কবির হোসেন
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩০ এএম
কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যের লড়াই, মাদক কারবার ও জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক নানা অপরাধে মোহাম্মদপুর রক্তাক্ত হচ্ছে বারবার। প্রতীকী ছবি
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অভিযান চললেও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য থামছেই না। কিশোর গ্যাংয়ের আধিপত্যের লড়াই, মাদক কারবার ও জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক নানা অপরাধে মোহাম্মদপুর রক্তাক্ত হচ্ছে বারবার। আলোচিত এ এলাকায় ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কিছুদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে অপরাধ চক্র। এলাকাবাসীর অভিযোগ, একের পর এক হত্যাকাণ্ড, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এলাকায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়েও পুলিশ চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। তাদের দাবিÑ দৃশ্যমান টহল জোরদার, দ্রুত গ্রেপ্তার অভিযান এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। পুলিশ বলছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কিশোর গ্যাংয়ের দুই পক্ষের বিরোধের জেরে ইমন খুন হন। অন্যদিকে আসাদুল নিজ দলের কর্মীদের হাতে নিহত হন।
মোহাম্মদপুর এলাকায় ছোট-বড় প্রায় ১৫ থেকে ২০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে। তবে গত চার দিনে দুটি গ্যাংয়ের দুই শীর্ষ নেতাকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে কিশোর গ্যাং পরিচালনা, ছিনতাই, মাদক কারবার ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে আসছিল আলোচিত ‘চার্লি গ্রুপ’-এর নেতা আসাদুল হক (২৮), যিনি ‘লম্বু আসাদুল’ নামে পরিচিত ছিলেন। একসময় অপরাধের রাজত্ব চালানো এই গ্যাং লিডারকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকার সাদেক খানের ইটখলা সংলগ্ন সড়কে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
রায়েরবাজার এলাকায় কিশোর গ্যাং লিডার এলেক্স ইমনকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার মাত্র চার দিনের মাথায় একই এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, গত বুধবার রাত ১টার দিকে একটি গলিতে আসাদুলের সঙ্গে এক যুবক কথা বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর পাশ দিয়ে আরেক যুবক হেঁটে যায়। পরে একটি মোটরসাইকেলে এসে আরও একজন সেখানে নামে। হঠাৎই তারা ধারালো অস্ত্র নিয়ে আসাদুলের ওপর হামলা চালায়। এ সময় মোটরসাইকেলে আসা ওই যুবককে স্থানীয়রা শহিদুল নামে শনাক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আসাদুলকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা।
নিহতের বাবা জলিল সর্দার বলেন, তিনি চার মাস আগে ব্রেন স্ট্রোক করেছেন। স্যানিটারি কাজ করেন, ছেলেও তার সঙ্গে কাজ করত। ঘটনার রাতে আসাদুল বাসার সামনে ছিল। এরপর কীভাবে কী ঘটেছে, তা তিনি কিছুই বলতে পারছেন না।
তিনি বলেন, আসাদুল বিয়ে করেছিল এবং তার পাঁচ বছর বয়সী একটি ছেলে রয়েছে। ছেলের বয়স যখন ৯ মাস, তখন তার স্ত্রী অন্য একজনের সঙ্গে চলে যায়। এরপর থেকে নাতিকে তারা নিজেরাই লালনপালন করছেন।
জলিল সর্দারের ভাষ্য, খারাপ ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশার কারণে তিনি ছেলেকে অনেক শাসন করেছেন। এমনকি একসময় নিজেই তাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পরে ছেলেটি আবার তার সঙ্গে কাজ শুরু করে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, এখন আমার সঙ্গে কাজ করত। ছেলেটা এমন জায়গায় চলে গেল, আর ফিরবে না।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ধারণা করা হচ্ছে মাদকসংক্রান্ত পূর্বশত্রুতার জেরে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে চার্লি গ্রুপের নেতা আসাদুল হক খুনের চার দিন আগে এলেক্স ইমন নামে আরেক কিশোর গ্যাং লিডার খুন হয়। গত ১২ এপ্রিল মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার বেড়িবাঁধ এলাকায় শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানায় একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ঘটনার পরপরই র্যাব, পুলিশ ও ডিবির যৌথ অভিযানে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এত অভিযানের পরও মোহাম্মদপুরে বারবার খুনের ঘটনা সামনে আসছেÑ এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. জুয়েল রানা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এখানে অপরাধীদের অনেকেই একাধিকবার জেল খেটেছে। তারা কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ এলাকায় নিয়মিত অভিযান চালিয়ে প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন ঘটনায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের অক্টোবরে মাদকসহ আসাদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। পরে কিছুদিনের মধ্যে সে জামিনে বেরিয়ে আবারও মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ে।
এদিকে ডিএমপি তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, এলেক্স ইমন হত্যার ঘটনায় পুলিশ, ডিবি ও র্যাবের যৌথ অভিযানে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি খুন হওয়া লম্বু আসাদুলও কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য ছিল বলে জানা গেছে। এ ঘটনায়ও একাধিক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।