ফুয়াদ মোহাম্মদ সবুজ, মহেশখালী (কক্সবাজার)
প্রকাশ : ১১ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৪৬ পিএম
কক্সবজার জেলার মহেশখালীতে নির্মিত তেলের মজুত অবকাঠামো
কক্সবজারের মহেশখালীতে নির্মিত সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পটি ৮ হাজার কোটি টাকায় নির্মিত জ্বালানি অবকাঠামো। এটি মূলত তেল আমদানি ও মজুত সহজ করে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তৈরি করা হলেও অপারেশনাল জটিলতা ও ব্যবস্থাপনাগত সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও পুরোপুরি কার্যকর হতে পারেনি। ফলে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও প্রকল্পটি দেশের জ্বালানি খাতে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না।
সমুদ্রে অবস্থানকারী বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি খালাসের লক্ষ্যে ২০১৫ সালে মহেশখালীর কালারমারছড়া সোনারপাড়া এলাকায় সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়। দীর্ঘ নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে কাজ সম্পন্ন হলেও প্রয়োজনীয় অপারেশনাল প্রস্তুতি এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই প্রকল্পের আওতায় রয়েছেÑ সমুদ্রে স্থাপিত ভাসমান মুরিং ব্যবস্থা, সমুদ্রতল দিয়ে নির্মিত প্রায় ১১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পাইপলাইন, যা স্টোরেজ সুবিধার মাধ্যমে ইস্টার্ন রিফাইনারির সঙ্গে সংযুক্ত। পাশাপাশি পাম্পিং স্টেশন, অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল সংরক্ষণ ট্যাংক, বুস্টার পাম্প এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। পুরো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করেছে চীনের একটি প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র অনুযায়ী, প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি। প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা, যা পরে বাড়িয়ে ৮ হাজার ২২২ কোটি টাকা করা হয়। অর্থায়নের বড় অংশ এসেছে চীনের এক্সপোর্ট-ইমপোর্ট ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মাধ্যমে, যা নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সুদসহ পরিশোধ করতে হবে।
প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল, শাটডাউন পরিস্থিতিতে জ্বালানি ব্যাকআপ নিশ্চিত করা, জ্বালানি আমদানির সময়ও ব্যয় কমানো এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা। বর্তমানে বিদ্যমান ব্যবস্থায় বড় ট্যাংকার সরাসরি বন্দরে ভিড়তে না পারায় গভীর সমুদ্রে নোঙর করে ছোট জাহাজের মাধ্যমে তেল খালাস করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এসপিএম চালু হলে এই প্রক্রিয়া কয়েক দিনের পরিবর্তে অল্প সময়েই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। তবে এই অবকাঠামোটি নির্মাণ হলেও অপারেশনাল সীমাবদ্ধতার কারণে এর সম্ভাব্য সুফল এখনও মিলছে না।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধা পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়া এবং ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিকল্পিত সম্প্রসারণ কার্যক্রম বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রকল্পটির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বর্তমানে বিদ্যমান প্রক্রিয়াকরণ সক্ষমতা সীমিত থাকায় এসপিএম কার্যকরভাবে ব্যবহারের সুযোগ কমে গেছে। এ ছাড়া পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও জটিলতা দেখা দিয়েছে। নির্মাণ শেষ হওয়ার পরও অপারেটর নিয়োগ না হওয়ায় প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে চালু করা সম্ভব হয়নি। পূর্ববর্তী সময়ে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা অগ্রসর হলেও তা পরে স্থগিত হয়ে যায়। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হলে প্রস্তাবিত ব্যয় বেশি হওয়ায় তা বাতিল করা হয়। দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বানেও অংশগ্রহণ সীমিত ছিলÑ যদিও একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আগ্রহ দেখিয়েছিল, শেষ পর্যন্ত অনেকেই প্রস্তাব জমা দেয়নি। এতে প্রতিযোগিতা কমে গিয়ে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, প্রকল্প গ্রহণের আগে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা ও বাস্তবতা যাচাই যথাযথভাবে করা হয়নি। সহায়ক অবকাঠামো সম্পূর্ণ প্রস্তুত না রেখেই বড় আকারের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রকল্পটিকে পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যবহার উপযোগী করতে নতুন করে সমন্বিত পরিকল্পনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
জানতে চাইলে এসপিএম প্রকল্পের পরিচালক নাহিদ জামান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, কিছু কারিগরি ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকটের কারণে এখনও প্রকল্পটি পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে স্টোরেজে কিছু অপরিশোধিত তেল মজুদ করে সফলতা যাচাই করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো অপরিশোধিত তেল মজুদ করে তা ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পাঠানো। সেখান থেকে তেল পরিশোধিত হয়ে দেশের জ্বালানি সংকট মেটাবে। আশা করছি, চলতি বছরে ত্রুটি ও লজিস্টিক সংকট নিরসন করে প্রকল্পটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে পারব।