× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

পহেলা বৈশাখের ভাবনা

সনৎকুমার সাহা

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৪৪ এএম

প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্রাবন্ধিক সনৎকুমার সাহা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অনেকের মনেই আজ এ প্রশ্ন জাগতে পারে, আমরা যে এত ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি তা কিসের জন্যে? কী পেলাম আমরা? যা পেলাম, তাই কি আমরা চেয়েছি? আর কী-ই বা হলাম? এই কি ছিল আমাদের অনিরোধ্য পরিণতি? স্বপ্নভঙ্গের হতাশা যদি আজ আমাদের আচ্ছন্ন করে থাকে, তবে প্রত্যাশার ছবিটিকে একবার খুঁটিয়ে দেখা ভালো। যদি দেখি, গলদ রয়েছে গোড়াতেই, তবে শুরু করতে হবে আবার গোড়া থেকেই।

এ কথা সত্য নয় যে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম একটা তাৎক্ষণিক হুজুগের বিস্ফোরণ। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা হঠাৎ এক দিনে জাগ্রত হয়নি। ধীরে ধীরে কখনও গণ-মানসের অবচেতনায়, কখনও বা আবেগ-আগ্রহের প্রত্যক্ষতায় তা তিল তিল করে গড়ে উঠেছে।

বাহান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ের গণ-আন্দোলন তাকে ক্রমশ সংহত করেছে, তার রূপকে স্পষ্টতর, কঠিনতর ও তীক্ষ্ণতর করে তুলেছে, তার সমগ্র সত্তাকে অবশেষে গণচেতনার পূর্ণতায় পরিব্যাপ্ত করেছে। এই আকাঙ্ক্ষা শুধুই প্রতিবাদের নিরবয়ব উচ্চারণ ছিল না, ছিল না প্রতিশোধের ক্রোধান্ধ উন্মত্ততা অথবা কেবল স্বেচ্ছাচারের নৈরাজ্যিক উচ্ছৃঙ্খলতা। আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন কল্পনার এক সুনিশ্চিত ভূমি ছিল। এদেশের মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ধারাবাহিক অভিঘাত তার পরিপ্রেক্ষিত রচনা করেছিল। আর এসবের মর্মমূলে প্রেরণা জুগিয়েছিল বাহান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারির বহুদ্যুতিময় চেতনা।

পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক জাঁতাকল থেকে মুক্তি এটা ছিল আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্নকল্পনার একটা দিক, বোধহয় গণায়িত আকাঙ্ক্ষায় মূর্ত মোটা দাগে আঁকা প্রবলতম তাগিদ। ঔপনিবেশিক শোষণ, অভ্যন্তরীণ সম্পদের নিয়মিত লুণ্ঠন, প্রতিদিনের অপমান, প্রতিকারহীন অত্যাচার এসব সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মনে তীব্র ক্ষোভ ও প্রচণ্ড ঘৃণার সঞ্চার করেছিল। তারই প্রেক্ষাপটে বাঙালি তার জাতিসত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করতে শুরু করেছিল। একুশে ফেব্রুয়ারির পবিত্র শোক রূঢ় আঘাতে তাকে চিনিয়ে দেয় তার আপন অস্তিত্বের প্রাণপ্রতিমাকে। আর ওই শোষণের অবসান, অত্যাচার থেকে পরিত্রাণ, সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহার, অপমানিত মানুষের অমিত উত্থান এগুলো হয়ে উঠতে থাকে তার সার্থকতার লক্ষ্যবিন্দু। এইভাবে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের আকাঙ্ক্ষার সাথে যোগ হয় সব রকমের শোষণমুক্তির কামনা। সব মিলে গড়ে উঠতে থাকে স্বাধীনতার স্বপ্নকল্পনা। সন্দেহ নেই, আমাদের গণচেতনায় তা সঞ্চিত হচ্ছিল আমাদের বাস্তব অভিজ্ঞতার পাল্টা প্রক্রিয়ায়। পথের হিসেবটা খুব স্পষ্ট ছিল না। কিন্তু অভিজ্ঞতার চাপে মূল্যবান হয়ে উঠছিল আবহমান বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদ; একনায়কত্বের বর্বরতার বিপরীতে কম মনে হচ্ছিল সর্বসাধারণের গণতন্ত্র, আর সব রকম অসাম্য দূর করার ক্রমবর্ধমান তাগিদে আগ্রহ জাগছিল সমাজতন্ত্রে। কোনোটিই অবশ্য তখনও জীবনে আচরিত সত্য হয়ে ওঠেনি। বাস্তবের অরুচিকর অভিজ্ঞতার বিকর্ষণেই তাদের ধারণা গণচেতনায় শ্রেয় হয়ে উঠছিল। তবে বিমূর্ত ধারণার চেয়ে সম্ভাব্য প্রাপ্তির আশাই বোধহয় গণমানসে আলোড়ন তুলেছিল অনেক বেশি। পাকিস্তানি শোষণ দূর হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অর্থনীতিতে মুক্তি আসবে, সম্পদ পাচার বন্ধ হবে, আমরা অনেক সচ্ছল হব, যার জমি নেই, সে জমি পাব, যার হাল-লাঙল-বলদ নেই, সে হাল-লাঙল-বলদ পাব, দুবেলা সবাই পেট পুরে খেতে পাব, ছোট দোকানদার বড় ব্যবসায়ী হব, ছোট আমলা বড়কর্তা হব এইসব অপ্রত্যাশায় তৎপর হয়ে ওঠে দেশের বিভিন্ন স্তরের মানুষ। তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষায় ফুটে উঠতে থাকে স্বাধীনতার ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য একটা কল্পনা। একটু ভেবে দেখলেই ধরা পড়ে ওইসব ব্যক্তিগত স্বপ্নবাসনা একে অন্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। বরং তারা ছিল একে অন্যের প্রতিযোগী। শুধু স্বাধীনতা সংগ্রামে সবাই জড়ো হয়েছিল এইসব আশা-আকাঙ্ক্ষার আকর্ষণে। সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তাদের সংযত করার তেমন কোনো উদ্যোগ লক্ষ করা যায়নি। ঔপনিবেশিক শক্তির বিরোধিতায় সবাইকে একত্র করাই ছিল তখন অন্যতম লক্ষ্য। কিন্তু এইসব প্রত্যাশাপূরণ, এবং তা চাইবামাত্রই, যে কত দুঃসাধ্য, তা সে সময় কেউ তেমন তলিয়ে দেখেননি; অথবা, হয়তো দেখতে চাননি। পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক কাঠামোয় একটা সামাজিক-অর্থনৈতিক বিন্যাস ধীরে ধীরে ফুটে উঠছিল। সন্দেহ নেই তার ভিত ছিল দুর্বল। এদেশের সঞ্চয় পাচার হয়ে যাচ্ছিল পশ্চিম পাকিস্তানে। ব্যাংকব্যবস্থা ছিল প্রায় সবটাই পশ্চিম পাকিস্তানি কারবারিদের হাতে। ফলে ব্যাংকে গচ্ছিত সঞ্চয়ের ব্যবহার ছিল একরকম তাদেরই অধিকারে। তা ছাড়া বাজারও ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসক শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে। এদেশের মানুষ পশ্চিম পাকিস্তানি পণ্যের জন্যে যে হারে দাম দিত, তাদের নিজেদের তৈরি পণ্যসামগ্রীর বিনিময়ে দাম পেত তার চেয়ে অনেক কম। এই প্রক্রিয়ায় আমাদের ক্রয় ও সঞ্চয়ক্ষমতা হ্রাস পেত, অন্যদিকে তা বেড়ে যেত পশ্চিম পাকিস্তানি কারবারিদের। সরকারি নীতি প্রবলভাবে পক্ষপাতিত্ব দেখাত পশ্চিম পাকিস্তানের উঠতি শিল্পপতিদের। ব্যাংকঋণ থেকে শুরু করে করছাড় পর্যন্ত সব রকম সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা ছিল তাদের জন্যে। এমনকি এদেশেও তখন যেসব শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছিল, সেগুলোও ছিল প্রধানত তাদেরই মালিকানাধীন। ওইসব শিল্প-কারখানার লভ্যাংশও পাচার হয়ে যেত পশ্চিম পাকিস্তানে। দ্রব্যসামগ্রীর পাইকারি বাজার সবটাই ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি কারবারিদের দখলে। ফটকাবাজির উপরি লাভ বাড়িয়ে তুলত তাদের সঞ্চয়কেই।

বৈদেশিক সাহায্যনির্ভরতা এই বিন্যাসের ছিল আরও একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। পাকিস্তানে সমগ্র বিনিয়োগের অধিকাংশটাই আসত বৈদেশিক সাহায্যের পথ বেয়ে। আমেরিকার সঙ্গে ছিল সামরিক অর্থনৈতিক চুক্তি। প্রকৃত স্বাধীনতা তাতে ক্ষুণ্ন হতো। রাষ্ট্রীয় শাসক বিদেশি প্রভুর পদানত থাকত। কিন্তু প্রভু অনুমোদিত খাতে বিনিয়োগের সাজসরঞ্জাম সহজ শর্তে পাওয়া যেত। তা ছাড়া ষাটের দশক থেকে নিয়মিত খাদ্যঘাটতি পূরণে দেশি শাসকদের নিশ্চিন্ত নির্ভরতা অব্যাহত ছিল আমেরিকার সাহায্য সরবরাহের ওপর। এর ফলে আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়াবার দিকে তেমন কোনো নজর পড়েনি। কৃষি উৎপাদন বাড়াবার তাগিদও ভেতর থেকে গড়ে ওঠেনি। বিদেশি সাহায্য নিয়ে কৃত্রিমভাবে বাজারের স্থিতাবস্থা বজায় রেখে আমাদের কৃষিপণ্যের দাম বরাবর নিচু স্তরে চেপে রাখা সম্ভব হয়েছে। উৎপাদকদের উৎসাহ জোগাবার কোনো সক্রিয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যদিও পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিদের রপ্তানি বোনাস ও অনুরূপ আরও অনেক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে তাদের বাড়তি লাভের নানা পথ খুলে দেওয়া হয়েছে। কৃষি উৎপাদনে এই যে সচেতন অবহেলা, এর পেছনেও শাসক শ্রেণির কায়েমি স্বার্থ কাজ করছিল, কৃষিতে সত্যিকারের উন্নতি আনতে হলে প্রয়োজন উৎপাদন সম্পর্কে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। চাই ভূমি সংস্কার ও উৎপাদনব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর। এতে অনিশ্চিত হয়ে পড়ত শাসক শ্রেণির ক্ষমতার ভিত্তি। সুলভে উৎপাদন উপকরণ বিলিয়ে ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে শোষণের অবাধ সুযোগ করে দিয়ে গ্রামীণ জোতদার, মহাজন, আড়তদার ও মাতব্বরদের হাতে রাখা সম্ভব। সমাজকাঠামোর পরিবর্তন ঠেকিয়ে রাখা গেলে তারাই নিয়ন্ত্রণ করে সমগ্র গ্রামীণ জীবনকে। ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণ নিরঙ্কুশ হয় তারা হাতে থাকলে; যদিও তা রুদ্ধ করে সমস্ত উন্নতির গতিপথ। ভূমি সংস্কার ও উৎপাদন ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর একদিকে যেমন উৎপাদিকা শক্তির পূর্ণতর ব্যবহারের সম্ভাবনা উন্মোচিত করত, অন্যদিকে তেমনি গ্রামীণ ক্ষমতাচক্রের কায়েমি ব্যবস্থাকেও ধ্বংস করতে পারত। সেটা পরনির্ভর ঔপনিবেশিক শাসক শ্রেণির স্বার্থের অনুকূল হতো না। তাদের আপন অস্তিত্বের জন্যেই জরুরি গতানুগতিক গ্রামীণ ক্ষমতাচক্রের পরিপুষ্টি সাধন ও উভয়ের পারস্পরিক সমর্থন। কারণ পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থা সমস্ত ঔপনিবেশিক সম্পর্ক সম্বন্ধকেই অস্বীকার করতে পারত। অতএব কৃষি উন্নয়নে নজর না দিয়ে বৈদেশিক সরবরাহ দিয়ে ঘাটতি মেটানো ছিল শাসক শ্রেণির জন্যে অনেক বেশি নিরাপদ। খাদ্যশস্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রেখে তার সরবরাহ মোটামুটি নিশ্চিত করে সাধারণ ক্রেতাদের তাতে অনেকটা সন্তুষ্ট রাখা যেত; গ্রামীণ অসন্তোষ ও অভ্যুত্থানের আশঙ্কাকেও ফলে বিনষ্ট করা সহজ হতো।

এ জাতীয় আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় দুটো জিনিস বিশেষ প্রকট হয়ে ওঠে। এক, গতানুগতিক গ্রামীণ ও নতুন এক নাগরিক পরনির্ভর সুযোগসন্ধানী, সুবিধাভোগী শ্রেণির প্রশ্রয় লাভ। এবং দুই, কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান না হলেও বৈদেশিক সাহায্য দিয়ে সরবরাহের ঘাটতি মিটিয়ে অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংকট পাশ কাটিয়ে যাওয়া। তাদের প্রভাবে কতগুলো অভ্যাস গণজীবনে রপ্ত হয়ে যায়। বিদেশি ভোগ্যপণ্য বাজারে থাকে তুলনায় সহজলভ্য। তাদের ব্যবহার অথবা ব্যবহারের বাতাবরণে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে সব শ্রেণির মানুষ। এমনকি যারা এই ঔপনিবেশিক অবস্থার আবসান আন্তরিকভাবে চায়, তারাও। বিদেশি গাড়ি, টেলিভিশন, ইলেকট্রনিক দ্রব্যসামগ্রীÑ এসব থাকে মধ্যবিত্তেরও নাগালের ভেতরে। নিত্যব্যবহার্য ভোগ্যপণ্যেরও একটা বৃহৎ অংশ থাকে বিদেশ থেকে আমদানি। অন্যদিকে সংকট মোচনে ও স্বনির্ভরতা অর্জনে যে কষ্ট স্বীকার প্রয়োজন, তার কোনো প্রস্তুতি সমাজে গড়ে ওঠে না, যদিও ঔপনিবেশিক শোষণে আমরা যে সর্বনাশের দিকে এগুচ্ছি, এই বোধ তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। একটি বিকৃত ভোক্তা সমাজ গড়ে ওঠার প্রশ্রয় পায় এবং তা উৎপাদনকে একেবারে উপেক্ষা করেই। আমাদের না থাকে উৎপাদনে স্বাধিকার অর্জনে ব্রতী হবার, আরাম আয়েশ ত্যাগ করে অভাবকে মেনে নেবার অভিজ্ঞতা, না থাকে তার দায়দায়িত্ব সম্পর্কে কোনো সামগ্রিক বাস্তব চেতনা। শুধু স্বাধীন হলে যে আমরা সমৃদ্ধ হব, এই স্বপ্ন তার বিপুল রঙবাহারে আমাদের প্রেরণা জোগায়।

একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রামের ধ্বংসযজ্ঞে আমাদের শিল্প ও পরিবহন ব্যবস্থা যেটুকু গড়ে উঠেছিল, তাও ক্ষতিগ্রস্ত হয় ভীষণভাবে। ফলে আমাদের শুরু করতে হয় এক রকম শূন্য থেকেই। কিন্তু একই সঙ্গে থাকে পুরনো অভ্যাস আর নতুন প্রত্যাশা। আর্থ-সামাজিক কাঠামোর প্রেক্ষাপটও যায় বদলে। দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক সম্পর্ক সম্বন্ধগুলো অস্বীকার করতে চাওয়া হয়। ফলে পরনির্ভরতার মুরুব্বিদের উপেক্ষা করেই সামগ্রিক অস্তিত্বকে দৃঢ়মূল করতে চাই। এতদিন একটু-আধটু চাকচিক্য আর রবরবা দেখানো চলছিল হুজুরের দাসত্বের বিনিময়ে ছুড়ে দেওয়া দয়া আর বকশিশের টুকরোগুলো চার হাতপায়ে ছিঁড়ে খেয়ে। এখন ঔপনিবেশিক প্রভুত্বকে অস্বীকার করতে চাওয়ায় আমাদের হাত পাতবার দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর অর্থনীতির ভেতরের ঘাটতিগুলোর বিকট হাঁ অকস্মাৎ চোখের সামনে তাদের বিশাল গহ্বর নিয়ে বেরিয়ে আসে। গতানুগতিক পন্থায় এই অবস্থার মোকাবিলা সম্ভব ছিল না। প্রয়োজন ছিল সমাজকাঠামোয়, প্রশাসনে ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তত্ত্বগতভাবে তার স্বীকৃতিও মিলেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজবাদকে চার মৌলনীতি ঘোষণা করায় বিকল্প পন্থার তাগিদটাই বিশেষ করে ধরা পড়েছিল। বঙ্গবন্ধু এটাও বুঝেছিলেন, স্বাধীন রাষ্ট্রনীতি নিয়ে জনগণের বিপুল প্রত্যাশা পূরণ তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব নয়। বরং স্বাধীনতার মূল্য দিতে সবাইকেই মেনে নিতে হবে অপরিসীম কৃচ্ছ্রসাধন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি তাই ঘোষণা করেছিলেন, জনগণকে কিছুই দিতে পারবেন না তিনি প্রথম চার বছর।

কিন্তু অভ্যাস ও প্রত্যাশার সঙ্গে বিরোধ বাধে বাস্তব অবস্থার। পাকিস্তানি শাসনে-শোষণে আমরা যে বঞ্চিত হচ্ছি, একথা সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু বঞ্চনা এড়াতে গেলে প্রাথমিকভাবে কষ্ট স্বীকারই যে হবে আমাদের অনিবার্য নিয়তি, এই ভবিতব্য সম্পর্কে সচেতন থেকে তাকে মেনে নিতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন খুব কম জনই। বরং বঞ্চনার অবসানের অর্থ ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকের অচরিতার্থ বাসনা পূরণ, এই বোধই প্ররোচনা জুগিয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের অনেক মানুষকে। যখন আমাদের নিজস্ব অর্থনীতির প্রকৃত চেহারাটা সমস্ত অভাব নিয়ে প্রকট হয়ে ফুটে ওঠে, তখন তারই বিপরীতে বুভুক্ষু প্রত্যাশাগুলো যেখানে যেটুকু সুযোগ পায়, তার ওপরই ঝাঁপিয়ে পড়ে। অধিকাংশ মানুষ দেখে, ইচ্ছাপূরণ নেহাৎই অবাস্তব মরীচিকা। শুধু তাই নয়, অভাব সুড়ঙ্গ খোঁড়ে অভ্যস্ত ভাঁড়ারেও। ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ, তিক্ত মানুষ হতাশায় ফেটে পড়ে, স্বাধীনতা আমাদের ঠকিয়েছে, এর সবটাই জোচ্চুরি।

প্রত্যাশা পূরণের প্রতিযোগিতায় সংঘবদ্ধভাবে অভাবের মুখোমুখি হবার সংগ্রামী চেতনাটুকুও হারিয়ে যায়। মুষ্টিমেয় যারা সুযোগ পায়, তারা নিজ নিজ আখের গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সহমর্মিতা বা সার্বিক কল্যাণের লক্ষ্য প্রেক্ষাপট থেকে যেন মুছে যায়। ঐক্য চেতনার বিপুল বিস্তারে ভাটার টান ধরে।

প্রথমত বাজার-নির্ভর অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার যে সম্ভব নয়, এ কথা স্বাধীনতার প্রথম চার বছরে ক্ষতলাঞ্ছিত অভিজ্ঞতার ভিতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ দেশের সব সুস্থ প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তকের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। সংবিধানে স্বীকৃত গণতন্ত্র ও সমাজবাদকে বাস্তবে অর্থবহ করে তোলার প্রয়োজনটা বারবার সামনে চলে আসছিল। শোষিতের গণতন্ত্রের পথে সমাজবাদে উত্তরণের কথা প্রায়শই শোনা যাচ্ছিল বঙ্গবন্ধুর মুখে।

কিন্তু সেও তো এক স্বপ্নকল্পনা। প্রস্তুতিপর্বও তখনও সমাপ্ত হয়নি। যে দক্ষ, সৎ, নিবেদিত কর্মীবাহিনী সমাজের কর্মযজ্ঞে প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রয়োজন, তার সাংগঠনিক ধারণাটুকুও তখনও স্পষ্ট রূপ পায়নি। প্রশাসনিক কাঠামোয় ও সম্পদ ব্যবহারের প্রক্রিয়ায় যে মৌল পরিবর্তন জরুরি, তা বাস্তবায়নের উপযোগী মানসিকতা ও পরিস্থিতি তখনও গড়ে ওঠেনি। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের স্বাধীন সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেলেন পুরোনো প্রশাসন ব্যবস্থা, যার ঘাটে ঘাটে কর্মরত পুরোনা অভিজ্ঞতায় নিমজ্জিত ছাতলাপড়া আমলা বাহিনী। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কি সরকারে, কি বিপক্ষে প্রত্যাশা জাগানোয় সিদ্ধকাম, কিন্তু প্রত্যাশা পূরণে অপ্রস্তুত। সমাজবাদ যাদের কাছে মনোহারি স্লোগান, তারাও ভেবে পান না এগুবার পথটা কী? ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক অসাধুতা এগুলোও ফাঁকা বাসা দখল করে অভ্যাসের উত্তরাধিকারে।

স্বাধীনতা অতএব তেতো হয়ে যায় অচিরেই। ঔপনিবেশিক মানসিকতায় লালিত বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর ব্যবস্থার সম্পর্ক সম্বন্ধগুলোকে রাতারাতি পালটে ফেলা যায় না। ওদিকে বৈদেশিক সাহায্যের অভাবে সংকট দেখা দেয় উৎপাদনে ও সরবরাহে। সঠিক দিকনির্দেশনায় ব্যর্থতার দরুন মার খায় জাতীয়করণ নীতি। কৃষি উৎপাদনে উৎসাহ দিয়েও ঠেকানো যায় না দুর্ভিক্ষকে। বঙ্গবন্ধু উদ্ধারের শেষ চেষ্টা করেন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিয়ে। প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোকে তিনি ঢেলে সাজাতে চান। কৃষিতে আনতে চান বাধ্যতামূলক সমবায়। কিন্তু এই উদ্যোগে যতটা মরিয়া ভাব ছিল, ততটা জাতীয় প্রস্তুতি ছিল না। যদিও এই প্রক্রিয়ায়, সন্দেহ নেই, উত্তরণের সম্ভাবনা ছিল। স্বাধীনতার শত্রুদের কাছে এই সম্ভাবনার ইঙ্গিত ধরা পড়তে দেরি হয়নি। অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তারা তাই আঘাত হেনেছে। বঙ্গবন্ধুর ও চার জাতীয় নেতার নির্মম হত্যা তাদের হীন চক্রান্তের সফল পরিণতি। ব্যর্থ স্বদেশ আবার ফিরে যায় তার পরনির্ভরতার অভ্যস্ত গতিপথে।

কিন্তু ভুল হবে এই পতনকে নিয়তি বলে মেনে নিলে। স্বাধীনতা কোনো গরিব দেশেই তাৎক্ষণিক সুখ আনে না। আবার স্বাধীনতা ছাড়া কোনো দেশই তার ভবিষ্যৎ সুখ-সমৃদ্ধিকে নিশ্চিত করতে পারে না। দাঁত ওঠার যন্ত্রণা ভোগ করতে হয় সবাইকেই। তাকে এড়াতে চাইলে ঔপনিবেশিক কোলকেই মেনে নিতে হয় চিরস্থায়ী বলে। যেসব দেশ আজ সমৃদ্ধ তাদেরও পেছনে আছে সুদীর্ঘ দুঃখ-কষ্টের ইতিহাস। অভাব-অনটনের বিরুদ্ধে, ক্ষুধার বিরুদ্ধে, ঔপনিবেশিক চক্রান্তের বিরুদ্ধে, প্রতিক্রিয়াশীল পিছুটানের বিরুদ্ধে পৌরুষের সঙ্গে লড়াই করতে সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়ানো আজ তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশের ইতিহাস-নির্ধারিত দায়িত্ব।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা