পাভেল পার্থ
প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৭ এএম
গবেষক ও লেখক পাভেল পার্থ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
এক নিষ্ঠুর যুদ্ধের ভেতর দাঁড়িয়ে আছি আমরা। জীবন, রক্ত ও নিখোঁজ জীবাশ্মের ওপর। নিখিলের ডাক কেউ শোনেনি। কারোর অন্তরেই জলা বা জঙ্গল, জমি বা ভ্রূণ কোনো কিছুর জন্যই কোনো মায়া নেই। কেউ যুদ্ধ থামায়নি। বারুদ কারখানাগুলোকে বাতিল করেনি। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বহুত্ববাদী আশা-আকাঙ্ক্ষার আওয়াজও ক্রমশই বিলীন ও বিস্মৃত। নদীতে বাস তলিয়ে বা কারখানায় দরজা বন্ধ করে কাঠামোগত হত্যা থামেনি। এখনও শখের বশে সাত বস্তা পাখি খুন করা হয়, বাসের লকারে দমবন্ধ করে হত্যা হয় ছাগল। ১৪৩২ বাংলাতে এসেও শিশুদের টিকা বন্ধ হয়ে যায়। ছড়িয়ে পড়ে হাম। যুদ্ধের পরে দেশজুড়ে তেলের সংকট বাড়ে। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় তেল ও পানির লাইন। অথচ এই মৃত্যুমিছিল আর রক্তদাগ পেছনে ফেলেই পৃথিবী থেকে ৫৪ বছর পর চাঁদের পানে ছোটে মানুষ। এই গ্রহের সকল তর্ক আর জবরদস্তিকে অমীমাংসিত রেখে চাঁদের কক্ষপথ থেকে কী দেখে মানুষ?
দুনিয়াজুড়ে জুলুম আর জখমের ক্ষত নিয়ে আবার একটি নতুন বছরের সন্ধিক্ষণে আমরা। বাংলাদেশের মানুষ প্রতিটি ঋতুর সন্ধিক্ষণে নতুন ঋতুতে যাত্রার আগে মঙ্গল প্রার্থনা করে। সর্বপ্রাণ ও সর্বজনের মঙ্গল। বর্ষবিদায় ও বরণের কৃত্য ও উৎসব তাই সমষ্টিগত মঙ্গল আরাধনা। বাংলাদেশের নিম্নবর্গের যাপিতজীবনে কৃত্য মানে এক স্রোতস্বী সঞ্জীবনী। যার পরতে পরতে জনজীবনের বিশ্বাস, রীতি ও চর্চার বীজদানাগুলো অংকুরিত হয়ে থাকে। নিম্নবর্গের কৃত্য-র্দশন হলোÑ প্রাণ ও প্রকৃতির আরাধনা। সর্বপ্রাণ ও সর্বজনের তরে মঙ্গল প্রার্থনার আরাধনাই হয়ে ওঠুক নতুন বছরে আমাদের এক দুর্বিনীত শপথ।
বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদে বাঙালি হিন্দু নারীর শস্য ফসলসহ মানুষের বীজ ও বংশ রক্ষার নানান কৃত্য রীতি আছে। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বাংলা কার্তিকসংক্রান্তিতে আয়োজিত ‘জালাবর্ত’ এমনই এক গ্রামীণ আয়োজন। কার্তিক ও আশ্বিন মাসে এখানকার গ্রামীণ জনপদ ভোলাসংক্রান্তি ও ওলাসংক্রান্তি পালন করে। এগুলো প্রতিটিই কৃষি লোকাচার। নারীরাই যে ক্ষেত কৃষির প্রাণ, নারীর মাধ্যমে পালিত এসব কৃষি আচার দেখলেই তা বোঝা যায়। মূলত শস্য ফসলসহ সন্তানের আয়ু ও মঙ্গল কামনায়, বীজ ও সন্তানের বংশ রক্ষায় এই ব্রত পালন করা হয়। জালাবর্তে জালা হলো মাঙ্গলিক চিহ্ন। জালা যেভাবে ফুটে ওঠে এভাবে যেন কৃষির বীজ ও বংশের বীজ ফুটে ওঠে।
বাংলাদেশের এক অচ্ছুত প্রান্তিক জাতির নাম বাগদী। অগ্রহায়ণ থেকে পৌষের প্রথমদিকে আমন মৌসুমের ধান কাটা হয়। ঝরে পড়া ধান ইঁদুরেরা তাদের গর্তে সংগ্রহ করে। বাগদী নারী এবং শিশু কিশোরীরা ইঁদুরের গর্ত থেকে ধান সংগ্রহ করতে নামে। বাগদীদের বিয়েতে কনে বিদায়ের সময় তার শাড়ির আঁচলে ইঁদুরের গর্তের মাটি ও কিছু দেশি আমন ধানের বীজ বেঁধে দেওয়া হয়। যাতে পরবর্তী জীবনে এই ইন্দুরগাতির ধানই তাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। এই মাটি ভবিষ্যতের মঙ্গলের প্রতীক।
সুন্দরবনের বনজীবীরা বিশ্বাস করেন বনের রক্ষাকবচ মা বনবিবি। মধু, মাছ, কাকঁড়া কি গোলপাতা সংগ্রহকালে বনজীবী মৌয়াল-বাওয়ালিরা সুন্দরবনের কাছে বনে প্রবেশের অনুমতি নেন। বনবিবি, গাজী কালু চম্পাবতী, আলীবদর, খোয়াজখিজির, দুখে, শাহ জঙ্গলী, দক্ষিণরায়, রায়মণি, বড় খাঁ গাজীর কথা স্মরণ করে জঙ্গল এবং বনজীবীদের মঙ্গল প্রার্থনা করে মুরগি মানত করে ছেড়ে দেন বনের ভেতর।
গ্রামীণ নিম্নবর্গ ভূমিকে কেবলমাত্র ‘উর্বরতা’ বা ‘উৎপাদনস্থল’ হিসেবে বিচার করে না। ভূমি ও মাটি মানুষের যাপিতজীবনের অংশ, সংসারের একজন। তাই এই জনপদে ভূমিকে ঘিরে আছে নানান কৃত্য-আচার রীতি ও উৎসব। বাঙালি সনাতন ও কিছু আদিবাসী সমাজের ভেতর পৃথিবীকে নারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নারীর যেমন এক নির্দিষ্ট ঋতু ও কালে ঋতুস্রাব হয় ঠিক তেমনি এক নির্দিষ্ট কালে পৃথিবীরও ঋতুস্রাব হয়। কৃষক পরিবারের নারীদের ভেতর এসময় আষাঢ় মাসে অম্বাবচী বা আমাতি ব্রত পালন করতে দেখা যায়। ভূমির মঙ্গল কামনায় সুস্বাস্থ্যের জন্য এসময় মাটিতে দাগ কাটা যায় না, আগুন জ্বালানো যায় না, কোনো বপন বা খোঁড়া যায় না, মাটিকে কোনো কষ্ট দেওয়া যায় না।
বর্ষবিদায়ের আচার কৃত্য দেশের নানা অঞ্চলে নানারকম। তবে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে হাম, বসন্তসহ নানাবিধ রোগ ছড়িয়ে পড়ে বলে গ্রামের সকলের সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল প্রার্থনায় শীতলা, ওলাবিবি, পুন্টাডি পরব আয়োজন করা হয়। গোপালগঞ্জ-মাদারীপুরের চান্দারবিল এলাকায় হেচড়া দেবীও পূজিত হন বসন্তকালে খোসপাঁচড়া নিরাময়ের মানতে। হেচড়া পূজার পুরো পনের দিন জুড়ে থাকে শিশুদের আনন্দ আর নিত্যনতুন প্রকৃতি পাঠের আসর। এখানে শিশুরা প্রতিদিন নানান ফুলের নাম-পরিচয় জানে, খোসপাঁচড়া ও চুলকানি সম্পর্কে সচেতন হয় এবং সচেতন করে তোলে, সংগঠিত হয়ে কাজ করার মানসিকতা জন্মায়।
মৌলভীবাজারের মণিপুরি মুসলিম পাঙাল আদিবাসীরা শবেবরাতের রাতে গোষ্ঠীর সকলে মিলে শিরনি রান্না করেন, কেউ কেউ ক্ষীর ও পিঠা তৈরি করেন। এ সময় লুধাওৗবা/লুধৗওবা নামের পিঠা মঙ্গল কামনায় নিয়ত করে বানানো হয়। নিয়ত পূরণের জন্য এ পিঠা ‘লুট’ দেওয়া হয়। বর্ষবিদায় ও বরণের আয়োজনে পাঙাল গ্রামে মেয়েদের গিলাখেলা অনুষ্ঠিত হয় বেশ বর্ণাঢ্য আয়োজনে।
বাংলাদেশের জেলেজীবনে জল ও মাছের রক্ষাকবচ গঙ্গা ও খোয়াজখিজির। জেলেদের বিশ্বাস, জলের প্রাকৃতিক ধারা এবং মাছের বংশ রক্ষা করেন তারা। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাস মাছের রেণু ছাড়ার মাস। প্রথাগত জেলেরা এ সময়টাতে মাছ ধরেন না। কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে নদী-হাওর-বিলে গাছের মরা ডাল, বাঁশ, লতাপাতা, জারমনি (কচুরিপানা) দিয়ে ‘কাটা/কাঠা’ করে রাখা হয়। কাটা মানে মাছের পোনার বিশ্রামঘর, আবাসস্থল। এটি মাছ ও জেলেজীবনের জন্য মঙ্গল প্রার্থনা। পৌষ বা মাঘে নিয়ম করে কাটা ভেঙে মাছ ধরা হয়।
শিলাবৃষ্টি থেকে জমিনের ফসল রক্ষায় হাওর এলাকায় ‘হিরালপ্রথা’ চালু আছে। হিরালেরা নিজস্ব জ্ঞানের মাধ্যমে হাওরকে শিলাবৃষ্টির বরফ থেকে রক্ষা করেন। মধুপুর শালবনের মান্দিরা গরাইয়া আমুয়া (পূজা) পালন করেন বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টি থেকে জুমফসল রক্ষার তাগিদে। আবার ঠিক একইভাবে যখন খরাময় হয়ে যায় চতুর্দিক, বৃষ্টিহীনতা রুক্ষ করে তোলে চারপাশ, সমতলের বাঙালি জনপদে ঘটা করে আয়োজন করা হয় ব্যাঙের বিয়ে। উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজে আয়োজিত হয় হুদুমদেও ব্রত। এসব কৃত্য ও প্রথার ভেতর দিয়ে সামাজিকভাবে কৃষি উৎপাদনের জন্য মঙ্গল কামনা করা হয়।
গ্রামে বর্ষবিদায়ের আচারগুলো বেশি আয়োজিত হয় এখনও, শহরে যেমন বর্ষবরণের উৎসব আয়োজন হয় নয়া নাগরিক দ্যোতনায়। তবে গ্রাম কি শহরে সর্বত্র বাংলা পঞ্জিকার চল উঠে গেছে। আগে পঞ্জিকা দেখে চাষাবাদের রেওয়াজ ছিল অনেক পরিবারে। বাঙালি জনপদে চৈত্র মাসে শিমুইর (শিম), ফাল্গুনে মুলা, শ্রাবণে কচু, আষাঢ়ে ওল, জ্যৈষ্ঠে গিমাতিতা শাক, কার্তিকে ওল খায় না অনেকে। শ্রাবণ মাসে কলাগাছ লাগানোর নিয়ম নেই, কারণ এ মাসেই বেহুলা লখিন্দরকে নিয়ে কলার ভেলায় ভেসেছিল। এখনও গ্রামে রাতের বেলায় মানুষ গাছের পাতা ছেঁড়ে না, যদিও সিটি করপোরেশন গভীর রাতেই ঘুমন্ত গাছেদের কাটে শহরে। ত্রিসন্ধ্যা, সন্ধ্যা, রাত ও ভোররাতে কোনো কিছু বপনের নিয়ম নেই। চলনবিলের বহু বাঙালি মুসলিম পরিবারে বুধবারে বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কাটে না, বুধবারকে মাদারিয়া বার হিসেবে দেখে তারা।
হাওরাঞ্চলে করচ, বরুণ, হিজল, তমাল, কদম, শ্যাওড়া, বট, পাকুড়, অশ্বত্থ কিংবা ওঁরাও-মুন্ডা-সাঁওতাল আদিবাসীরা কারাম গাছকে পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে সুরক্ষা করেন। যেকোনো বিপদ ও সংকট থেকে মুক্তির জন্য এসব বৃক্ষতল মানুষকে নিরাপত্তার ছায়া দেয়। বর্ষবিদায় কি বরণের মতো গ্রামীণ নিম্নবর্গের সকল কৃত্য, আচার, পার্বণ কাল থেকে কালে রক্ষা করে চলে দুনিয়ার প্রাণ ও প্রকৃতির বংশধারার গতিময়তা। নিম্নবর্গের কৃত্যজীবন সরাসরি তার ঐতিহাসিক শ্রম ও উৎপাদনসম্পর্কের সাথে জড়িত। এই সম্পর্ক সর্বপ্রাণ ও সর্ববনের মঙ্গল প্রার্থনা করে তার সকল সামাজিক আয়োজনের ভেতর দিয়ে। আমরাও এই গ্রহ এবং এই গ্রহের সকল বাসিন্দার জন্য এক মঙ্গলময় নতুন বছরের দাবি রাখি।
পাভেল পার্থ
গবেষক ও লেখক