× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ জাতীয় রাজনীতি সারা দেশ আন্তর্জাতিক অর্থনীতি খেলা বিনোদন মতামত চাকরি-ক্যারিয়ার শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পুষ্টি ও উপাদান তথ্য থাকবে খাবারের প্যাকেটের সামনে

ফারুক আহমাদ আরিফ

প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৪৩ পিএম

প্যাকেটজাত খাবারের প্যাকেটের সামনে পুষ্টি ও উপাদান তথ্য থাকবে। প্রতীকী ছবি

প্যাকেটজাত খাবারের প্যাকেটের সামনে পুষ্টি ও উপাদান তথ্য থাকবে। প্রতীকী ছবি

ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার শিশু আয়েশা আক্তার সাফা। ৮ বছরে এ শিশুর দাঁতে পোকার কারণে প্রায়ই মাথাব্যথা ও অসুস্থতায় ভুগছে। অথচ দুই বছর আগেও সাফা ছিল হাস্যোজ্জ্বল-চঞ্চল। সাফার মা নিলিমা আক্তার জানান, তার মেয়ে চিপস, চানাচুর, লজেন্স, কোকসহ নানা ধরনের প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেত। দিনে দু-তিনটি চিপস খেয়েছে, সঙ্গে অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারও খেয়েছে তার মেয়ে। এরপর দাঁতের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসকের কাছে গিয়ে তিনি পেয়েছেন অবাক করা তথ্য। সাফার অসুস্থতার কারণ প্যাকেটজাত চিপস, চানাচুর, লজেন্স ও কোক! অতিরিক্ত মুখরোচক খাবারের কারণে তার এ অবস্থা হয়েছে।

তিনি বলেন, আগে আমি এসব খাবারের প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ ও মূল্য দেখতাম। কিন্তু চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার পর দেখার চেষ্টা করিÑ প্যাকেটে খাবারের পুষ্টি ও উপাদান নিয়ে কী তথ্য আছে। কিন্তু প্যাকেটে যেভাবে লেখা থাকে, তা খুব একটা পড়া যায় না। তারপরও পড়ার চেষ্টা করি। নিলিমা আক্তার বলেন, প্যাকেটের গায়ে খুবই ছোট করে লেখার ফলে কিছুই বোঝা যায় না অনেক সময়। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। এখন রান্নাঘরের দায়িত্ব নিয়েছে বৈশ্বিক করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। কে কী খাব, কী খাব না, সেটিও নির্ভর করছে তাদের বাণিজ্যিক প্রচার ও প্রসারের ওপর। বিশেষ করে আলট্রা প্রসেসড বা অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয় সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ার কারণে শিশু, তরুণসহ বিভিন্ন বয়সের মানুষ এসব খাবারে ঝুঁকছে। এতে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে শিশুরা। এ থেকে উত্তরণের উপায় হচ্ছে প্যাকেটের সামনের অংশে তামাকপণ্যের মতো করে (চোখে পড়ার মতো) সতর্কবার্তা বা ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) ব্যবস্থার প্রচলন করা। এই ব্যবস্থা চালু হলে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে ও রোগবালাই কমবে। 

এফওপিএল নিয়ে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চলতি বছর ‘মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং-২০২৬’ প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যে ৬৪টি দেশি-বিদেশি সংস্থা ও স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব মতামত যাচাই-বাছাই চলছে। যাচাই শেষে উল্লেখযোগ্য মতামত প্রবিধানে যুক্ত করে চলতি মাসেই এর খসড়া চূড়ান্ত করা হবে এবং রিভিউয়ের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্ত আইনের জন্য এটি আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। মন্ত্রণালয় আইন চূড়ান্ত করে দিলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ প্রজ্ঞাপন জারি করবে। প্রজ্ঞাপন জারির ৬ মাস পর এই নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩-এর আওতায় এই বিধিমালা কার্যকর হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইনটি কার্যকর হলে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়বে।

ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) হলো একটি খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থা, যেখানে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার ও পানীয়ের প্যাকেট বা মোড়কের সামনের অংশে সহজ ভাষা, চিহ্ন বা সতর্কবার্তার মাধ্যমে পণ্যের পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকির তথ্য তুলে ধরা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পণ্যে চিনি, লবণ ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা ট্রান্সফ্যাটের মাত্রা কেমন তা ভোক্তাকে দ্রুত জানতে ও বুঝতে সহায়তা করা। সাধারণত প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি তথ্য পেছনে ছোট অক্ষর ও জটিল সংখ্যায় দেওয়া থাকে। এতে করে ভোক্তার পক্ষে তা পড়া ও বোঝা সম্ভব হয় না। 

ব্র্যাক জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অব পাবলিক হেলথের অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট আবু আহমেদ শামীম প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এফওপিএল অবশ্যই একটি শক্তিশালী নিউট্রিয়েন্ট প্রোফাইল মডেলের (এনপিএম) ওপর ভিত্তি করে গ্রহণ করা উচিত। কেননা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি হ্রাসে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাদ্যে নির্ভরতা কমানো জরুরি। এফওপিএল ব্যবস্থা ভোক্তাকে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নিতে সহায়তা করে থাকে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করছে। এর মধ্যে চিপস, বিস্কুট, চানাচুর, ইনস্ট্যান্ট নুডলস ও স্যুপ, স্ন্যাকস ও চিনিযুক্ত পানীয় অন্যতম। অন্য গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ প্যাকেটজাত খাদ্যে উচ্চমাত্রায় লবণের (সোডিয়াম) উপস্থিতি রয়েছে। দেশে প্রচলিত ২৪টি ব্র্যান্ডের ৯ ধরনের প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবার তথা চিপস, চানাচুর, ডাল ভাজা ও মটর ভাজা, নুডলস, বিস্কুট, লজেন্স-ললিপপ, মিল্ক চকলেট, চাটনি, আইসক্রিম পরীক্ষা করে জানা গেছে, লবণ (সোডিয়াম), চিনি ও চর্বির মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দৈনিক নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রতি ১০০ গ্রাম বিস্কুট ও মিল্ক চকলেটে ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বেশি। ১০০ গ্রাম লজেন্সে ৪৩ গ্রাম চিনি পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত ২৫ গ্রাম সীমার চেয়ে অনেক বেশি। তা ছাড়া ১০০ গ্রাম ডাল ভাজায় ৬.১ গ্রাম লবণ (সোডিয়াম) রয়েছে অথচ এর সর্বোচ্চ গ্রহণীয় মাত্রা হচ্ছে ৫ গ্রাম। ৪৬ শতাংশ প্যাকেটে স্যাচুরেটেড ফ্যাটের তথ্যে দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ প্যাকেটে ট্রান্সফ্যাট সম্পর্কিত তথ্য এবং ২১ শতাংশ প্যাকেটে চিনি ও লবণের তথ্য ছিল না এবং কোনো প্যাকেটেই লবণ (সোডিয়াম), চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাটের সঠিক পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (হু) এক তথ্যে দেখা গেছে, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের কারণে অসংক্রামক রোগের বিস্তার ঘটছে। এতে বাংলাদেশে ৭১ শতাংশ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে ও তাদের মধ্যে ১৯ শতাংশই অকালমৃত্যু বা অপ্রাপ্তবয়স্ক। বিশ্বে অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার ৭৪ শতাংশ। এতে বিশ্বে ১১ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু হয়। 

এফওপিএল নিয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ১৫ ও ১৬ এপ্রিল রাজরাধানীর বিএএম মিলনায়তনে অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রগতির জন্য জ্ঞান (প্রজ্ঞা) ও গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবিটর ‘বাংলাদেশে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং : প্রয়োজনীয়তা, অগ্রগতি ও করণীয়’ একটি কর্মশালার আয়োজন করে। এতে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং-২০২৬ কে আইনে পরিণত করতে নানা ধরনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রোগ্রাম অফিসার (ডায়েট রিলেটেড রিস্ক ফ্যাক্টর) সামিনা ইসরাত বলেন, ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) প্রবর্তন বাংলাদেশে বিদ্যমান জাতীয় স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং একটি সহায়ক খাদ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে, যা জনগণের মধ্যে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গঠনে ভূমিকা রাখবে। গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রুহুল কুদ্দুস প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং বাস্তবায়ন করা গেলে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ হ্রাস পাবে এবং সরকার ও ব্যক্তির স্বাস্থ্য ব্যয় কমবে।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, দেশে ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খান। প্যাকেটের পেছনে থাকা জটিল পুষ্টি তথ্য অধিকাংশ ভোক্তাই বুঝতে পারেন না। এতে করে খাবারের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পায় না। অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্যাকেটের সম্মুখভাগে স্পষ্ট সতর্কবার্তা (এফওপিএল) চালু হলে ভোক্তাদের মধ্যে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য নির্বাচনের সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, প্রক্রিয়াজাত খাবার সম্পর্কে ভোক্তাদের সচেতন করতে সরকার ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা প্রচলনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা