সর্বজনীন পেনশন স্কিম
আরমান হেকিম
প্রকাশ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:২৮ এএম
সর্বজনীন পেনশন স্কিমে নতুন সদস্য নিবন্ধন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, আর তহবিলে জমার পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকঢোল পিটিয়ে দেশের সব মানুষকে পেনশনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে চালু হয়েছিল সর্বজনীন পেনশন স্কিম (ইউপিএস)। শুরুতে ব্যাপক সাড়া মিললেও তিন বছর যেতে না যেতেই ভাটা পড়েছে সেই আগ্রহে। নতুন সদস্য নিবন্ধন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে, আর তহবিলে জমার পরিমাণও প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই সরকার প্রায় চার হাজার কোটি টাকার বিদেশি ঋণের ওপর ভর করে বড় আকারের অবকাঠামো প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, স্থবির স্কিমের সঙ্গে এমন বড় ব্যয় বাজেটের ওপর নতুন বোঝা হয়ে উঠতে পারে।
কথাসাহিত্যিক প্রমথনাশ বিশীর একটি বিখ্যাত বই ‘ঘৃতং পিবেৎ’। এটি মূলত ‘ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ’ প্রাচীন ভারতীয় চার্বাক দর্শনের একটি বিখ্যাত উক্তি থেকে নেওয়া, যার অর্থÑ ‘ঋণ করে হলেও ঘি খাও, যতদিন বাঁচো সুখে বাঁচো।’ সর্বজনীন পেনশন স্কিমও যেন এই পথে হাঁটছে। ঋণ করে সদস্য সংগ্রহ ও আমানত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে না বাড়লেও বিদেশি ঋণে অবকাঠামো নির্মাণসহ ৪ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিতে যাচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সম্প্রতি ‘স্ট্রেংদেনিং ইউনিভার্সাল পেনশন সিস্টেম (এসইউপিএস)’ শীর্ষক একটি প্রকল্পের প্রাথমিক উন্নয়ন প্রস্তাব (পিডিপিপি) জমা দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ঢাকার তেজগাঁও শিল্প এলাকায় ৩৬ দশমিক ৩২ শতক জমিতে নতুন অফিস ভবন নির্মাণ করা হবে। একই সঙ্গে মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক বিশ্লেষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও পেনশন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা হবে।
তবে পরিকল্পনা কমিশন সূত্র বলছে, ইউপিএসের বাস্তব চিত্র প্রকল্পের উচ্চাভিলাষের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তিন বছরে স্কিমটিতে মোট আমানত জমা হয়েছে মাত্র ২৪২ কোটি টাকা। জনসাধারণের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় ভবিষ্যতে বড় ধরনের তহবিল গঠনের সম্ভাবনাও অনিশ্চিত। এমন অবস্থায় বিদেশি ঋণনির্ভর অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন। কারণ দেশে ইতোমধ্যেই বৈদেশিক ঋণের চাপ বেড়েছে, পুরনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। একই সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত অর্থায়নের অভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির অর্থায়নের বড় অংশ আসবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ হিসেবে। সংস্থাটি প্রাথমিকভাবে প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে এবং তাদের পাইপলাইনে ১০ কোটি ডলার বরাদ্দ রেখেছে। প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত হলে মোট ২৫ কোটি ডলারের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আলোচনায় বসার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে ইউপিএসের সদস্যভিত্তি সম্প্রসারণের চিত্র একেবারেই হতাশাজনক। ২০২৩ সালের আগস্টে চালুর পর প্রথম ১০ মাসে তিন লাখের বেশি মানুষ এই স্কিমে যুক্ত হন। কিন্তু পরবর্তী প্রায় ২০ মাসে নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছেন মাত্র ৩৮ হাজার ৩৪ জন। বর্তমানে মাসে গড়ে প্রায় ১৫০ জন নতুন নিবন্ধন করছেন, যা কার্যত স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়। সব মিলিয়ে সমতা, প্রগতি, প্রবাস ও সুরক্ষাÑ এই চারটি স্কিমে এখন পর্যন্ত গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩ লাখ ৮০ হাজারে।
এই ধীরগতির পেছনে মূল কারণ হিসেবে অর্থনীতিবিদরা আস্থার সংকটকে দায়ী করছেন। তাদের মতে, পেনশন তহবিলে জমার বিপরীতে প্রত্যাশিত রিটার্ন, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়নি। ফলে প্রাথমিক আগ্রহ থাকলেও তা কমেছে দ্রুত।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রায় চার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণকে অর্থনীতিবিদরা অগ্রাধিকার বিচ্যুতি হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বড় অবকাঠামো নির্মাণের আগে স্কিমটির ভিত্তি মজবুত করা, অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তহবিল ব্যবস্থাপনায় বিশ্বাসযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় এই বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল দেবে না, বরং নতুন করে বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করবে।
সূত্র জানায়, প্রকল্পটি ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পরিকল্পনা কমিশনের নীতিগত অনুমোদন পায় এবং পরে ইআরডিতে পাঠানো হয়। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৩২ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এর মধ্যে ২৫ কোটি ডলার এডিবি ও ৭ কোটি ৫০ লাখ ডলার সরকারের বহন করার কথা ছিল। বর্তমানে এডিবির সম্ভাব্য ১০ কোটি ডলারের অর্থায়নের ভিত্তিতে প্রকল্প ব্যয় কমিয়ে প্রায় ১ হাজার ৪৬৪ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যার মধ্যে সরকারের অংশ ২ কোটি ডলার।
চূড়ান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন ও এডিবির অর্থায়ন নিশ্চিত করতে কারিগরি সহায়তায় একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অননুমোদিত এডিপি তালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্পটি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে অনুরোধ জানিয়েছে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হিসেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পেনশন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অপারেশনাল কাঠামো গড়ে তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, কাঠামোগত উন্নয়নের আগে আস্থার সংকট দূর না হলে এই উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে আর্থিক শৃঙ্খলা ও মিতব্যয়িতা যখন গুরুত্বপূর্ণ, তখন এত বড় ঋণনির্ভর প্রকল্প নেওয়ার আগে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করা জরুরি। কম অংশগ্রহণ অবকাঠামো বা পেনশন কর্তৃপক্ষের সক্ষমতার ঘাটতি নয়; বরং এটি সঞ্চয়ের রিটার্ন ও আস্থার অভাবের প্রতিফলন।”