রাহাত হুসাইন
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১২:৫৬ পিএম
ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে রাজপথে নির্মিত হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ছাত্র-জনতার জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে রাজপথে নির্মিত হচ্ছে ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’। কিন্তু ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার এই উদ্যোগ আজ আটকে গেছে তথ্যের গোলকধাঁধায়। গেজেটভুক্ত ৮৩৪ জনের মধ্যে ৭১ জনের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় এখনও পাওয়া যায়নি। নাম, বাবা-মায়ের তথ্য কিংবা নিহত হওয়ার সঠিক স্থান ও তারিখ চূড়ান্ত না হওয়ায় অনেক স্থানে স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণ থেমে আছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে শহীদরা যে স্থানে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, সেই স্থান বা নিকটবর্তী সড়ক এলাকায় নির্মিত হচ্ছে এসব ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’। ২০২৫ সালের ১৬ জুলাই থেকে ‘স্ট্রিট মেমোরি স্ট্যাম্প’ স্থাপন কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। ওই বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সব সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও তা শেষ হয়নি। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হলেও ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’ নির্মাণ অনেকটাই এখনও অসম্পূর্ণ।
জানা গেছে, মামলাভুক্ত না হওয়ায় ৭১ জন শহীদের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনও পায়নি সংশ্লিষ্টরা। তারা কোথায়, কখন, কীভাবে শহীদ হয়েছেন তার তথ্য নেই কারও কাছে। তবে গেজেটে ওই ৭১ জন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তাদের হত্যার মামলা ও স্পটের (শহীদ হওয়ার স্থান) বিষয়ে খোঁজ নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ছয় মাস আগে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই ৭১ জনের তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে সরবরাহ করতে পারেনি। যেসব শহীদের তথ্য মামলার নম্বরসহ নিশ্চিতভাবে পাওয়া গেছে, কেবল সেসব ক্ষেত্রেই স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।
সরকারি নথি অনুযায়ী, গত বছর ‘জুলাই পুনর্জাগরণ অনুষ্ঠানমালা-২০২৫’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় রাজপথে স্মৃতি সংরক্ষণের মহাপরিকল্পনার আনুষ্ঠানিক রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়। প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় কমিটি স্থানীয় সরকার বিভাগের ওপর এই দায়িত্ব অর্পণ করে। সভায় স্থাপত্য অধিদপ্তর ও গণপূর্ত অধিদপ্তরকে যৌথভাবে একটি বাস্তবসম্মত ‘নমুনা’ বা প্রোটোটাইপ তৈরির দায়িত্ব দেয়। নকশা প্রণয়ন ও কাঠামো প্রস্তুতির পর গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পাওয়ার পর জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় শহীদদের প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করবে। এরপর তা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হবে। সম্পূর্ণ যাচাই শেষে স্থানীয় সরকার বিভাগ শহীদদের নাম, জন্ম-মৃত্যুর তারিখ ও শহীদ হওয়ার স্থান মেটালিক প্লেটে নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করবে।
সরকারি এই সমন্বিত প্রক্রিয়ায় তথ্যের অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক জটিলতাই বর্তমানে ‘জুলাই স্মৃতিচিহ্ন’ প্রকল্পের অসম্পূর্ণতার মূল কারণ বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এখনও ৭১ জন শহীদের নাম, বাবা-মা’র পরিচয় ও শাহাদতের সঠিক তারিখ চূড়ান্ত করতে পারেনি। তথ্যগত এই শূন্যতার কারণে অনেক স্থানে স্মারক নির্মাণ থেমে আছে, যা শহীদ পরিবারের অপেক্ষাকে আরও দীর্ঘ করছে।
জুলাই স্মৃতিচিহ্ন বাস্তবায়নের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় চরম বৈষম্য। ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৮০টি স্মারক নির্মিত হলেও উত্তরের ১৯১টির উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্নই হয়নি। ঢাকা জেলায় ৭২টির মধ্যে ২১টির কাজ বাকি রয়েছে। বাইপাইলের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সড়ক সংস্কারের অজুহাতে কাজ স্থগিত রাখা হয়েছে। বরিশাল বিভাগে এখনও কোনো স্মৃতিচিহ্ন নির্মিত হয়নি। কারণ, সেখানে ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন কোনো শহীদের তথ্য পাওয়া যায়নি। খুলনা সিটি করপোরেশনেও কোনো স্মৃতিচিহ্ন নির্মিত হয়নি; তবে খুলনার একজন বাসিন্দা রাজধানী ঢাকায় শহীদ হয়েছেন।
জুলাই স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণের জন্য আলাদাভাবে কেন্দ্রীয় কোনো বাজেট বরাদ্দ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদগুলো নিজস্ব তহবিল থেকে প্রতিটি স্মারকের জন্য প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় করছে। ফলে স্থানীয় সক্ষমতার ওপর কাজের গতি নির্ভর করছে, যা অসম বাস্তবায়ন সৃষ্টি করেছে। প্রথম এক বছর ঠিকাদারের অধীনে রক্ষণাবেক্ষণের কথা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদি তহবিল কাঠামো নেই। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অবহেলা বা ভাঙচুর থেকে সুরক্ষারও টেকসই নিশ্চয়তা নেই। থানায় চিঠি দিয়ে নজরদারির অনুরোধ করা হলেও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। সরকার প্রতিটি স্মৃতিচিহ্ন নির্মাণে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দেয়। তবে মাঠপর্যায়ে কোথাও এই সীমার চেয়ে কম, আবার কোথাও কিছুটা বেশি ব্যয় হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
স্মৃতিচিহ্নগুলোর স্থাপত্যিক আবেদন অনস্বীকার্য। কালো হোমোজেনাস কংক্রিটে নির্মিত আট ফুট উচ্চতার স্তম্ভের শীর্ষে সূর্যসম লাল বৃত্তÑ দৃশ্যতই জুলাইয়ের উত্তাল রাজপথের প্রতীক। জাতীয় নকশা অনুসরণ করে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একই স্থাপত্যভাষায় কথা বলছে এসব স্মারক। মধ্যভাগের ফ্লোটিং বায়োগ্রাফি প্লেটে মাত্র ৩০ শব্দে সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত শহীদদের আত্মত্যাগের কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দেয়।
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপ-সচিব ও জুলাই স্মৃতি নির্মাণ কাজের সমন্বয়কারী আব্দুর রহমান প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, কাজ শেষ করতে বিলম্বের প্রধান কারণ হলো শহীদদের জীবনী প্রণয়ন, নাম-ঠিকানা যাচাই ও পরিবারের কাছ থেকে বাণী সংগ্রহ। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সম্মতি পেতে দেরি হওয়ায় সময় বাড়াতে হয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের জন্য উপজেলা, পৌরসভা ও জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়াও আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পুলিশকেও বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।