রাজিব রায়হান, জাবি
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৭ এএম
ছাত্রদলের লোগো। ছবি: সংগৃহীত
বিগত দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামলে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নীল নকশা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বানানো হয়েছিল বিরোধী মত দমনের প্রধান ক্ষেত্র। বিশেষ করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে এসেছিল রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের এক ভয়াবহ স্টিমরোলার।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ও (জাবি) এর বাইরে ছিল না। সেখানে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর ছাত্রলীগের ক্যাডার বাহিনী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর যৌথ তাণ্ডব ছিল নৈমিত্তিক ঘটনা। শুধু শারীরিক নির্যাতনই নয়, মেধা ও ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয়েছে প্রশাসনের আড়ালে থাকা মিথ্যা মামলার অস্ত্র। বিনা কারণে জেল-জুলুম মাথায় নিয়ে জাবির বহু শিক্ষার্থীকে যাযাবরের মতো জীবন কাটাতে হয়েছে। ছাত্রদল করার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়জীবন শেষ করতে পারেননি অনেকেই।
জানা যায়, ছাত্রদল করার অপরাধে ছাত্রত্ব শেষ করতে না পারাদের মধ্যে শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইসরাফিল চৌধুরী সোহেল (৪০তম ব্যাচ), সাবেক সভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সোহেল রানা (৩৭তম ব্যাচ), বর্তমান শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর (৩৯তম ব্যাচ) এবং সাবেক সহসভাপতি নবীনুর রহমান নবীন (৩৯তম ব্যাচ) অন্যতম। ছাত্রলীগের হামলা এবং মিথ্যা মামলায় শিক্ষাঙ্গন থেকে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের।
ছাত্রলীগের হামলা ও পাঁচটি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলায় অনিয়মিতভাবে শিক্ষাজীবন শেষ করেছিলেন বর্তমান শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক (৪০তম ব্যাচ)। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকতে হয়েছিল তাকে। শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক হুমায়ূন হাবিব হিরনেরও (৪০তম ব্যাচ) ছিল দুটি মামলা।
ছাত্রলীগের চরম নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বর্তমান কমিটির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আফফান আলী (৩৯তম ব্যাচ)। তার হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে দেওয়া হয়। গুরুতর আঘাতে একটি কিডনি বিকল হওয়ার পর্যায়ে চলে যায়। এরপরও বারোটি মামলা দেওয়া হয় তার বিরুদ্ধে।
১১টি মামলা ও ৬ বার কারাবরণের শিকার হন শাখার সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো রাব্বি হাসান (৩৯তম ব্যাচ)। ক্যাম্পাস ছাড়তে হয়েছিল তাকে। ছাত্রলীগের হামলায় হাত-পাসহ শরীরের দশটি হাড় ভেঙে দেওয়া হয় শাখার সাবেক সহসভাপতি ও বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহীম খলিল বিপ্লবের (৩৯তম ব্যাচ)। তার শরীরের একাধিক হাড়ে ইস্পাত বসানো রয়েছে। ছাত্রদল করায় বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার হক মজুমদার শিমুলকে (৩৯তম ব্যাচ) অনিয়মিতভাবেই শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয়। চারটি রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়েছিলেন তিনি।
জাবি শাখা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহিম সৈকতের (৩৮তম ব্যাচ) ওপর দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা করেছিল ছাত্রলীগ। হাত-পা ভেঙে দিয়ে মস্তিষ্কে আঘাত করা হয় তার। নির্মম অত্যাচারের পর মৃত ভেবে ফেলে রাখা হয়েছিল তাকে। দীর্ঘ এক বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল ছাত্রলীগের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন শাখা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের অসাধারণ সম্পাদক কাজী রেজাউল করিম রাজু (৩৫তম ব্যাচ)। দীর্ঘ ৬২ দিন আইসিইউতে ছিলেন এবং ছয় বছর চিকিৎসাধীন থাকার পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। এর বাইরেও ছাত্রদল করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অনেক নেতাকর্মী।
এ বিষয়ে শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনীক বলেন, ছাত্রদল করার অপরাধে ছাত্রলীগের পৈশাচিক হামলা ও ৫টি মিথ্যা রাজনৈতিক মামলার শিকার হয়ে আমার স্বাভাবিক শিক্ষাজীবন ধ্বংস করা হয়েছে। সেই নৃশংস হামলার আঘাতে আজও আমি শারীরিক অসুস্থতা ও স্মৃতিশক্তি হ্রাসের মতো স্থায়ী ট্রমা নিয়ে বেঁচে আছি। এক দুঃসহ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে আমাকে শিক্ষাজীবন শেষ করতে হয়েছে।
ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন মোহাম্মদ বাবর বলেন, আমার নামে পাঁচটি মিথ্যা মামলা দেওয়া হয় এবং নিজ বিভাগের সামনেই ছাত্রলীগের সশস্ত্র হামলার শিকার হতে হয়েছে। আমাকে হল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল এবং প্রশাসনের অসহযোগিতায় আমি স্নাতকোত্তর পরীক্ষায় পর্যন্ত অংশ নিতে পারিনি।