নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫৫ পিএম
বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
তবে কি সাগরপথে মানব পাচারে ২০১৫ সালের সেই বিভীষিকা ফিরে আসছে? ওই বছর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে মানব পাচারের ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। বিশেষ করে কক্সবাজার উপকূল ব্যবহার করে সংঘটিত ভয়াবহ মানব পাচারের সেই স্মৃতি এখনও তরতাজা। সেসময় মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী জঙ্গলে একাধিক গণকবরের সন্ধান পাওয়া যায়, যেখানে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় অসংখ্য কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়েছিল। ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ ছিলেন রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি নাগরিক।
জাতিসংঘ ওই ঘটনাকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যা দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াজুড়ে মানব পাচারবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে। পরবর্তীতে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী হাজারো মানুষকে উদ্ধার ও ফিরিয়ে আনা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্দামান সাগরে একটি ট্রলারডুবি আবারও সেই বিভীষিকাময় স্মৃতিকে সামনে এনেছে।
জানা যায়, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহের শুরুতে ২৮০ জন যাত্রী নিয়ে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়াগামী একটি ট্রলারের যাত্রা শুরু হয়। স্থানীয় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা নাগরিক ছিলেন ট্রলারযাত্রী। কিন্তু মাঝ সমুদ্রে খাবার ও পানির সংকটকে কেন্দ্র করে যাত্রীদের ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। অভিযোগ রয়েছে, ট্রলারের গোপন কক্ষে আটকে রেখে অন্তত ৩৩ জনকে হত্যা করা হয়। পরে আন্দামান সাগরে ট্রলারটি ডুবে গেলে আরও দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ হন।
ভয়াবহ ওই ঘটনায় বেঁচে ফেরা যাত্রীদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প-৬-এর রফিকুল ইসলাম (২৭) বলেন, ‘কাজের প্রলোভন দিয়ে তাকে টেকনাফে এনে একটি গুদামে আটক রাখা হয়। পরে গভীর রাতে ছোট ট্রলারে করে মাঝ সমুদ্রে বড় ট্রলারে তোলা হয়। ট্রলারে খাবার ও পানির ভয়াবহ সংকট ছিল। পানি চাইলে মারধর করা হতো। প্রতিবাদ করলে গোপন কক্ষে ঢুকিয়ে রাখা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘৭ এপ্রিল রাতে যাত্রীরা দালালদের কাছে পানি চান। কিন্তু তাদের কোনো পানি দেওয়া হয়নি। এ সময় যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে দালালরা প্রায় ৪০ জন যাত্রীকে একেকটি কক্ষে আটকে রাখে। শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে অনেকেই অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে তিনটি কক্ষ খুলে অন্তত ৩৩ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। লাশগুলো সাগরে ফেলে দেওয়া হয়।’
রফিকুল ইসলাম জানান, এর কিছুক্ষণ পরই উত্তাল ঢেউয়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। প্রায় দুই দিন এক রাত সাগরে ভেসে থাকার পর একটি জাহাজ তাকে উদ্ধার করে। তার ভাষায়, ‘চারদিকে ভাসছিল শুধু লাশ আর লাশÑ নারী ও শিশুরাও ছিল তাদের মধ্যে।’
একই ঘটনার বর্ণনা দেন রাহেলা বেগম (২৫)। তিনি বলেন, ‘ট্রলারে থাকা ২০ জন নারীর মধ্যে একমাত্র তিনিই জীবিত ফিরে এসেছেন। কাঠের টুকরো আঁকড়ে ধরে দুই দিন ভেসে থাকার পর তাকে উদ্ধার করা হয়।’
ট্রলারডুবির এ ঘটনায় কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, পেকুয়া ও বাঁশখালী এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিখোঁজদের স্বজনেরা দিশাহারা হয়ে প্রিয়জনকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
পেকুয়ার বাসিন্দা গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমার ভাই মোহাম্মদ আলী ওই ট্রলারে ছিলেন। এখনও তার কোনো খোঁজ পাইনি। মা কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।’
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, ট্রলারডুবির ঘটনায় একটি সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্র জড়িত। তারা দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্ত মানুষকে উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাগরপথে পাঠান।
রোহিঙ্গা শিবিরের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকট মানুষের মধ্যে হতাশা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা তাদের ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দিচ্ছে।’
আন্দামানের এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছে, বাস্তুচ্যুতি, দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে এমন মৃত্যুফাঁদে ঠেলে দিচ্ছে। জানা গেছে, ট্রলারডুবির ঘটনায় এখন পর্যন্ত মাত্র ৯ জনকে জীবিত উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনও অজানা। আন্দামানের নোনাজলে হারিয়ে যাওয়া এই মানুষগুলোর স্বজনরা এখনও অপেক্ষায়।