× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

ভূমি ব্যবস্থাপনা

নানা সংকটে চ্যালেঞ্জের মুখে সরকারের উদ্যোগ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৫ এএম

ভূমি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ভূমি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

দেশের ভূমি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, হয়রানি, ধীরগতির সেবা এবং আইনি জটিলতার এক দুর্বিষহ চক্রে আবদ্ধ। এ বাস্তবতায় সরকার জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) জন্য একগুচ্ছ নির্দেশনা জারি করেছে। লক্ষ্য একটাইÑ ভূমি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সেবাকে সহজতর করা এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা। নির্দেশনাগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ গণমুখী উদ্যোগ গ্রহণ, ডিজিটাল রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, কাগজে-কলমে ঘোষিত এই সংস্কার বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে? মাঠ প্রশাসন কি এ পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত? আর জনগণ কি সত্যিই ভোগান্তিমুক্ত সেবা পাবে?

বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হলো সারা দেশের উপজেলা পর্যায়ে ভূমিসেবা মেলার আয়োজন। আগামী ২০ এপ্রিল থেকে ১৯ মে পর্যন্ত মাসব্যাপী এ কর্মসূচির আওতায় নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়, পরামর্শ প্রদানসহ বিভিন্ন সেবা এক ছাতার নিচে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি ও হয়রানি রোধে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও উপজেলা ভূমি অফিসগুলোতে যেন কোনো ধরনের অনিয়ম না ঘটে, সে বিষয়ে সরাসরি নজরদারির দায়িত্ব ডিসিদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঠ প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, এ ধরনের মেলা সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি ও দ্রুত সেবা পাওয়ার সুযোগ পাবে। তবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে এ উদ্যোগ কেবল আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ হয়ে যেতে পারে।

তাদের মতে, একযোগে বিপুলসংখ্যক আবেদন গ্রহণ এবং তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি করা প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যাপ্ত জনবল, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া এ উদ্যোগ ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রশাসন বিশ্লেষক প্রয়াত ড. আকবর আলী খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ভূমি খাত বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ খাতগুলোর একটি। এই খাতে প্রকৃত সংস্কার আনতে হলে কেবল নির্দেশনা জারি করলেই হবে না; নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর জবাবদিহি ও বাস্তবভিত্তিক তদারকি।

জেলা প্রশাসকদের আরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, মাঠ প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে বাস্তবতা হলোÑ রাজনৈতিক চাপ, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের প্রভাব এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই এসব তদন্তের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়; এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা আশার আলো নাকি নতুন জটিলতা

ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন প্রকল্পকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে জেলা প্রশাসকদের নিজে প্রকল্প সম্পর্কে সম্যক ধারণা নেওয়া এবং মনিটরিং করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইসিটি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা মনে করেন, ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি কমানোর একটি কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে। তবে ডাটা এন্ট্রির ভুল, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং জনবল সংকট থাকলে এটি উল্টো নতুন জটিলতারও জন্ম দিতে পারে।

নির্দেশনায় প্রতিটি জেলায় ডাটা এন্ট্রির জন্য ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ চালুর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অনেক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে এখনও পর্যাপ্ত কম্পিউটার, স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা প্রশিক্ষিত জনবল নেই।

জনবল সংকট কাটবে, নাকি বাড়বে চাপ

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ৫৫০টি শূন্য পদে দ্রুত নিয়োগ এবং আগামী পাঁচ বছরে আরও ৮ হাজার ৩৮ জন কর্মচারী নিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জেলা প্রশাসকদের সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর বলেন, জনবল বৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ; তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে নতুন নিয়োগই দুর্নীতির আরেকটি নতুন চক্রের জন্ম দিতে পারে।

কৃষিজমি রক্ষায় জেলা প্রশাসকদের কঠোর অবস্থান গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দুই বা তিন ফসলি জমি অকৃষিকাজে হস্তান্তর নিরুৎসাহিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী, খাল ও জলাধার দখল রোধে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসরণের কথাও বলা হয়েছে। 

পরিবেশবিদ ও পানি বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন, কৃষিজমি ও জলাধার সংরক্ষণে ব্যর্থ হলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ উভয়ই মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলা করা প্রশাসনের জন্য সহজ কাজ নয়।

নির্দেশনায় পরিদর্শন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। অফিসে উপস্থিত না হয়ে প্রতিবেদন দাখিল করা যাবে না, নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে এবং সুপারিশ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে পুরস্কার ও শাস্তির ব্যবস্থার কথাও উল্লেখ রয়েছে। 

তবে একাধিক জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাগজে-কলমে মনিটরিং জোরদার হলেও বাস্তবে সময় ও জনবল সংকট বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক চাপও কার্যকর তদারকির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ কোথায়

এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ স্পষ্টভাবে সামনে এসেছেÑ জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর দুর্বলতা, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের চাপ, দুর্নীতির গভীর শিকড় এবং মনিটরিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা।

নতুন সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সময়োপযোগী। জেলা প্রশাসকরা যদি নির্দেশনাগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হন, তবে ভূমি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। 

তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে, কেবল নির্দেশনা জারি করেই এ খাতের গভীর সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্ত রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে মাঠ প্রশাসনের আন্তরিকতা, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার ওপর। এখন দেখার বিষয়Ñ এই ‘শুদ্ধি অভিযান’ সত্যিকার অর্থে ভূমি ব্যবস্থাপনায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারে কি না, নাকি শেষ পর্যন্ত এটি আরেকটি ঘোষণায়ই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

যা বলছেন ভূমি সচিব

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ভূমি খাত দীর্ঘদিন ধরে যেসব কাঠামোগত সমস্যা ও অনিয়মের মধ্যে রয়েছে, সেখান থেকে উত্তরণে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যেই সরকার কাজ করছে। তার মতে, মাসব্যাপী ভূমি মেলা কেবল সেবা প্রদানের একটি কর্মসূচি নয়; এটি একই সঙ্গে জনগণের আস্থা পুনর্গঠন এবং মাঠ প্রশাসনের সক্ষমতা যাচাইয়ের বাস্তব পরীক্ষা।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসকদের স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছেÑ এ কর্মসূচি কোনোভাবেই যেন আনুষ্ঠানিকতা বা প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ না থাকে। নামজারি, ভূমি উন্নয়ন কর আদায়সহ প্রতিটি সেবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্তভাবে প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সালেহ আহমেদ জানান, জনবল সংকটের বিষয়টি অস্বীকার করা হচ্ছে না। ইতোমধ্যে শূন্য পদ পূরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আওতায় বড় পরিসরে নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান জনবলকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ উদ্যোগ ভূমি খাতে দৃশ্যমান পরিবর্তনের সূচনা করবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে মাঠ প্রশাসনের আন্তরিকতা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং ধারাবাহিক মনিটরিংয়ের ওপর।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা