ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:০৫ পিএম
দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে নৌপথে আসা তরমুজ বুড়িগঙ্গা নদীর ঘাট থেকে নৌকাযোগে তীরে আনা হচ্ছে। এখান থেকে বিক্রির জন্য তা ছড়িয়ে যাবে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকার পশ্চিম নাখালপাড়া রেললাইনের পাশের বাজারে তরমুজের স্তূপ নিয়ে বসে আছেন বিক্রেতা মো. রুবেল মিয়া। পান খেয়ে তার ঠোঁট লাল টকটকে। রুবেল মিয়া বলেন, আমার ঠোঁটের চেয়েও তরমুজগুলোর ভেতরের রঙ লাল টকটকে। কিন্তু ক্রেতা নেই। মানুষ তরমুজ কিনছে না।
তিনি জানান, তিনশটি তরমুজ নিয়ে দুদিন ধরে বসে আছেন, এর মধ্যে শতাধিক তরমুজ বিক্রি হয়েছে। বরিশাল ও পটুয়াখালীর তরমুজ আকারে বড়, আর সাতক্ষীরার তরমুজ তুলনামূলক ছোট। তবে সবগুলোর দাম প্রায় একই। বর্তমানে প্রতি কেজি তরমুজ ২০ থেকে ২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানান এই বিক্রেতা।
একই বাজারে সাইদুল হক, আনোয়ার হোসেনসহ পাঁচজন তরমুজ বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রমজান মাসে প্রতি কেজি তরমুজ ৬০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল। তবে চলতি এপ্রিল মাসে প্রচণ্ড গরম পড়লেও তরমুজের বাজারে দামে ভাটা পড়েছে।
সরেজমিন ঢাকার কারওয়ান বাজার, বাংলামোটর, পল্টন, কুড়িল বিশ্বরোডসহ বিভিন্ন এলাকায় ভ্যানগাড়ি ও রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ফালি করে তরমুজ বিক্রি করা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি এপ্রিলে প্রচণ্ড গরম পড়লেও তরমুজের প্রতি মানুষের আকর্ষণ তুলনামূলকভাবে কম। ফলে বিক্রিও কমে গেছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দৈনিক গড়ে ৩০ থেকে ৩৫টি তরমুজ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে। প্রতি ফালি তরমুজ ১০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও এর দাম ১৫ থেকে ২০ টাকাও নেওয়া হচ্ছে।
দেশে সবচেয়ে বেশি তরমুজ আবাদ হয় বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলায়। চলতি বছরও সেখানে তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। তবে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে কৃষকদের, ফলে লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন তারা।
চাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ডিসেম্বর মাসে আমন ধান ঘরে তোলার পরপরই উপকূলীয় এলাকায় তরমুজের আবাদ শুরু হয়। অনেক কৃষক আবার আমনের জমি অনাবাদি রেখেও আগাম তরমুজ চাষ করেন। এভাবে প্রতি বছরই আমন ও রবি ফসলের জমি সংকুচিত করে তরমুজ আবাদ বাড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার ৮ হাজার ৯৬ হেক্টর বেশি জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। গত বছর আবাদ ছিল ২৭ হাজার ৩৩৬ হেক্টর জমিতে, আর এ বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ হাজার ৪৩২ হেক্টরে।
কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে জেলার গলাচিপা, রাঙ্গাবালী ও কলাপাড়া উপজেলার চাষিরা তরমুজ বিক্রি শুরু করেন, যা এখনও চলমান রয়েছে। তবে মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তীব্র গরম না পড়ায় বিক্রি প্রত্যাশিত হয়নি। ফলে তরমুজ বিক্রিতে বড় ধরনের ধস নেমেছে।
এদিকে ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’র মতো হঠাৎ তেল সংকটে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আরও বিপাকে পড়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। নির্ধারিত সময়ে পরিবহন না পৌঁছায় ঘাটেই নষ্ট হচ্ছে তরমুজ। গলাচিপা উপজেলার সুহুরীর ঘাটে তরমুজবাহী ট্রাকচালক সজল জানান, ঢাকা থেকে এখানে আসতে প্রায় ১২০ লিটার জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। তবে কোনো পাম্পেই একসঙ্গে এত পরিমাণ তেল না পাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা একাধিক ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক এইচএম শামিম জানান, চলতি বছর পটুয়াখালী জেলায় ১২ লাখ ৪০ হাজার ১২০ মেট্রিক টন তরমুজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ইতোমধ্যে পূরণ হয়েছে। এখনও মাঠে কিছু তরমুজ রয়েছে।
তিনি জানান, এসব তরমুজের গড় হিসাবে প্রতি কেজি ৩০ টাকা দরে বিক্রি হলে এ বছর প্রায় ৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বিপুল পরিমাণ উৎপাদনের তুলনায় গ্রাহক চাহিদা কম থাকায় বাজারে তরমুজের দাম তুলনামূলকভাবে কিছুটা কমেছে।
বরগুনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলায় ১২ হাজার ২৭৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ হয়েছে, যা গত বছরের ৮ হাজার ১৭৭ হেক্টরের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার হেক্টর বেশি।
জেলার বিভিন্ন বাজারে বর্তমানে খুচরা পর্যায়ে তরমুজ বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকায়। পাইকারি পর্যায়ে দাম নেমে এসেছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। এতে উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না অধিকাংশ কৃষক।
স্থানীয় কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে তরমুজ চাষে গড়ে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বিপরীতে প্রতি বিঘায় ৮০ থেকে ১০০ মণ ফলন হলেও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করে আয় হচ্ছে মাত্র ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। ফলে বিঘাপ্রতি ৫ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
চলতি মৌসুমে সিলেটের তরমুজ বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। চাহিদা কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে পাইকারি ও খুচরাÑ উভয় পর্যায়ের ব্যবসায়ীরাই লোকসানের মুখে পড়েছেন। বাজার সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, হঠাৎ দাম পড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যবসায়ী পুঁজি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন।
শহরের বিভিন্ন হাটবাজার ঘুরে দেখা গেছে, কয়েক দিন আগেও প্রতিটি তরমুজ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ১৫০ থেকে ২৫০ টাকায়। কোথাও কোথাও এর চেয়েও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বিক্রেতারা। এতে পরিবহন খরচ, শ্রমিক মজুরি ও বাজার খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
খুলনার উপকূলজুড়ে তরমুজ চাষ এখন এক অনিশ্চিত সমীকরণে পরিণত হয়েছে। দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটাসহ খুলনায় এবার ১২ হাজার ৯৩০ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে।
কৃষক প্রশান্ত মণ্ডল বলেন, তরমুজ চাষ এখন জুয়ার মতো। কখনও বীজ নষ্ট হয়, কখনও পানি থাকে না, আবার বাজারে দাম পড়ে যায়। লাভ হবে কি না, শেষ পর্যন্ত কেউ জানে না।
খুলনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, খুলনার তরমুজ দেরিতে বাজারে আসে। চাহিদা ও সরবরাহের এই অসামঞ্জস্যের কারণে দাম পড়ে যায়। বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের পরিচালক ড. মো. হজরত আলী বলেন, এ বছর তরমুজের উৎপাদন বেশি হয়েছে। দেশে উৎপাদন বেশি হলে দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা থাকে। বর্তমানে বাজারে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকায় তরমুজ বিক্রি হচ্ছে, যার অর্থ কৃষকেরা মাঠ পর্যায়ে আরও কম দামেÑ ১৫ থেকে ২০ টাকা বা তার চেয়েও কমে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য সহায়তা করেছেন পটুয়াখালীর প্রতিবেদক এনায়েতুর রহমান, বরগুনার রাসেল মাহমুদ, সিলেটের আব্দুল মাজিদ চৌধুরী এবং খুলনার মাশরুর মুর্শেদ