কবির হোসেন
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫১ পিএম
গ্যাস বেলুনে বাড়ছে বিস্ফোরণ। ছবি: সংগৃহীত
বেলুন তৈরি করা হয় সাধারণত হিলিয়াম গ্যাস দিয়ে; তবে দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীসহ সারা দেশের হকারদের অনেকেই বিক্রি করছেন হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা বেলুন। সম্প্রতি গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনাও বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু। কারণ বেলুন তাদের জনপ্রিয় খেলনাসামগ্রী। আর এই খেলনাসামগ্রী যে এক প্রকার চলমান বোমা, অভিভাবকরা তা বুঝতে পারছেন না। অথচ হাইড্রোজেন গ্যাসভর্তি বেলুন বিস্ফোরিত হতে সামান্য সিগারেটের আগুনই যথেষ্ট। ফলে হাইড্রোজেন গ্যাস সরবরাহ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি বলে মনে করছেন অগ্নি ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ঢাকার জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের তথ্যনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ২ হাজার ৭০০ জন দগ্ধ রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগীর বড় অংশই সিলিন্ডার ও গ্যাস লিকেজ দুর্ঘটনার শিকার। গত ৯ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরে বিএনপির মিছিলে যোগ দিতে একটি ঘর থেকে গ্যাস বেলুন বের করার সময় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ২১ জন দগ্ধ হন। যাদের বেশিরভাগই ছিল তরুণ ও শিশু। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাজীপুর-২ আসনের বিএনপি প্রার্থী এম মঞ্জুরুল করিম রনির পূর্বনির্ধারিত নির্বাচনী গণমিছিলে যোগ দেওয়ার জন্য টঙ্গীবাজার বাটাগেট এলাকায় নেতাকর্মীরা জড়ো হন। একপর্যায়ে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে হোন্ডা রোডের মাথায় বিএনপি অফিসের সামনে রাখা গ্যাস বেলুনে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। এতে শিশুসহ অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীর হাত-মুখসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে যায়। এদের মধ্যে গুরুতর আহত ও দগ্ধ ১২ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। এর আগে গত বছরের ৫ আগস্ট রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গ্যাস বেলুন বিস্ফোরণ হয়। এতে ১০ জন আহত হন। এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকার আশুলিয়ায় গ্যাস বেলুন ফোলানোর সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মাইশা নামের এক শিশু নিহত হয়। আশুলিয়ার ঢাকা কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটিতে এ ঘটনা ঘটে। এছাড়া ২০১৯ সালের অক্টোবরে রাজধানীর মিরপুরের রূপনগরে বেলুন ফোলানোর গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ছয় শিশুর নির্মম মৃত্যু হয়। এ সময় আহত হয় ১৭ শিশুসহ আরও অন্তত ২৫ জন।
২০২৫ সালে সিলিন্ডার ও এর সঙ্গে যুক্ত উপকরণের লিকেজ থেকে ১ হাজার ৪১টি দুর্ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২৪ সালের মধ্যে গ্যাস লিকেজ থেকে সংঘটিত দুর্ঘটনা ছিল ১ হাজার ২০৭টি। যার মধ্যে ২০২৪ সালে ঘটেছিল ৭৪৮টি। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা বেড়ে গড়ে মাসে ৮৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজ থেকে ২০২৫ সালে ৫৫২টি দুর্ঘটনা ঘটে। ২০২০-২৪-এর মধ্যে এ সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৫৪১টি। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২৭ হাজার ৫৯টির মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগে ৯ হাজার ৩৯২টি, বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরা থেকে ৪ হাজার ২৬৯টি, চুলা থেকে ২ হাজার ৯০৯টি, গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে ৯২০টি, গ্যাস সরবরাহ লাইন লিকেজ থেকে ৫৬২টি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে ১২১টি, কেমিক্যাল বা রাসায়নিক দুর্ঘটনা থেকে ৩৮টি, ছোটদের আগুন নিয়ে খেলার কারণে ৬০৮টি, উত্তপ্ত ছাই থেকে ৩৫৬টি, কয়েল থেকে ৪৯৩টি এবং আতশবাজি, ফানুস বা পটকা পোড়ানো থেকে ১০৯টি আগুনের ঘটনা ঘটে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রোজেন গ্যাস হিলিয়াম থেকে অপেক্ষাকৃত হালকা এবং আকাশে আরও বেশি উচ্চতায় যেতে পারে। এ কারণে হকাররা বেলুনে এ গ্যাস ব্যবহারে উৎসাহিত হয়ে উঠেছেন। যদিও আগুনের সংস্পর্শে এলে তা বিস্ফোরিত হয়। অথচ হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহারে এই ঝুঁকি থাকে না। এই গ্যাসভর্তি বেলুন ফেটে গেলেও আগুন ধরার আশঙ্কা নেই। তাই হিলিয়াম গ্যাস ব্যবহার নিরাপদ। তারা আরও বলছেন, অসতর্কতা বা অসাবধানতার কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব বিস্ফোরণ ঘটছে। ফলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারবিধি সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
এ বিষয়ে অগ্নি এবং দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ মেজর একেএম শাকিল নেওয়াজ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিস্ফোরক অধিদপ্তরের উচিত, বেলুনে হাইড্রোজেন ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা। লাইসেন্স না থাকলে এই গ্যাস ব্যবহার করার সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। তাই বিষয়টিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য পুলিশ-প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উচিত মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখা। প্রয়োজনে কারা হকারদের হাতে এসব গ্যাসভর্তি বেলুন তুলে দিচ্ছে, সে ব্যাপারে অনুসন্ধান ও অভিযান চালানো উচিত। না হলে শিশুসহ বড়রাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।’
এ প্রসঙ্গে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান বলেন, প্রতিদিন এ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সারা দেশ থেকে ৭০-৭৫ জন দগ্ধ রোগী আসে। এ রোগীদের শরীরেই মেজর বার্ন হয়। শরীরের অধিকাংশ অংশ ও শ্বাসনালি পুড়ে যায়। ফলে তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয় বা পরে মারা যায়। তাই মানুষকে আগেভাগে সচেতন হতে হবে বলে জানান ডা. শাওন।