মুজিবনগর দিবস
মেহেরাব হোসেন অপি, মেহেরপুর
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৯ এএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আজ ১৭ এপ্রিল। ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে তৎকালীন মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার শপথগ্রহণ করে। শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করা হয় এমএজি ওসমানীকে।
পরবর্তীতে বৈদ্যনাথতলাকে মুজিবনগর নামকরণ করা হয়। আর সেই ইতিহাসকে জীবন্ত করতে নির্মাণ করা হয় মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক শত শত ভাস্কর্য ও ম্যুরাল; যা দিয়ে পুরো মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যে কারও চোখের সামনে ধরা দেয়। মুজিবনগরে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য সব ঘটনা ভাস্কর্য ও ম্যুরালের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মাণ করা হয়েছে বিশাল স্মৃতি মানচিত্র ও কমপ্লেক্স।
তবে ২৪-এর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর স্বাধীনতার সূতিকাগার মুজিবনগরে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব স্মৃতিচিহ্ন।
গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, একাত্তরের ৭ মার্চ ঢাকা রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের ভাস্কর্য, বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর নারী নির্যাতন ও হত্যা, দেশের প্রথম সরকারকে গার্ড অব অনার, পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ, রাজাকারদের সহযোগিতায় বাঙালি নারী-পুরুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী, কর্নেল ওসমানীসহ খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাস্কর্যসহ ঐতিহাসিক মুজিবনগরের স্মৃতিকে চির অম্লান রাখতে নির্মিত মানচিত্রে থাকা ১১টি সেক্টরের কোন এলাকায় কীভাবে যুদ্ধ হয়েছে, শরণার্থীরা কীভাবে ভারতে গিয়েছিলেনÑ এমন শতাধিক ম্যুরাল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বীর মুক্তিযোদ্ধা জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব মুজিবনগরে তুলে ধরা হয়েছে। যেটিকে ধারণ করে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণ করে। এটি ভাঙা একেবারেই উচিত হয়নি। এ আঘাত শুধু বঙ্গবন্ধুকে করা হয়নি, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাকে করা হয়েছে, এটি কখনোই কাম্য নয়। এ ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান তিনি।
বাংলাদেশের প্রথম গার্ড অব অনার প্রদান করা জীবিত আনছার সদস্য সিরাজুল ইসলাম বলেন, আজ (১৭ এপ্রিল) থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হবে বৈদ্যনাথতলা এবং এর নতুন নাম হবে মুজিবনগর। তিনি ভাষণে বিশ্ববাসীর কাছে নতুন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও সামরিক সাহায্যের আবেদন জানান। বক্তৃতা এবং শপথগ্রহণ পর্ব শেষে নেতারা মঞ্চ থেকে নেমে এলে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিকে গার্ড অব অনার প্রদান করেন মেজর আবু উসমান চৌধুরীর নেতৃত্বে স্থানীয় ১২ জন আনসার সদস্য। উপস্থিত জনতার মুহুর্মুহু জয়বাংলা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে মুজিবনগরের আম্রকানন। সব মিলিয়ে ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে অনুষ্ঠান শেষ হয়।
জীবিত অপর আনছার সদস্য আজিম উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, গুঁড়িয়ে দেওয়া ভাস্কর্যগুলো সংস্কারের মাধ্যমে মুজিবনগকে নতুন করে গড়ে তোলা হোক। তিনি আরও বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তরুণ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে ভাস্কর্যগুলো সংস্কার করা জরুরি।
মুজিবনগরে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা পিএফজির সমন্বয়কারী ওয়াজেদ আলী খান জানান, নতুন প্রজন্মের কাছে মুজিবনগরকে তুলে ধরতে হবে। এটা শুধু একটি নাম নয়, বরং এটি মুক্তিযুদ্ধের জীবন্ত ইতিহাস। তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, বিগত সরকার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেছে। মুজিবগরের নকশা পরিবর্তন করে নিজেদের ইচ্ছামতো নকশা তৈরি করে ভাস্কর্যগুলো নির্মাণ করেছিল। যার ফলে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাস্কর্যকে সরানো হয়। তিনি জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযুদ্ধের অবদান রাখা সকলকে যথাযোগ্য সম্মানের মাধ্যমে মুজিবনগরকে ঢেলে সাজানোর আহ্বান জানান।