× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

চালু হচ্ছে ফুয়েল অ্যাপ

জ্বালানি তেলের আকালে নাকাল দেশবাসী

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব ও দীপক দেব

প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৭ এএম

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:১৯ এএম

ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

সরকারের পক্ষ থেকে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ আছে জানানোর পরেও দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে পেট্রোল পাম্পগুলোতে। মঙ্গলবারও রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, দীর্ঘ লাইনে দাড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তেল পাচ্ছেন মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারের চালকরা। এক দফায় ৫০০ টাকার তেল নিতে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টা সময় লাগছে চালকদের। এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ ইঙ্গিত দিয়েছেন, প্রয়োজন বোধে মে মাসে তেলের দাম বাড়ানো হতে পারে।

উচ্চ পর্যায় থেকে অবশ্য তেলের অবৈধ মজুদ বন্ধ করার অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি তেল ক্রয়-বিক্রয়ের প্রকৃত হিসাব নির্ধারণের জন্য ফুয়েল অ্যাপ চালু করার কথাও ভাবা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবৈধ মজুদ ও বাড়তি তেল নেওয়ার প্রবণতা রোধে এই পদক্ষেপ আরও আগে নিলে ভালো হতো। কারণ আতঙ্ক ও আস্থাহীনতার কারণেই সরকার আশ্বস্ত করার পরও ভিড় কমছে না পাম্পগুলোর সামনে থেকে। তবে ফুয়েল অ্যাপের প্রচলন মানুষের মন থেকে আতঙ্ক দূর করার ক্ষেত্রে এখনও ভূমিকা রাখতে পারে।

তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে : গতকাল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ‘দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন ডিজেল মজুদ আছে। আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। অকটেন মজুদ আছে ১০ হাজার ৫০০ টন। ৭১ হাজার ৫৪৩ টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে। পেট্রোল ১৬ হাজার টন মজুদ আছে। আরও ৩৬ হাজার টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে।’ ফলে তেলের প্রবাহ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কিন্তু তারপরও মজুদ ও সরবরাহ নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছে না সাধারণ মানুষ।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা : এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ম তামিম গতকাল মঙ্গলবার প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘পাম্পগুলোতে তেল দেওয়া হচ্ছে। তারপরও পাম্পগুলোর সামনে এমন চিত্র কেন? এর প্রধান কারণ হচ্ছে একটা গণআতঙ্ক থেকে সবাই প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল নিয়ে মজুদ করার চেষ্টা করছেন। সরকার বার বার বলার পরেও মানুষ তা আমলে নিচ্ছে না। সবাই মনে করছেন, যেকোনো সময় তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফুয়েল অ্যাপ তৈরির যে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, তা আরও আগে নিতে পারলে ভালো হতো। তারপরও দেরি হয়নি। তবে আতঙ্ক দূর হওয়ার জন্য যুদ্ধ বন্ধের বিষয়টি খুব জরুরি। তা না হলেও কোনোভাবেই এই আতঙ্ক কাটবে না।’

মূল্য বৃদ্ধির কথা ভাবা হচ্ছে : ইরান যুদ্ধের পর থেকে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলেও সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এপ্রিল মাস পর্যন্ত জ্বালানি তেলের মূল্য বাড়ানো হবে না। তবে প্রয়োজন বোধে সরকারকে দাম বাড়ানোর পথ বেছে নিতে হতে পারে, এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে। এই প্রসঙ্গে গতকাল জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে একটা আইন আছে। সে আইন অনুসারে আমরা প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করি। গত এপ্রিল মাসে সমন্বয় করে তেলের দাম বাড়ানো হয়নি। এখন আগামী মে মাসের দামের ওপর আমরা কাজ করছি। যদি সমন্বয় করে দেখা যায় যে দাম বাড়ানো দরকার, তাহলে আমরা মন্ত্রিসভায় আলোচনা করে সেই চিন্তা করব।’

বিদ্যুৎমন্ত্রী বলেন, ‘জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য সব জেলা প্রশাসনকে সরকার নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা পর্যায়ে তদারকি দল গঠন করা হয়েছে।’ মন্ত্রী জানান, ‘জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ রোধে ৩ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত ৩৪২টি অভিযান পরিচালনা করে ২ হাজার ৪৫৬টি মামলা দায়ের এবং ৩১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব অভিযানে ১ কোটি ২৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকার অর্থদণ্ড এবং ৪০ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৬ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে।’

চালু করা হচ্ছে ফুয়েল অ্যাপ : প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, ‘তেলের অবৈধ মজুদ ও পাচার রোধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং ভর্তুকি দিয়ে চাপ সামাল দিতে সরকার কাজ করছে। জ্বালানি সরবরাহজনিত কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এটা অস্বাভাবিক নয়। তারপরও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’ এ সময় তিনি জানান, মানুষ আসলে কতটুকু তেল কিনছে, সেটি জানার জন্য ‘ফুয়েল অ্যাপ’ চালু করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এই ফুয়েল অ্যাপ ছাড়া কেউ জ্বালানি কিনতে পারবে না। এতে জানা যাবে কতুটুকু তেল নেওয়া হচ্ছে।’

জ্বালানি সরবরাহের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ২০২৫ সালের মার্চে ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছিল ৩ লাখ ৯৬ হাজার ৯৮ মেট্রিক টন। এ বছরের মার্চে করা হয়েছে ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫১২ টন। কিছুটা কমেছে, কিন্তু খুব বেশি কমেনি। ২০২৫ সালের মার্চে অকটেনের সরবরাহ ছিল ৩৬ হাজার ৯৮২ মেট্রিক টন। এবারের মার্চে তা ছিল ৩৭ হাজার ৪৩৯ টন। অকটেনের সরবরাহ বরং বেড়েছে। পেট্রোল গত বছরের মার্চে ছিল ৪৬ হাজার ৩৭১ টন। এবারের মার্চে তা খানিকটা কমেছেÑ ৩৯ হাজার ৯৯৮ টন।’

ডিজেল সংকটে বিপাকে কৃষক : জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে কৃষি খাতেও। গ্রীষ্মের সেচ মৌসুমে ডিজেল পেতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কৃষককে। দেশে ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত সেচ মৌসুমে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে এদেশে ২১ লাখ ৩১ হাজারের বেশি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি পাম্প, ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার ও মাড়াই যন্ত্র অন্তর্ভুক্ত। এসব যন্ত্রের অধিকাংশই জ্বালানি-নির্ভর। চলতি বোরো ধানের জন্য এই সময় নিয়মিত সেচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক এলাকায় কৃষক চাহিদামতো ডিজেল পাচ্ছেন না। ১০ লিটার চাইলে ৪ লিটার পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সেচে দেরি হচ্ছে এবং ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে গতকাল বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান জানিয়েছেন, সেচ মৌসুমে কৃষকদের ডিজেল পাওয়া নিশ্চিত করতে ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

দ্বিতীয় দফায় ২৫ টাকা বাড়ল জেট ফুয়েলের দাম : দেশে উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি তেল জেট ফুয়েলের দাম আবারও বাড়ানো হয়েছে। নতুন ঘোষণায় প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম প্রায় ২৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার রাত ১২টা থেকে এ মূল্য কার্যকর হয়েছেগতকাল এ সংক্রান্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সিদ্ধান্ত জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এর আগে গত ২৪ মার্চও জেট ফুয়েলের দাম এক দফায় ৯০ টাকা বাড়ানো হয়েছিল।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২২৭ টাকা ৮ পয়সা, যা মার্চে ছিল ২০২ টাকা ২৯ পয়সা। এর আগে এই জ্বালানি বিক্রি হতো ১১২ টাকা ৪১ পয়সা দরে। অর্থাৎ স্বল্পসময়ের ব্যবধানে এর দাম প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি বাড়ল। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেট ফুয়েলের দাম বৃদ্ধির ফলে বিমান ভাড়া বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রুটে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ পড়তে পারে। একই সঙ্গে এ খাতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এয়ারলাইনসগুলোয় আর্থিক চাপও বাড়তে পারে।

নারীদের জন্য আলাদা লাইনের দাবি : ইরান যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেল নিয়ে সৃষ্ট সংকট কাটছে না। গতকাল কুড়িল চৌরাস্তায় অবস্থিত পেট্রোলপাম্পের লাইন যমুনা আবাসিকের গেট পার হয়ে নর্দা পর্যন্ত চলে গেছে বলে জানান এক মোটরসাইকেল চালক। বেলা ৩টায় লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি যমুনা ফিউচার পার্কের এক নম্বর গেট থেকে ১৫ গজ সামনে এসে পৌঁছেছেন। তখনও পাম্প পর্যন্ত দেড়শ থেকে দুইশ মোটরবাইক ছিল তার সামনে।

এদিকে নারীদের পরিবহনের জন্য তেলের আলাদা লাইন দাবি করে রাজারবাগ পেট্রোলপাম্পের সামনে অপেক্ষারত কর্মজীবী এ নারী বলেন, ‘দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। তারপরও তেল দেয় মাত্র ২০০ টাকার। তাই কয়েক দিন পরই তেলের জন্য আবার আসতে হয়। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। পাম্পগুলোয় নারীদের জন্য আলাদা বন্দোবস্ত থাকা উচিত।’

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা