুরু থেকেই এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিএনপি দলগতভাবে এই সনদের বেশকিছু বিষয়ে গণভোটের আগে থেকেই ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়ে রেখেছে এবং নির্বাচনের পর সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণও করেনি।

গত ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান কখনও ‘সংস্কার’ হয় না, এটি সংশোধন, স্থগিত বা রহিত হতে পারে। তাই সংবিধান পুনর্লিখনের প্রশ্নই আসে না। সংবিধানের বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো সংসদের মাধ্যমেই সংশোধন করা হবে। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ ৫, ৬ ও ৭ নম্বর তফসিলে থাকা ঐতিহাসিক বর্ণনা, নির্বাচন ব্যবস্থার কাঠামো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রশ্নে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি সর্বদলীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধী জামায়াত-এনসিপি জোট এবং তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তিগুলো বলছে, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদের মৌলিক লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। বিরোধীদলীয় নেতারা বলছেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা হলে তা গণভোটে দেওয়া জনগণের রায়ের অবমাননা হবে।’ এ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, ‘সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসছে।’ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অনেকেই বলছেন, রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের জন্য একটি স্বাধীন সাংবিধানিক পরিষদ প্রয়োজন, যা সংসদের বাইরে থেকেও কাজ করতে পারে।

কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা

এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক জানিয়েছেন, সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ সংসদীয় প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের। সংসদে বিল উত্থাপন করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে তা পাস হলেই সংশোধন কার্যকর হয়। আলাদা কোনো পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করলে তা সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, ‘সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব নেই। জুলাই সনদের যেসব বিষয় সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করে আলোচনা ও দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অনুমোদনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অপরিহার্য নয়।’ তিনি বলেন, ‘এসব প্রস্তাব সরকারি বিলের পাশাপাশি বেসরকারি সদস্যদের বিল হিসেবেও উত্থাপন করা যেতে পারে। এতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির সুযোগও বাড়বে।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা