কারাগারে বৈষম্য
ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:১৯ এএম
আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২০ এএম
প্রতীকী ছবি
কারাগার মূলত শাস্তি ও সংশোধনের স্থান। সমাজের নিয়ম ভঙ্গকারীদের জন্য এটি হওয়ার কথা ছিল নিয়ন্ত্রিত, কঠোর ও সমান আচরণের জায়গা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বাংলাদেশে কারাগার ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক বৈপরীত্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায়, যেখানে ক্ষমতা ও অর্থ থাকলে বন্দিত্ব মানেই দেদার সুবিধা। আর না থাকলে অর্থাৎ সাধারণ বন্দিদের জীবনে নেমে আসে চরম দুর্ভোগ।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পুলিশের
পাশাপাশি সেনাবাহিনীর সদস্যদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট
ফেজ-২’। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে প্রতিদিনই গ্রেপ্তার হয়েছেন বিভিন্ন মামলার
আসামি ও নানা অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা। গ্রেপ্তার হওয়া মানুষের শাস্তি হিসেবে ঠিকানা
হয় দেশের বিভিন্ন কারাগার। কিন্তু এই কারাগার যেন এক ঘরে দুই ভুবনের বাসিন্দা।
অর্থ ও প্রভাব থাকলে কারাগারের ভেতর জীবন হয়ে উঠতে পারে স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ; আর
যাদের অর্থ-বিত্ত নেইÑ তাদের জন্য কারাগারের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ।
জানা যায়, রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও প্রশাসনিক যোগাযোগÑ
এই তিনের সমন্বয় যাদের আছে, তাদের কাছে কারাগার সবচেয়ে আরামের জায়গা। তাদের মতে, ৫
আগস্টের পর আটক হয়ে কারাগারে থাকাই নিরাপদ। অথচ বাইরে থাকলে মামলা, হামলা,
গ্রেপ্তার ও প্রতিশোধের ভয় থাকত। এখন কারাগারে থেকে নিরাপত্তা, নিয়মিত খাবার,
চিকিৎসাÑ এমনকি নেতৃত্বও চলছে।
কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া একাধিক রাজনৈতিক নেতাকর্মী বলছেন, সরকার
পতনের পর বাইরে থাকাই ছিল তাদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। পালিয়ে থাকা, স্থান
পরিবর্তন, গ্রেপ্তারের আশঙ্কাÑ সব মিলিয়ে জীবন ছিল অনিশ্চিত। অথচ গ্রেপ্তার হয়ে
কারাগারে ঢোকার পর অন্তত জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল না। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা
একাধিক সাবেক বন্দির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কারাবন্দিজীবন সবার জন্য একরকম নয়।
অর্থ, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাবের ওপর নির্ভর করে কারাগারের অভিজ্ঞতা
হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ভিন্ন।
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলার বাসিন্দা আব্দুর রহমান। যাত্রাবাড়ী
এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তিনি কোনো রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত নন। তার নিজ
জেলায় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলেন। তিনি জানান যে, কাশিমপুর
ও কেরানীগঞ্জ দুই কারাগারেই ছিলেন। কারা কর্মকর্তারা তার সাথে খুবই আন্তরিক ছিলেন।
তবে সেই আন্তরিকতার পেছনে মাসে মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়েছে। তিনি একজন অসুস্থ
মানুষ, তার ইনসুলিন ফ্রিজে রেখে সকালে-রাতে খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারতেন। তার
মতো অনেকের জন্যই নিয়মিত নাশতা, চা ও সিগারেটের ব্যবস্থা থাকত। অথচ একই কারাগারে
থাকা সাধারণ বন্দিদের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যাদের টাকা নেই, তারা রাতে শোয়ার
মতো জায়গা পর্যন্ত পায় না। খাবারের মান এত খারাপ যে, মুখে তোলা যায় না। টয়লেটের
অবস্থা ভয়াবহ। সেখানে মানবাধিকার বলে কিছু নেই।
জামিন পাওয়া আরেক বন্দি রাজনৈতিক নেতা এই প্রতিবেদককে বলেন,
কারাগারে ঢোকার পর মনে হয়েছে, এখানেই বরং রাষ্ট্রের সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গা। বাইরে
থাকলে কখন কী হয় বলা যায় না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর
দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর রাজধানীর পাশের জেলার যুবলীগের এক শীর্ষ নেতা পুলিশের
হাতে গ্রেপ্তার হন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সাবেক সাধারণ বন্দি জানান, ওই
নেতা কারাগারের ভেতর থেকেই দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তারা
বলেন, ‘কারাগারে যারাই যেতেন, ‘রাজা ভাই’ তাদের সব ধরনের সহযোগিতা
করতেন। কে কোথায় ভালো থাকবেন, কে কী খাবেনÑ সবই তার ব্যবস্থাপনায় চলত। কারা
কর্তৃপক্ষ কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিল।
কারাগার থেকে মুক্ত হওয়া একাধিক রাজনৈতিক বন্দি প্রতিদিনের
বাংলাদেশকে বলেন, বাইরে থাকলে গ্রেপ্তার বা হামলার ভয় ছিল। কারাগারে ঢোকার পর
অন্তত জীবন নিরাপদ ছিল। তবে তারা স্বীকার করেন, সাধারণ বন্দিদের অবস্থা অত্যন্ত
করুণ। শীতের সময় প্রয়োজনীয় কাপড় না থাকায় অনেককে চরম কষ্টে থাকতে হয়েছে। কারাগারের
ভেতরেও আছে ক্ষমতার স্তরবিন্যাস। প্রভাবশালী বন্দিরা শুধু নিজেরা সুবিধা পান না; তারা
হয়ে ওঠেন ভেতরের শাসক। কে কোথায় থাকবেন, কে ভালো খাবার পাবেন, কে কার পাশে থাকবেনÑ
সবই তারা নিয়ন্ত্রণ করেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, কারাগারে অর্থই সবকিছু। মাসে লক্ষাধিক টাকা
ব্যয় করতে পারলে বন্দির জীবন আমূল বদলে যায়। বিশেষ খাবার, আলাদা থাকার ব্যবস্থা,
উন্নত চিকিৎসা, নিয়মিত বাইরের যোগাযোগÑ সবই সম্ভব হয় অর্থের জোরে। এমনকি
ডায়াবেটিসের ইনসুলিন ফ্রিজে রাখার মতো সুবিধাও পাওয়া যায়। কারাগারে নিয়মের চেয়ে
সম্পর্ক আর টাকার দাম বেশি। এই বাস্তবতায় কারাগার কার্যত দুই ভাগে বিভক্তÑ একটি
সুবিধাভোগীদের, অন্যটি বঞ্চিতদের।
এর বিপরীত চিত্রটা অবর্ণনীয়। শত শত বন্দি রাতে শোয়ার মতো জায়গা পান
না। এক জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। খাবারের মান এতটাই নিম্নমানের যে, অনেকেই
অসুস্থ হয়ে পড়েন। টয়লেট ব্যবস্থার অবস্থা ভয়াবহ। পর্যাপ্ত পানি নেই, পরিচ্ছন্নতার
কোনো বালাই নেই। শীতকালে প্রয়োজনীয় কাপড় না থাকায় অনেক বন্দি রাত কাটান কাঁপতে
কাঁপতে। অসুস্থ হলেও ডাক্তার দেখানো কঠিন। অভিযোগ করার জায়গাও নেই। এই মানুষগুলোর
কণ্ঠস্বর কোথাও পৌঁছে না। কারাগারগুলোতে আসলে বন্দিদের মধ্যে স্বর্গ আর নরকের
ব্যবধান বিরাজ করছে।
সূত্রমতে, দেশের ৭০টি কারাগারের ধারণক্ষমতা ৪২ হাজার ৮৮৭ জন।
বর্তমানে বন্দি প্রায় ৮২ হাজার। অর্থাৎ ধারণক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ বন্দি গাদাগাদি
করে আছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ এই অতিরিক্ত চাপ কি সবার ওপর সমানভাবে পড়ছে?
ধারণক্ষমতার সংকট সাধারণ বন্দিদের ওপরই বেশি প্রভাব ফেলে। প্রভাবশালী বন্দিরা
আলাদা ব্লক, তারা নিরিবিলি থাকার সুযোগ পান।
জানতে চাইলে সহকারী কারা মহাপরিদর্শক মো. জান্নাত-উল ফরহাদ
প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘কারাগারের সার্বিক পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকার
কাজ করছে। অবৈধ যোগাযোগ ও মাদক সরবরাহের অভিযোগে ইতোমধ্যে তিন শতাধিক কর্মকর্তার
বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যারা দীর্ঘদিন এক কারাগারে থেকে
সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন, তাদের দূরবর্তী কারাগারে বদলি করা হয়েছে। কারাগারে
মোবাইল ফোন ব্যবহার বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে সিস্টেমে বৈষম্য রয়েছে।
ফলে এই কাঠামোর ভেতরে থেকে সব বদলানো একটু সময় লাগবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, আমলা,
পুলিশ কর্মকর্তা ও সাংবাদিকসহ শতাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের
একটি বড় অংশ ডিভিশন সুবিধা পেয়েছেন। ডিভিশন মানেই আলাদা থাকার সুযোগ, ভালো খাবার,
বাড়তি সুবিধা। আইন অনুযায়ী এটি বৈধ হলেও বাস্তবে তা কারাগারের ভেতর বৈষম্যকে আরও
দৃশ্যমান করে তোলে। ডিভিশন আইনসম্মত হতে পারে, কিন্তু যখন সাধারণ বন্দিরা ন্যূনতম
মানবিক সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হন, তখন এই বৈষম্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠেÑ বলেন এক মানবাধিকার
কর্মী।