তোফাজ্জল হোসেন কামাল
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৪ এএম
আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম
বাহিনীর আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরও গতিশীলতা আনতে ৫০০ সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাহিনীর আধুনিকায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আরও গতিশীলতা আনতে ৫০০ সহকারী পুলিশ সুপারের (এএসপি) পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। চলতি মাসের শুরুতে প্রস্তাবের চিঠিটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত বিদ্যমান ২১টি ইউনিটের বিপরীতে পদায়নের জন্য আরও এএসপির পদ সৃষ্টির বিষয়টি তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়, দক্ষ জনবল এবং নিবিড় তদারকির অভাবে জনশৃঙ্খলা, মামলা তদন্ত ও জনবল ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্ভব হচ্ছে না। প্রস্তাবিত পদগুলো সৃষ্টি হলে বার্ষিক আবর্তক খাতে ব্যয় হবে ২৪ কোটি ৮৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপুলিশ পরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচএম শাহাদাত হোসাইন চিঠি পাঠানোর বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, পুলিশ বাহিনীতে নিয়মিত পদ শূন্য হয় অবসর ও পদোন্নতিজনিত কারণে। পদ শূন্য হলে তা পূরণের জন্যই মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানানো হয়। তিনি উল্লেখ করেন, পদগুলো প্রথম শ্রেণির হলে, তা পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়। সেজন্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে। প্রথম শ্রেণির পদ না হলে সেসব পদ অনুমোদনক্রমে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পূরণ করা হয়।
চিঠি প্রসঙ্গে শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশের কাজে গতিশীলতা আনা এবং কিছু পদ সৃজন করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে ডিএসবিতে পদ সৃজন করা হয়েছে, তাই সেসব পদে জনবল নিয়োগসহ আরও যেসব পদ সৃজন করা হয়েছে, সেসব পদের বিপরীতে জনবল নিয়োগ জরুরি হয়ে পড়েছে।
এদিকে, এএসপি পদ সৃষ্টিতে পুলিশ সদর দপ্তরের দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রথমবারের মতো একটি সভা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভা সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত ৫০০ এএসপি নিয়োগের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেন এবং এই নিয়োগ সম্পন্ন করতে একটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরির তাগিদ দেন। প্রস্তাবনা অনুসারে পদগুলোর বিপরীতে একসঙ্গে নিয়োগ হবে, না ধাপে ধাপে নিয়োগ হবে তা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়। এএসপি নিয়োগের পর পুলিশের পরবর্তী পদের ধাপগুলোতে পদোন্নতির প্রক্রিয়াও আলোচনায় উঠে আসে। পরবর্তী সভায় এসব বিষয় চূড়ান্ত করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত পদগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করবে বলে জানিয়েছে সভা সূত্র।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই সালাহউদ্দিন আহমদ পুলিশের বিভিন্ন স্তরে জনবল সংকট নিরসনে নিয়োগের বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের সঙ্গে এক বৈঠকে মন্ত্রী শূন্যপদ পূরণের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ সার্জেন্টের ১৮০টি শূন্যপদে তাৎক্ষণিক নিয়োগের ঘোষণা দেন। এরই মধ্যে কনস্টেবল এবং পুলিশ সার্জেন্ট পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে ৯ম গ্রেডে বেতনভুক্ত এএসপির অনুমোদিত পদ রয়েছে ১২৩১টি। এর মধ্যে ট্রেনিং রিজার্ভের (টিআর) পদ রয়েছে ১১৪টি। প্রস্তাবিত ৫০০ পদ সৃষ্টির পর পুলিশ বাহিনীতে এএসপির পদ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৭৩১। সূত্র জানায়, আরও ৫০০ এএসপি নিয়োগের ফলে বাংলাদেশ পুলিশের কর্মক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি এবং সারা দেশে উন্নত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের চিঠিতে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়, বাংলাদেশ পুলিশে বর্তমানে ৮টি রেঞ্জের অধীনে ৬৪টি জেলা পুলিশ, ৮টি মেট্রোপলিটন পুলিশ, অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-পিবিআই ইত্যাদিসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট মামলা তদন্তসহ দেশের অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে।
চিঠিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অনুকূলে প্রস্তাবিত ৫০০টি এএসপির পদ সৃজন করে সেসব পদে নিয়োগকৃত কর্মকর্তাদের সময়োপযোগী ও আধুনিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলা হলে মানবাধিকারের প্রতি সংবেদনশীল হয়ে বল প্রয়োগ এবং দক্ষতার সঙ্গে তদারকি, অনুসন্ধান ও তদন্ত কাজ সম্পাদন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণসহ পুলিশি কার্যক্রম আরও নিবিড়, সময়ানুগ এবং সময়োপযোগী হবে।
বর্তমানে পুলিশ বাহিনীতে ক্যাডার, নন-ক্যাডার ও নন-পুলিশের অনুমোদিত পদ সংখ্যা ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪ জন উল্লেখ করে চিঠিতে আরও বলা হয়, একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গঠনের নিমিত্তে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে জনবান্ধব পুলিশের বিকল্প নেই। বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। জাতিসংঘ মানদণ্ড অনুযায়ী শান্তিকালীন সময়ে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত ৪০০:৪১ আদর্শ হিসেবে হয়ে থাকে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে প্রতি ৪০০ জনের চেয়েও কম জনসংখ্যার বিপরীতে ১ জন পুলিশ সদস্য রয়েছে। মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত যথাক্রমে ৩১৩:১ এবং ২৯৭:১। ভারতে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত ৬৬৭:১ এবং পাকিস্তানে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত ৫৫২:১।
এক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের অনুপাতকে ভিত্তি ধরা হলে বাংলাদেশে (স্ট্যাটিস্টিক ইয়ারবুক অব বাংলাদেশ ২০২৩ অনুযায়ী ১৮,০৬,০০,০০০ জনসংখ্যার ভিত্তিতে) পুলিশ সদস্য থাকা প্রয়োজন যথাক্রমে ২ লাখ ৭০ হাজার ৭৬৯ অথবা ৩ লাখ ২৭ হাজার ১৭৯ জন। ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের মঞ্জুরিকৃত পুলিশ পদ ২ লাখ ৭ হাজার ৭৪৫টি এবং নন-পুলিশ পদ ১০ হাজার ৮০৯টিসহ সর্বমোট পদসংখ্যা ২ লাখ ১৮ হাজার ৫৫৪টি। বর্তমানে বাংলাদেশে জনসংখ্যা ও পুলিশের অনুপাত ৮৬৯:১। পক্ষান্তরে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার সদস্যের অনুপাত ১:৬৫। নাগরিক:পুলিশ অনুপাতের এ ভারসাম্য ঘাটতির পাশাপাশি তদারককারী ক্যাডার সদস্যের বিপরীতে জুনিয়র সদস্যদের এই বিপুল সংখ্যা অপারেশনাল কার্যক্রম ও যথাযথ মনিটরিংয়ের জন্য বিঘ্ন-সংকুল। পুলিশিংয়ের মতো একটি নিবিড় ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত প্রদানের পেশায় তদারককারী কর্মকর্তার এ স্বল্পতা বাংলাদেশ পুলিশের সার্বিক সক্ষমতা ও পেশাদারত্বের যথাযথ মান বজায় রাখার জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ রূপে পরিগণিত। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ পুলিশের জনবল কাঠামোতে তদারককারী কর্মকর্তা তথা এএসপি হতে অনূর্ধ্ব পদ বৃদ্ধি করা অতীব জরুরি।
পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের কাঠামোগত প্রস্তাবিত এএসপি পদ সৃষ্টি হলে দেশের ২১টি ইউনিটে তাদের পদায়ন করা হবে বলে চিঠিতে জানানো হয়। এতে উল্লেখ করা হয়, ৬৪ জেলা পুলিশের প্রতিটিতে দুজন করে (ডিবি ও প্রসিকিউশন) ১২৮ জন, ৫২ জেলায় এএসপি (ডিএসবি) পদে একজন করে, ঢাকাসহ ৫টি মেট্রোপলিটন পুলিশে ৬৭ জন, সিআইডির ৬৪ জেলা পর্যায়ে ৭৫ জন, পিবিআইর ৬৪ জেলায় ৬৮ জন, স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি) ২৫ জন, হাইওয়ে পুলিশে ৯ জন, চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নে ৯ জন, রেলওয়ে পুলিশে ৫ জন, নৌ পুলিশে ৫ জন, ট্যুরিস্ট পুলিশে ৬ জন, শিল্পাঞ্চল পুলিশে ৯ জন, এন্টি টেররিজম ইউনিটে ৮ জন, পুলিশ সদর দপ্তরে ১৪ জন, পুলিশ টেলিকমে একজন, পুলিশ স্টাফ কলেজে দুজন, সারদায় পুলিশ একাডেমিতে ৩ জন, ৪টি পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে ৫ জন, এমআরটি পুলিশে দুজন, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে ৩ জন ও মাগুড়ার শালিখাসহ চারটি সার্কেলে ৪ জনকে পদায়ন করা যাবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে বাংলাদেশ পুলিশে মোট ৮৩ হাজার ৭০টি নতুন পদ সৃজন করা হয়। তার মধ্যে শুধু কনস্টেবল, এসআই ও পুলিশ সার্জেন্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ১ লাখ ১৯ হাজার ৯১৯ জনকে, যা মোট পুলিশ সদস্যের প্রায় অর্ধেক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পুলিশের এ নিয়োগের বড় অংশই ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনামলে তাদের ব্যবহার করা হয়েছে মূলত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসেবে।