হিমায়িত মাছ রপ্তানি
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৫০ এএম
যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের হিমায়িত মাছ রপ্তানি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রতি মাসে আমরা সাত থেকে আট কন্টেইনার হিমায়িত মাছ রপ্তানি করি। কিন্তু ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মার্চ মাসে এক কন্টেইনার মাছও রপ্তানি করতে পারিনি। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে বন্ধ হয়ে যায় মাছ রপ্তানি।’ কথাগুলো বলেন প্যাসিফিক সি ফুড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক দৌদুল কুমার দত্ত।
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি জানান, ‘চলতি এপ্রিল মাসে বিকল্প রুটে সীমিত পরিসরে কন্টেইনার পরিবহন চালু হলেও পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় বিকল্প রুটেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে মাছ রপ্তানি করা যাচ্ছে না।’
একই কথা জানিয়েছেন বিডি সি ফুড লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) ফারুক উদ্দিন। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি জানান, প্রতি মাসে আমরা তিন থেকে চার কন্টেইনার মাছ মধ্যপ্রাচ্যে রপ্তানি করি। কিন্তু মার্চ মাসে আমরা এক কন্টেইনার মাছও রপ্তানি করতে পারিনি। যুদ্ধ শুরুর আগে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে আমাদের তিন কন্টেইনার মাছ জাহাজীকরণ হয়েছিল। মাছ ভর্তি ওই কন্টেইনারগুলো দীর্ঘদিন শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে আটকে ছিল। চলতি মাসে বিকল্প রুটে সেগুলো মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়; তবে এখনও সেটি সম্ভব হয়নি। বর্তমানে কন্টেইনারগুলো ভারতের মুন্দ্রা বন্দরে রয়েছে।’ যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আমরা যদি মাছ রপ্তানি করতে না পারি তাহলে প্রতিযোগী দেশগুলো বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিতে পারে বলে তিনি শঙ্কা প্রকাশ করেন।
শুধু প্যাসিফিক সি ফুড লিমিটেড আর বিডি সি ফুড লিমিটেড নয়, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় অন্যান্য রপ্তানিকারকরাও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে চাহিদামতো হিমায়িত মাছ রপ্তানি করতে পারছেন না। যে কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী অনেক রপ্তানি পণ্য ভর্তি কন্টেইনার চট্টগ্রাম বন্দর, বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো এবং ট্রানশিপমেন্ট বন্দরে আটকে আছে। এতে বিপাকে পড়েছেন রপ্তানিকারকরা। একদিকে নির্ধারিত সময়ে ক্রেতাদের কাছে পণ্য পাঠাতে ব্যর্থ হচ্ছেন তারা, অন্যদিকে বেশি দিন বন্দরে আটকে থাকার কারণে বাড়তি স্টোরেজ চার্জসহ শিপিং লাইন আরোপিত নানা ধরনের সার চার্জের কবলে পড়তে যাচ্ছেন রপ্তানিকারকরা। আগে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে এক কন্টেইনার পণ্য পাঠাতে ২৫০০ ডলার খরচ হতো, সেখানে এখন খরচ হচ্ছে প্রায় ১০ হাজার ডলার।
গত তিন মাসে ধারাবাহিকভাবে মাছ রপ্তানি কমছে বলে জানিয়েছেন মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম। প্রতিদিনের বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘গত তিন মাসের মধ্যে জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চ মাসে মাছ রপ্তানি অনেক কমেছে। জানুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চ মাসে রপ্তানি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় গত মাসে (মার্চ) মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ।’
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর চট্টগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ১ কোটি ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৫৬২ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ৩ হাজার ১৯৭ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে ৯৯ লাখ ১৭ হাজার ২২৪ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ২ হাজার ৭৬৬ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়। আর সর্বশেষ গত মার্চ মাসে ৮৮ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪২ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ২ হাজার ৪৫৬ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রপ্তানি কমছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দুই-তৃতীয়াংশ মাছ রপ্তানি কমেছে। জানুয়ারি মাসে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানি হয় ১১৩ মেট্রিক টন, সেখানে মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৩৮ মেট্রিক টন। অন্যদিকে গত বছরের (২০২৫ সালের) মার্চ মাসের তুলনায় মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ। চলতি বছরের মার্চ মাসে যেখানে ৩৮ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়, সেখানে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে রপ্তানি হয়েছে ১৫৫ মেট্রিক টন।
মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ৫ লাখ ১৭ হাজার ৮৪০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ১১৩ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৭০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ৮৭ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়। আর সর্বশেষ মার্চ মাসে ১ লাখ ৩৯ হাজার ২৭৫ মার্কিন ডলার সমমূল্যের ৩৮ মেট্রিক টন মাছ রপ্তানি হয়।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মাছ রপ্তানিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় এখন মধ্যপ্রাচ্যে বাজার হারানোর শঙ্কায় আছে বাংলাদেশ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান থেকে বেশি হিমায়িত মাছ রপ্তানি হয়। এখন যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশ থেকে মাছ রপ্তানি কমে গেলেও ওইসব দেশ থেকে বিকল্প রুটে মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানি হচ্ছে। সরাসরি ফ্রেইট থাকায় বাংলাদেশের তুলনায় ওইসব দেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য পরিবহন অনেক সহজ। খরচও কম। তাই ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি মাছ আমদানিতে এসব দেশের দিকে ঝুঁকে যায় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানিতে বাজার হারানোর আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশের।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে বিডি সি ফুড লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন্স) ফারুক উদ্দিন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় শিপিং লাইনগুলো মধ্যপ্রাচ্যে পণ্য রপ্তানিতে একটি বিকল্প রুট তৈরি করেছেন। আগের মতো কলম্বো বা সিঙ্গাপুর থেকে ভারতের মুন্দ্রা অথবা নবসেবা বন্দরে যাবে। এরপর সেখান থেকে হরমুজ প্রণালী পার না হয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের খোর ফাক্কান বন্দরে যাবে। এরপর সেখান থেকে সড়কপথে জেবল আলী বন্দরে নিয়ে যাওয়ার পর ওই বন্দর থেকে আবারও জাহাজে করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের বন্দরে যাবে। বাংলাদেশ থেকে এই বিকল্প রুটে পরিবহন খরচ অনেক বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বিষয়টি আমরা ক্রেতা প্রতিষ্ঠানকে জানিয়েছি। কিন্তু তাদের কাছ থেকে সাড়া পাচ্ছি না। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারা আগ্রহ কম দেখাচ্ছেন। অথচ থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান থেকে ওই রুট দিয়ে ইতোমধ্যে পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এখন ক্রেতা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি প্রতিযোগী দেশগুলো দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে মাছ রপ্তানিতে বাজার হারাবে বাংলাদেশ।’