‘চৈত্রসংক্রান্তি’ আজ
হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৪৪ এএম
চৈত্রসংক্রান্তি পালনে শিল্পকলা একাডেমিতে চলছে আয়োজন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
‘নতুন আকাঙ্ক্ষা আসেÑচ’লে আসে নতুন সময়Ñ/পুরনো সে নক্ষত্রের দিন শেষ হয়/নতুনেরা আসিতেছে ব’লে!’ চির নতুনের আবাহনে জীবনানন্দ দাশের ‘নির্জন স্বাক্ষর’ কবিতার এই বার্তা এখন বাংলার হাওয়া-জলে, সবুজে-শ্যামলে বিরাজমান। বিশ্বজুড়ে মানুষের সৃষ্ট যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয়, অস্থিরতা-স্থবিরতার নাগ-পাশ কাটিয়ে পুরাতন জরাজীর্ণতাকে পেছনে ফেলে আমাদের সামনে হাজির হচ্ছে আরও একটি নতুন বছর। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে আগামীকাল মঙ্গলবার সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বিদায়ীকালের গহ্বরে মিশে যাবে আরও একটি বঙ্গাব্দ।
আজ ৩০ চৈত্র; ১৪৩২ বঙ্গাব্দের শেষ দিন। আজ চৈত্রসংক্রান্তি। নতুন বছরকে স্বাগত এবং পুরাতন বছরকে বিদায় জানাতে আবহমানকাল ধরে বাংলা সনের সমাপনী মাস চৈত্রের শেষ দিনে নানা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়ে আসছে ‘চৈত্রসংক্রান্তি’ উৎসব। যে উৎসব পুরনোকে ছুড়ে ফেলে দেয় না; বিদায় জানায়। বুকে লালন করে। যেন বলতে চায়, সবই একদিন পুরনো হয়; গত হয়। আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, পাওয়া না পাওয়া, পেয়ে হারানোর ব্যথাÑ একদিন স্মৃতি হয়। সব পুরনো থেকে শিক্ষা নিয়েই সাজাতে হয় নতুনকে। অভিজ্ঞতার আলোকে গড়তে হয় ভবিষ্যৎকে।
সংক্রান্তি কথাটির অর্থ হলোÑ এক ক্রান্তি থেকে আরেক ক্রান্তিতে যাওয়া। কিংবা সূর্যসহ বিভিন্ন গ্রহের এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন। মহাকালের অনাদি ও অশেষের মাঝে ঋতু বদল করতে করতে এগিয়ে চলা। যে কারণে, চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক বাঙালির কাছে চৈত্রসংক্রান্তি এক বৃহত্তর লোকজ উৎসবে পরিণত হয়েছে।
বাঙালি যুগ যুগ ধরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা আচার-অনুষ্ঠানে এই উৎসব উদযাপন করে আসছে। এর সঙ্গে রয়েছে অর্থনীতির সম্পৃক্ততাও। এদিন ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নেন পহেলা বৈশাখের হালখাতা উৎসবের। দোকানপাট ধুয়ে-মুছে বিগত বছরের সব জঞ্জাল-অশুচি দূর করে পহেলা বৈশাখের দিন খুলে বসেন ব্যবসায়িক হিসাব-নিকাশের নতুন খাতা। বর্তমানে শহুরে সভ্যতার দাপটে আবহমান গ্রাম-বাংলায় আগের মতো চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপনের সেই আনন্দমুখর পরিবেশ আর নেই। তবে এখন শহর-নগরে আবহমান গ্রামীণ সংস্কৃতির আমেজে চৈত্রসংক্রান্তির উৎসব বা মেলা বসে, যা এক সর্বজনীন মিলনমেলায় পরিণত হয়।
রাজধানীতে বর্ণিল আয়োজন
চৈত্রসংক্রান্তি পালনের মধ্য দিয়ে আজ সোমবার শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হচ্ছে বর্ষবরণের পাঁচ দিনের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। বেলা ৩টায় একাডেমির উন্মুক্ত মঞ্চে এই আয়োজনের উদ্বোধন করবেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইফ নূরুল ইসলাম। চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে এদিন জাতীয় চিত্রশালা ভবনের গ্যালারি-৪-এ উদ্বোধন করা হবে বাংলাদেশ লোকশিল্প প্রদর্শনীর। এরপর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুরুতে ৫০ জন যন্ত্রশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে অর্কেস্ট্রা ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’। একাডেমির উন্মুক্ত প্রাঙ্গণের এ আয়োজনে ৩০ জন নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে পরিবেশিত হবে ধামাইল নৃত্য। চৈত্রসংক্রান্তির মনোজ্ঞ আয়োজনে আরও থাকছে জারিগান, পটগান, পুঁথি পাঠ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা। অনুষ্ঠানে আরও পরিবেশিত হবে লোকসাহিত্যের অন্যতম উপাদান যাত্রা পালা ‘রহিম বাদশা রূপবান কন্যা’।
অন্যদিকে নাচ-গানসহ নানা বর্ণাঢ্য আয়োজনে চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। বেলা ৩টায় শুরু হয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে অনুষ্ঠানমালা। এ ছাড়া ‘পালা-মেলা : দুই যুগের গল্পকথা’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে নাটকের দল পালাকার। এতে পরিবেশিত হবে দলটির জনপ্রিয় কিছু নাট্য প্রক্রিয়ার ছোট ছোট অংশ ও গান। অতিথিদের আপ্যায়ন করা হবে খই, মুড়ি, মুড়কি, বাতাসাসহ বিভিন্ন দেশীয় খাবার দিয়ে।
বরাবরের মতো এবারও চ্যানেল আই সুরের ধারা হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ করবে। আয়োজনের অংশ হিসেবে আজ বিকাল সাড়ে ৫টায় ধানমন্ডির রবীন্দ্র সরোবরে থাকবে চৈত্রসংক্রান্তির নানা আয়োজন। এতে সংগীত পরিবেশন করবেন বুলবুল ইসলাম, চন্দনা মজুমদার, বিজন চন্দ্র মিস্ত্রী, প্রিয়াঙ্কা গোপ, স্বাতী সরকার। আবৃত্তি করবেন ভাস্বর বন্দোপাধ্যায় ও ডালিয়া। নৃত্য পরিবেশন করবেন ওয়ার্দা রিহাব। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।