ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ১০:৩১ এএম
কৃষক কার্ড। ছবি: সংগৃহীত
রাত পোহালেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কৃষকদের হাতে তুলে দেবেন ‘কৃষক স্মার্ট কার্ড’ নামের জাদুর কাঠি। এই কার্ডে কৃষি উপকরণ, সেচ সুবিধা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা, কৃষিবীমা সুবিধা এবং কৃষিপণ্য বিক্রিসহ মোট ১০টি সেবা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কার্ডটি ব্যবহার করে কৃষকরা নির্দিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে সার, বীজ, কীটনাশক, মৎস্য ও প্রাণিখাদ্যসহ পাঁচ ধরনের কৃষি উপকরণ কিনতে পারবেন।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টকার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষকদের খরচ কমবে। কারণ এতে কোন ফসলের জন্য কতটুকু সার, বীজ ও কীটনাশক প্রয়োজন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে। ফলে কৃষকের অতিরিক্ত ব্যয় কমে আসবে।
আগামীকাল মঙ্গলবার পহেলা বৈশাখে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লকে কৃষকদের মধ্যে স্মার্টকার্ড বিতরণ কার্যক্রম উদ্বোধন করা হবে। একই সঙ্গে দেশের ৮ বিভাগের ১০ জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকে একযোগে এ কার্ড বিতরণ করা হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর টাঙ্গাইল জেলার উপ-পরিচালক মো. আশেক পারভেজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সুরুজ ব্লকে প্রান্তিক, মাঝারি, ভূমিহীন কৃষক, মৎস্য চাষি, হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগলের খামারিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের সবাইকে কার্ড দেওয়া হচ্ছে। এখানে কোনো রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নেই। ওই ব্লকে মোট ১ হাজার ৪৫৩ জন কৃষক রয়েছেন।
তালিকা প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তি ভোটার আইডি কার্ড ও জমির কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্লকে কর্মরত কর্মকর্তারা প্রত্যেকের জমির পরিমাণসহ অন্যান্য তথ্য পর্যবেক্ষণ করে তালিকা প্রস্তুত করেছেন।
তিন ধাপে হবে কার্ড বিতরণ
প্রি-পাইলটিং, পাইলটিং এবং দেশব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণÑ এই তিন ধাপে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ‘প্রোগ্রাম অন অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্ট্রাপ্রেনারশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের প্রোগ্রাম কোঅর্ডিনেটর আবুল কালাম আজাদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কৃষককার্ডের মাধ্যমে সার-বীজ সহায়তা, ক্ষতিপূরণ ও ভর্তুকি বিতরণে অব্যবস্থাপনা দূর হবে। শুধুমাত্র প্রকৃত কৃষকরাই এ সুবিধার আওতায় আসবেন। পর্যায়ক্রমে দেশের সব কৃষককে এ কার্ডের আওতায় আনা হবে, ফলে সরকারের কাছে কৃষকদের একটি সুস্পষ্ট তথ্যভান্ডার তৈরি হবে।
তিনি আরও বলেন, প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম পহেলা বৈশাখে শুরু হবে। এরপর ছয় মাসব্যাপী পাইলটিং এবং আগামী চার বছরে দেশব্যাপী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। এ প্রকল্পে ৮০০ কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। পাঁচ বছরে প্রায় ২ কোটি কৃষককে এ সেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
কোন খাতে কত কৃষক
কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ৮ বিভাগের ১০ জেলার ১১টি উপজেলার ১১টি ব্লকের কৃষক, মৎস্য চাষি, প্রাণিসম্পদ খামারি ও লবণ চাষিদের জন্য ‘কৃষককার্ড’ বিতরণের লক্ষ্যে সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় শাখায় সংশ্লিষ্ট কৃষকদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। এটি মূলত একটি ব্যাংকিং ডেবিট কার্ড। গত ১১ এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২২ হাজার ৬৫ জন কৃষকের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভূমিহীন কৃষক ২ হাজার ২৪৬ জন, প্রান্তিক কৃষক ৯ হাজার ৪৫৮ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ৮ হাজার ৯৬৭ জন, মাঝারি কৃষক ১ হাজার ৩০৩ জন এবং বড় কৃষক ৯১ জন। পেশাভিত্তিক হিসাবে ফসল উৎপাদনকারী কৃষক ২১ হাজার ১৪১ জন, মৎস্যজীবী ৬৬ জন, প্রাণিসম্পদ খামারি ৮৫৫ জন এবং লবণ চাষি ৩ জন। এদের মধ্যে প্রণোদনার জন্য নির্বাচিত ভূমিহীন, প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যা ২০ হাজার ৬৭১ জন, যা মোট কৃষকের ৯৩.৭ শতাংশ।
প্রাক-পাইলটিংয়ে ব্যয় হবে ৮ কোটি ৩৪ লাখ টাকা
রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম হিসেবে ১০টি উপজেলার ১১টি ব্লকে ৩৫ হাজার কৃষকের মধ্যে ‘কৃষককার্ড’ বিতরণ করা হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে কৃষকের আর্থ-সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ এবং নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে সুস্পষ্ট রূপরেখা দেওয়া হয়েছিল। এর মূল লক্ষ্য হলোÑ আত্মনির্ভর, জলবায়ু-সহিষ্ণু, প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃষক-কেন্দ্রিক একটি আধুনিক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে উৎপাদন ও বিপণন হবে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক, কৃষক হবেন ক্ষমতায়িত উদ্যোক্তা এবং কৃষি হবে জাতীয় অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি।
কার্যক্রম শুরু হচ্ছে কোন কোন ব্লকে
১০ জেলার ১১ উপজেলার ১১টি ব্লকে কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হবে। এর মধ্যে রয়েছেÑ পঞ্চগড় সদর উপজেলার কমলাপুর, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার উথলি, ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কৃপালপুর, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার রাজাবাড়ি, কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার রাজারছড়া, কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার অরণ্যপুর, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার তেনাপঁচা, মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা, পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার পাঁচপির, জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার গাইবান্ধা এবং টাঙ্গাইল সদর উপজেলার সুরুজ ব্লক।
কৃষকদের ভাগ করা হয়েছে ৫টি শ্রেণিতে
জমির মালিকানার ভিত্তিতে কৃষকদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। এতে ৫ শতকের কম জমির মালিককে ভূমিহীন, ৫-৪৯ শতকের মালিককে প্রান্তিক, ৫০-২৪৯ শতকের মালিককে ক্ষুদ্র, ২৫০-৭৪৯ শতকের মালিককে মাঝারি এবং ৭৫০ শতকের বেশি জমির মালিককে বড় কৃষক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে।
টাঙ্গাইলে খুশির জোয়ার
টাঙ্গাইলের শহীদ মারুফ স্টেডিয়ামে কৃষককার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানের ভেন্যু প্রস্তুতির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ কর্মসূচি ঘিরে কৃষকদের মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে ১৫ জন কৃষক কার্ড গ্রহণ করবেন। কার্ড গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুরুজ উত্তরপাড়া গ্রামের শামীমা আক্তার। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কৃষকদের জন্য এমন উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। এ কার্ড মধ্যস্বত্বভোগীদের হয়রানি থেকে কৃষকদের রক্ষা করবে। কোনো দালাল বা অসাধু কর্মকর্তা আর সুবিধার ভাগ নিতে পারবে না।
নিয়োগী জোয়াইর গ্রামের কৃষক নবাব আলী বলেন, ৭২ বছরের জীবনে এটি তার সবচেয়ে আনন্দের সংবাদ। তিনি প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে কৃষিকার্ড গ্রহণ করবেন।
টাঙ্গাইল সদরের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বাংলাদেশ একটি কৃষিনির্ভর দেশ, যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ কৃষির সঙ্গে যুক্ত। কৃষকদের উন্নয়নে কৃষককার্ড বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হচ্ছে। একই দিন ও সময়ে সারা দেশের আরও ৯টি স্থানে ৩৫ হাজার কৃষকের মধ্যে এ কার্ড বিতরণ করা হবে।
কার্ড পাচ্ছেন শিবগঞ্জের ৩১৪৭ কৃষক
শিবগঞ্জের উথলী রথবাড়ীর কৃষক নজরুল ইসলাম জানান, অনেক দিন ধরেই তিনি এমন একটি উদ্যোগের অপেক্ষায় ছিলেন। কৃষককার্ডের মাধ্যমে সরাসরি সরকারি সহায়তা পেলে চাষাবাদ আরও সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, সার, বীজ ও ঋণ পেতে আর হয়রানির শিকার হতে হবে না।
নারায়ণপুরের কৃষক শফিকুল ইসলাম বলেন, এ কার্ড চালু হলে প্রকৃত কৃষকরাই উপকৃত হবেন। মাঝখানে কেউ আর সুবিধা নিতে পারবে না। সরকার নিয়মিতভাবে এ কার্ডের মাধ্যমে সহায়তা দিলে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষকরা আরও স্বাবলম্বী হতে পারবেন।
এ বিষয়ে শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল হান্নান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, প্রথম ধাপে ৩ হাজার ১৪৭ জন কৃষককে এ কার্ড দেওয়া হবে। তার মতে, কৃষক কার্ড চালুর ফলে কৃষি খাতে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমবে।
প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেনÑ টাঙ্গাইল জেলা প্রতিবেদক মুসলিম উদ্দিন আহমেদ ও শিবগঞ্জ প্রতিবেদক জাফর ইকবাল