× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাতিল দুই অধ্যাদেশ ঘিরে জমেছে বিতর্ক

মাসুদুল হাসান

প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪৫ এএম

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৬ এএম

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দুটি বিল আকারে সংসদে পাস হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দুটি বিল আকারে সংসদে পাস হয়নি। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশের মধ্যে বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ দুটি বিল আকারে সংসদে পাস হয়নি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতার সাথে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত অধ্যাদেশ দুটি আইনে রূপান্তর না হওয়ায় সরকারের উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠলেও সরকার বলছে, অধ্যাদেশগুলো ত্রুটিপূর্ণ ছিল। পরবর্তীতে বাতিল এই দুই অধ্যাদেশের আদলে ত্রুটি সংশোধন করে বিল আনবে সরকার।

‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ শিরোনামে অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরের ৩০ নভেম্বর অধ্যাদেশ জারি করার পর একই বছরের ১১ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় উদ্বোধন করা হয়। এ ছাড়াও ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কাউন্সিলের মাধ্যমে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের বিধান রেখে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট জারি হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের বিধান এবং স্বতন্ত্র সচিবালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জারি করা দুটি অধ্যাদেশ ৯ এপ্রিল বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ। 

জাতীয় সংসদের স্পিকার অধিবেশনে বলেন, নতুন করে এসব বিল বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা তুলতে পারবেন। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। কেননা সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে একই রকম বিল পরবর্তীতে তা পাস না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। অধিকতর যাচাই-বাছাই করে পরে এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হবে। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়, সরকারের এই উদ্যোগ বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। সরকার আগের সরকারের মতো নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের অভিপ্রায় রয়েছে এবং এতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে।

এই দুটি অধ্যাদেশ জারি করার পর আইনজীবীদের একটি বড় অংশ একে সাধুবাদ জানিয়েছিল। এতে অনেকে মনে করেছিলেন, বিচারক নিয়োগের বিষয়ে রাজনৈতিক বিবেচনা ও হস্তক্ষেপ কমে আসবে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠন করলে অধীনস্থ আদালতের ওপর মন্ত্রণালয় তথা সরকারের হস্তক্ষেপ কমে যাবে। কিন্তু সরকারি দল এই দুটি অধ্যাদেশ বিল আকারে না তোলায় তা আর বাস্তবায়নের সুযোগ থাকল না। তারা মনে করছেন, বিচার বিভাগের ওপর প্রথাগত ও পুরনো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা বহাল থাকল।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের প্রয়োজনীয়তা ও কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা ও পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে সরকার এখন এই আইনি বিধানগুলো পুনঃমূল্যায়ন করতে চায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত শুক্রবার পর্যন্ত (১০ এপ্রিল) ১৩তম দিনে অধিবেশনে উত্থাপিত বিলগুলোর ওপর দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব না থাকায় সংসদে এ বিষয়ে আলোচনা হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপন করলে সর্বসম্মতিক্রমে সেগুলো পাস হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে এবং ১৫টি সংশোধনসহ পাসের সুপারিশ করে। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আকারে আনার সুপারিশ করা হয়।

পূর্ববর্তী সরকারগুলো বিচারক নিয়োগের আইন করেনি বরং বিভিন্ন সময়ে বিচার বিভাগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগও ছিল। এ বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের জন্য জারি করা অধ্যাদেশে বলা হয়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক নিয়োগের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করবে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল’। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত স্বতন্ত্র এই কাউন্সিল যোগ্য ব্যক্তির নাম রাষ্ট্রপতি বরাবর সুপারিশ করবে। ৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’ পাস হওয়ায় এই বিধান আর থাকছে না। আগের মতো সংবিধানে থাকা বিধান অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া যাবে।

আইনমন্ত্রীর ব্যাখ্যা

গত ১২ এপ্রিল আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এক বিবৃতিতে বলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে আলোচনা হয়েছে। এ অধ্যাদেশগুলো বিল আকারে আনার সময় বিলের প্রস্তাবনায় এবং উদ্দেশ্য ও কারণ সংবলিত বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এগুলো অধিকতর যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে অধিকতর পরামর্শ ও যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। 

এ বিষয়ে এক প্রতিক্রিয়ায় বিচার বিভাগ পৃথককরণ মামলার বাদী মাসদার হোসেন বলেন, বিচারক নিয়োগ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের জন্য ভালো ফল বয়ে আনবে না। ক্ষমতার জোরে কলমের খোঁচায় এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাতিল করা হচ্ছে, যা আসলে বিচার বিভাগকে পদদলিত করার শামিল। একই বিষয়ে আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, বিচার বিভাগকে পৃথক করতে ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায়ের প্রতিফলন এই দুটি অধ্যাদেশ সংসদে বাতিল করে সরকার বিচার বিভাগের হৃৎপিণ্ডে হাত দিয়েছে। সরকারের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত সর্বনাশ ডেকে আনবে।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিগত সরকারের ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ অনেকে এসব আইন করার সাথে জড়িত ছিল এবং বিষয়টি দ্রুত গতিতে হয়েছে, যা কাম্য ছিল না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যতগুলো অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, তার মধ্যে ন্যূনতম ৩০টা অধ্যাদেশ সংবিধান পরিপন্থী এবং তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এগুলোর মধ্যে অর্ধেক অধ্যাদেশ কোন পরিপূর্ণ আইন হয়নি। তিনি আরও বলেন, আইন করা যদি দুটি ‘প্যারালাল অরগানাইজেশন’ রাখে যে, নির্বাহী বিভাগও আইন করবে এবং সংসদও আইন করবে, তাহলে সংসদের গুরুত্ব কমে যাবে!

একই বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিচারক নিয়োগ ও পৃথক সচিবালয়ের জন্য গত সরকার যে দুটি আইন করেছিল তা ত্রুটিমুক্ত ছিল না। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সম্পর্কিত হাইকোর্ট একটি রায় দেওয়ার পর ইতোমধ্যে সচিবালয় স্থাপিত হয়ে গেছে। যদিও সরকার বলছে আপিল করবে। কিন্তু রায় তো কার্যকর হবে যতক্ষণ সেটা স্টে না হয়। তিনি আরও বলেন, পিটিশনাররা যদি কার্যকর হওয়া রায় আপিল কীভাবে হবেÑ এই প্রশ্ন তোলে তাহলে সামনে হয়তো একটা আইনি লড়াই হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের বাইরে গিয়ে সংসদ আইন পাস করতে পারবে না, সে ক্ষমতা সংসদের নেই। বিএনপিকে এটা অনুধাবন করতে হবে, বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করলে রাজনৈতিক দলের সুবিধা হয়। সেটা না হলে রাজনৈতিক দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলে তারা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট যেটা বলবে সেটা সবাইকে মানতে হবে। এটা আমাদের সংবিধানের ম্যান্ডেট।

গত অন্তর্বর্তী সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সৈয়দ কাজী মাহফুজুল হক সুপণ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, আমি সংস্কার কমিশনে বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করার জন্য কাজ করেছি। এ উদ্দেশ্যে কিছু কিছু আইন আমরা খসড়া করে দিয়েছিলাম। এই আইনগুলো করা হয়েছিল বিচারক নিয়োগ যতটা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত করা ‍যায় এজন্য। এখন এই আইন যদি না থাকে, তাহলে সবকিছু পুরনো পদ্ধতিতে চলবে। সেখানে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বিগত সরকারের যারা আইনসমূহ তৈরিতে কাজ করেছেন, সেখানে ত্রুটি ছিল কি নাÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, সরকারকে অল্প সময়ে এত বেশি আইন করতে হয়েছে যে, ত্রুটি থাকা অমূলক নয়। 

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা