নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৪ এএম
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের জোরালো অভিযানে ঢাকার গুলিস্তানের ফুটপাতে মঙ্গলবার এমন দৃশ্য দেখা গেল। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ঢাকার সড়ক-ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগের জোরালো অভিযানের পরও কমছে না হকারদের দাপট। উচ্ছেদ অভিযানের চাপ কাটতে না কাটতেই আবারও পুরনো জায়গায় বসতে মরিয়া হয়ে উঠেছে হকাররা। তবে অনড় অবস্থানে রয়েছে পুলিশও, বসতে দেখলেই উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে হকারদের। ডিএমপির ট্রাফিক উত্তর ও দক্ষিণের একাধিক কর্মকর্তা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেছেন, অভিযান চালিয়ে ফুটপাত ফাঁকা করা গেলেও এখন ফুটপাত ফাঁকা রাখাটাই চ্যালেঞ্জ। কারণ শহরজুড়েই পুলিশের নজর এড়িয়ে ফের ফুটপাতে বসার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে হকাররা।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উত্তরা, আজমপুর, জসীমউদ্দীন, আব্দুল্লাহপুর,
গুলিস্তান, পল্টন, বাড্ডা, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় হকাররা বারবার বসার চেষ্টা করছেন।
কিন্তু পুলিশের কঠোর অবস্থানের কারণে শেষ পর্যন্ত উঠে যেতে হচ্ছে তাদের। কাউকেই সড়ক
বা ফুটপাতে বসতে দেওয়া হচ্ছে না। ট্রাফিক পুলিশের ভাষ্য, যে বসার চেষ্টা করবে তাকেই
উঠিয়ে দেওয়া হবে।
ডিএমপির সার্জেন্ট ওমর ফারুক মজুমদার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন,
‘হকাররা এখন নতুন কৌশল হিসেবে ফুটওভার ব্রিজ দখলের চেষ্টা করছে। আমরা বসতে দেখলেই উঠিয়ে
দিচ্ছি। সিনিয়র কর্মকর্তাদের স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, ফুটওভার ব্রিজেও কোনো হকার বসতে
পারবে না।’ তিনি জানান, আগে সীমিত আকারে ব্রিজে বসার প্রবণতা থাকলেও সাম্প্রতিক উচ্ছেদ
অভিযানের পর সেটি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ফলে এখন ফুটওভার ব্রিজগুলোতেও নজরদারি বাড়ানো
হয়েছে।
হকারদের মধ্যে বিভক্ত অবস্থাও স্পষ্ট। একটি গ্রুপ সরাসরি সড়কে বসার
চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, আরেকটি গ্রুপ নেমেছে আন্দোলনে। তারা উচ্ছেদ অভিযানকে প্রত্যাখ্যান
করে রাস্তায় নেমেছে। সোমবার দুপুরে পল্টন থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাব পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিলও
বের করে হকারদের একটি গ্রুপ। তাদের অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে তাদের উচ্ছেদ করা হয়েছে,
আর আড়ালে অন্য গ্রুপকে বসানোর পাঁয়তারা চলছে। ‘আমরা এই অভিযান মানি না’Ñ এমন স্লোগানও
দেন তারা।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও নতুন করে হকার বসানোর
পেছনে প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। একটি সূত্র জানায়, উচ্ছেদের পর
সাধারণ মানুষ স্বস্তি পেলেও অন্তরালে চলছে তদবির। বিভিন্ন মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে আবার
ফুটপাতের ব্যবসা সচল করার চেষ্টা চলছে। ফলে পুরো পরিস্থিতি শুধু প্রশাসনিক নয়, প্রভাব-প্রতিপত্তির
লড়াইয়েও রূপ নিয়েছে।
ডিএমপির মতিঝিল জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) দেওয়ান জালাল উদ্দিন
চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ফুটপাতে ফেরার সুযোগ নেই। আমরা অভিযানের পরও ফুটপাতে
নিয়মিত তদারকি করছি। যাতে কোথাও কেউ বসতে না পারে। হকারশূন্য ফুটপাতের ছবি তুলে সিনিয়র
কর্মকর্তাদের পাঠাচ্ছি। এমনকি আমি নিজেও সরেজমিন তদারকি করছি। তিনি আরও বলেন, আমার
জোনে আমি হকারদের বসতে দিচ্ছি না।
বাস্তব চিত্র বলছে, রাজধানীর ফুটপাত এখনও পুরোপুরি দখলমুক্ত নয়। একদিকে
পুলিশের অভিযান, মালামাল জব্দ, জরিমানা ও গ্রেপ্তর, অন্যদিকে হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীদের
অবিরাম ফিরে আসার চেষ্টা। পুলিশের মতে, এটি দীর্ঘদিনের অভ্যাস, যা হুট করে বন্ধ করা
সম্ভব নয়। আর হকারদের দাবি, উচ্ছেদের আড়ালে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার খেলা চলছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান মঙ্গলবার রাতে
মোবাইল ফোনে প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, চ্যালেঞ্জ
তো সব সময়ই থাকে। এরপরও এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন এবং কঠিন একটা কাজ। এটা ঠেকিয়ে রাখা
শুধুমাত্র একা আমাদের (ট্রাফিক ডিভিশন) পক্ষে দ্বারা সম্ভবও না। এখানে সিটি করপোরেশনেরও
দায়িত্ব আছে, অন্য অনেক সংস্থার দায়িত্ব আছে। আমাদের ক্রাইম ডিভিশনেরও দায়িত্ব আছে।
একা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে পুরো কাজ করা সম্ভব না। তিনি বলেন, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা
করতে হলে আমাদের সবাইকেই (রাষ্ট্রীয় সব সংস্থা) সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সিটি করপোরেশনের
সঙ্গেও কথা বলার পরামর্শ দিয়ে বলেন, হকার ঠেকিয়ে ফুটপাত ফাঁকা রাখতে সিটি করপোরেশনের
ভূমিকার বিষয়েও আপানারা জানতে চান। এই বিষয়ে তারা কি করতে চায়, তাদের ভূমিকা কী।
নতুন কাউকে সুযোগ দিতেই এই অভিযানÑ হকারদের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে
চাইলে তিনি বলেন, এটা আপনারা বিশ্লেষণ করে দেখেন আমরা নতুন কাউকে বসতে দিচ্ছি কি না।
অভিযানের পর ফুটপাতে নতুন কেউ আসছে কি না। কারণ আমরা যেভাবে কাজ করছি, আমাদের কাজগুলো
তো দৃশ্যমান। এখানে দেখতে হবে যে পুলিশের কেউ এটার সঙ্গে জড়িত কি না বিশেষ করে ট্রাফিক
পুলিশের কেউ জড়িত কি না। সেটা আপনাদের বিবেচনার বিষয়।
উল্লেখ্য, রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে গত ১ এপ্রিল থেকে
ব্যাপক অভিযান শুরু করে ডিএমপি। পূর্বঘোষিত কর্মসূচির আওতায় হকার উচ্ছেদ, অবৈধ স্থাপনা
অপসারণ এবং অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযানে জরিমানা, মালামাল
জব্দ ও গ্রেপ্তারের মতো পদক্ষেপ নেওয়ায় কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে আসে নগরবাসীর মধ্যে।
অনেক সড়ক যেমন ফাঁকা হয়েছে, তেমনি ফুটপাতও ফিরে পেয়েছে হাঁটার উপযোগিতা।
ডিএমপি স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, কোনোভাবেই হকারদের আর ফুটপাতে বসতে
দেওয়া হবে না। একই সঙ্গে তাদের পুনর্বাসনে ‘হলিডে’ ও ‘নাইট মার্কেট’ চালুর পরিকল্পনার
কথাও জানানো হয়েছে। তবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ায় হকারদের একাংশ আবার রাস্তায়
ফিরতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।