× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বাঙালির পান্তা সংস্কৃতি

হাসনাত মোবারক

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২৪ এএম

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:১৯ পিএম

হাসনাত মোবারক, পাশে সমরজিৎ রায় চৌধুরীর চিত্রকর্ম। কোলাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশ

হাসনাত মোবারক, পাশে সমরজিৎ রায় চৌধুরীর চিত্রকর্ম। কোলাজ প্রতিদিনের বাংলাদেশ

বসন্ত বৈভব আর রাঙা শিমুলের দিন পেরিয়ে ঋতুর ধারাবিবরণীতে আমাদের এই ভূখণ্ডে আসে গ্রীষ্ম। এই ঋতুর প্রথম মাস বৈশাখ। আর এই মাসের প্রথম দিন থেকেই শুরু হয় বাংলা নতুন বছরের দিন গণনা। হিসাবের খাতায় ‍যুক্ত হয় দৈনন্দিনের নতুন জীবনপঞ্জি। তাই বাংলা বছরের প্রথম দিনটিকে আমরা সাজানোর চেষ্টা করি বর্ণিল আয়োজনে। তবে কালপরিক্রমায় সাংস্কৃতিক ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতের ধাক্কাও এসে লেগেছে বৈশাখের উৎসব যাপনের বেলায়। সেটা মোটা দাগের আলোচনা। 

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর পর থেকে পহেলা বৈশাখের উৎসবটি হয়ে পড়েছে নগরকেন্দ্রিক। ব্যাপক ধুমধামে দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-কাজী নজরুল ইসলামের গান বাজে, নানাবিধ বাঙালি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয় বৈশাখী উৎসব। নগরের যান্ত্রিক যাতনার ধকল উজিয়ে আমরা ঠিকই রমনার বটমূলে, চারুকলায়, শিল্পকলায়, জাতীয় জাদুঘরের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করি। আঁকিয়েরা নতুন ক্যানভাসে তুলে ধরেন বাঙালির হাজার বছরের সংস্কৃতি। কবি তার শব্দ দিয়ে চিত্রকল্প আঁকেন। যে যার মতো এই দিনটিতে ইলিশ-পান্তা খান। বাঙালি সংস্কৃতিতে ইলিশ-পান্তা এখন চল হয়ে গেছে। খেতেই হবে। এজন্য এই দিনটিতে গ্রামীণ জনপদবালাদের নিত্যদিনকার পান্তাভাতের কদর বেড়েছে বহুগুণ। শহুরেরা আহ্লাদে আটখানা হয়ে ইলিশ-পান্তা খায়। এই দিনটিতে নগরের মোড়ে মোড়ে পান্তা বিক্রির ধুম পড়ে যায়। পান্তা বিক্রির জন্য দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসে থাকে। নগরের মধ্যবিত্তরা এই দিনটিতে পান্তাভাতের জন্য এতই মরিয়া হয়ে ওঠে যে, সুযোগ বুঝে পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলো পান্তা বিক্রির ব্যবসায় নেমেছে। বিক্রির সঙ্গে ব্যবসা বা মুনাফার বিষয়টি জড়িত। তাই কীভাবে পান্তাভাতকে বাংলা বর্ষবরণের অংশ করে তুলতে হয়, সেই কৌশলটি রপ্ত করতে পেরেছে বেনিয়ারা। শহুরেরা পান্তাভাতকে সুস্বাদু করে তোলার জন্য কিশমিশসহ আরও দামি খাবার পান্তার সঙ্গে ব্যবহার করছে।

গ্রামীণ নিম্নবিত্তদের ক্ষুধার্ত পেটে পান্তা খাওয়া আর শহুরেদের পহেলা বৈশাখের দিনে একবেলা শখের বসে পান্তা খাওয়ার মধ্যে বিস্তর তফাৎ। শহুরেদের পান্তা খাওয়ার দৃশ্যটি উপহাস হিসেবে পরিগণিত হয় মাত্র। এ ছাড়া বাঙালি সংস্কৃতিকে উদ্ধারের বিন্দুমাত্র লেশ পাওয়া যায় না পান্তা-ইলিশের মধ্যে। 

এটা ঠিক কথা, বাংলা বর্ষবরণ শুধুমাত্র পান্তাভাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বাঙালি কৃষ্টি-সংস্কৃতিকে প্রসারিত করার জন্য পহেলা বৈশাখের উৎসবের কিছু ইতিবাচক দিকও রয়েছে। বাঙালির উত্থান-আগমন, ইতিহাস-ঐতিহ্যগত দিক-পরিক্রমা তুলে ধরা হয় এই বর্ষবরণের মাধ্যমে। বৈশাখকে কেন্দ্র করে সারা দেশেই কমবেশি উৎসব উদযাপিত হয়। এই উৎসবের আমেজ সারা মাসজুড়ে থাকে।

মফস্বল শহরের বাসিন্দারা এই দিনটিতে আয়োজন করে থাকে চড়ুইভাতি। সবাই একবেলা একসাথে খাবার খেয়ে থাকে। বছরে তারা অন্তত একটা দিন সবাই একসঙ্গে আনন্দ করে। পহেলা বৈশাখের দিন শেষে মফস্বল এমনকি গ্রামীণ জনপদের যে আয়োজনটি দৃশ্যগত হয় সেই দৃশ্যটি বাঙালি সংস্কৃতির সাথে চরমভাবে সাংঘর্ষিক। এমন সাংঘর্ষিক ওই দৃশ্যটি নিজ চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না। পহেলা বৈশাখের উৎসবের বিন্দুমাত্র ধারণা ওইসব মফস্বলবাসী টিনএজদের মধ্যে নেই। যদি পহেলা বৈশাখ সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকত, তাহলে উচ্চস্বরে হিন্দিগানের তালে তালে অশ্লীল নৃত্য পরিবেশন করা হতো না বর্ষবরণের নামে। এই দৃশ্যটি গত শতাব্দীতে ছিল না। আগে পহেলা বৈশাখের দিনে গ্রামে গ্রামে লাঠিখেলাসহ আবহমান গ্রামীণ খেলাধুলর আয়োজন করা হতো। তাতে বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয় মিলত। 

বৈশাখী উৎসবকে সামনে রেখে নতুন কাপড়ে হরেক রকমের নকশা তুলতেন গ্রামীণ নারীরা। নিজ হাতে তৈরি করা হতো নকশাদার বাঁশ-বেতের আসবাবপত্র। তাদের কারুকাজে মাটির পুতুল, পাটের শিকা, তালপাতার পাখা, শোলার পাখি, বাঁশের বাঁশি, ঝিনুকের ঝাড়, পুতির মালা ইত্যাদি তৈরি করা হতো। তৈরিকৃত জিনিসপাতি গ্রামীণ মেলায় বিক্রির জন্য তোলা হতো। গ্রামের শৌখিন নারীরা মাটির দেয়ালে দেয়ালে আলপনা ও ফুল-পাখির নকশা এঁকে নিজেদের আঙিনার শোভাবর্ধন করতেন। গ্রামীণ বাংলার মানুষদের হস্তখচিত রেখার চিহ্ন পরিস্ফুট হয়ে উঠত। 

তৈরিকৃত ব্যবহার্য জিনিসের পসরা নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে বসত বৈশাখী মেলা। মেলায় আগতরা ঘর-গৃহস্থালির কাজে লাগে এমনসব প্রয়োজনীয় জিনিসপাতি সংগ্রহ করে নিত এই মেলা থেকে। এইসব গ্রামীণ মেলায় বাঙালির বৈচিত্র্যময় জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে সম্যক ধারণা পাওয়া যেত। এখনও দেশের নানান প্রান্তে আয়োজিত হয়ে থাকে বৈশাখী মেলা। সেখানে ছিটেফোঁটাভাবে লোকজ গানসহ বাউল সুফি ঘরানার গানের আয়োজন করা হয়।

সবশেষে বলা যায়, বর্তমানে পহেলা বৈশাখ ও পান্তা সংস্কৃতি এ দুটিই বাঙালির জীবনযাত্রার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত হলেও এর প্রকৃত তাৎপর্য অনেকাংশে নির্ভর করে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চর্চার ওপর। কেবল বাহ্যিক আয়োজন, ফ্যাশন বা বাণিজ্যিক প্রবণতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে এই উৎসব তার মৌলিক চেতনা হারিয়ে ফেলবে। পান্তা-ইলিশের বাহুল্য নয়, বরং বাঙালির ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি, পারস্পরিক সৌহার্দ্য এবং শেকড়ের প্রতি টানই হওয়া উচিত বর্ষবরণের মূল শক্তি। তাই প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা, যাতে আধুনিকতার ছোঁয়া থাকলেও তা যেন আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির স্বকীয়তাকে আড়াল না করে, বরং আরও সমৃদ্ধ করে তোলে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা