ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ১১:০৫ এএম
কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। ছবি: সংগৃহীত
দেশের কৃষিপণ্যের বাজার সবচেয়ে অস্থিতিশীল। এই বাজার তদারকির দায়িত্ব ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের (ডিএএম)। শতবর্ষী এ প্রতিষ্ঠানের মূল দায়িত্ব কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, কৃষিপণ্যের বাজার ও তথ্য ব্যবস্থাপনা, হিমাগার ও বাজার অবকাঠামো নির্মাণ, বাজার তদারকি ও গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা। পাশাপাশি কৃষকদের মূল্য সহায়তা, পণ্যের যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষিভিত্তিক সংগঠনগুলোকে তালিকাভুক্ত করে অভিভাবকের ভূমিকা পালন করা। কিন্তু জনবল সংকট ও কৃষি বিপণনে অদক্ষ উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কারণে রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দপ্তরটি জনকল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। প্রশাসন ক্যাডারের জনবলের মনোবাসনা পূরণের ডাম্পিং স্টেশন বা ‘পারিবারিক আস্তানা’য় পরিণত হয়েছে অধিদপ্তরটি।
কী আছে নিয়োগবিধিতে : কৃষি সম্পূর্ণভাবে একটি টেকনিক্যাল ক্যাডার। কৃষিতে মোট তিনটি সাব-ক্যাডার রয়েছে— কৃষি সম্প্রসারণ, কৃষি বিপণন এবং মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউট। কৃষি বিপণন ক্যাডারের প্রধান যোগ্যতা হচ্ছে কৃষি অর্থনীতিতে ডিগ্রি থাকা। বিসিএস সার্কুলারেও কৃষি বিপণনকে প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডার হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং নিয়োগবিধি অনুযায়ী ষষ্ঠ গ্রেড থেকে পরিচালক পর্যন্ত সব পদ শতভাগ পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণের বিধান রয়েছে। কিন্তু প্রশাসন ক্যাডারের ক্ষমতার প্রভাবে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের উচ্চপর্যায়ের প্রায় সব পদেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা কৃষি বিপণন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। দেখা গেছে, ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, রংপুর, সিলেট ও চট্টগ্রামে উপ-সচিব পর্যায়ের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদায়িত রয়েছেন। প্রধান ও বিভাগীয় কার্যালয় মিলিয়ে অধিদপ্তরে মোট ১৫টি উপ-পরিচালক পদের মধ্যে ১০টিতেই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা কর্মরত। এ ছাড়া অধিদপ্তরের পরিচালক পদটি ৪র্থ গ্রেডের হলেও সেখানে দায়িত্ব পালন করছেন প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিব, যা কার্যত তার পদমর্যাদার তুলনায় এক ধরনের পদাবনতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিচালক ও উপ-পরিচালকদের অনেকে জনপ্রশাসনের উচ্চপর্যায়ে তদবির করে এই অধিদপ্তরে পদায়ন নিয়েছেন মূলত পরিবারের কাছে থাকার জন্য। অথচ একই অধিদপ্তরে এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন, যারা ৩০ বছর ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত। অধিদপ্তরের নিজস্ব ক্যাডারের একমাত্র উপ-পরিচালক মোহাম্মদ রেজা আহমেদ খান, তিনি বিসিএস ২১ ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ বিসিএস ২২ ব্যাচের ড. মুনসুর আলম খান (সাবেক কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাকের পিএস) অধিদপ্তরে পরিচালক পদে কর্মরত। বিষয়টি দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলমান আন্তঃক্যাডার বৈষম্যের একটি স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত এক বছরে বাজার তদারকিতে অধিদপ্তরের দৃশ্যমান কার্যক্রম তেমন চোখে পড়েনি। কৃষিপণ্যের দাম কখনও আকাশছোঁয়া, আবার হঠাৎ ধস নামলেও অধিদপ্তরের কার্যক্রম দৃশ্যমান নয়— এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বাজার সংযোগ, গবেষণা, রপ্তানি উন্নয়ন ও কৃষি ব্যবসা শাখার পরিচালক ড. মুনসুর আলম খান বলেন, আমরা কাজ করে যাচ্ছি। এ বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। ডিজির সঙ্গে যোগাযোগ করুন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা ও বিভাগীয় পর্যায়ের বেশিরভাগ উপ-পরিচালকের পরিবার ঢাকাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় শহরেই বসবাস করেন। ফলে বিধিতে না থাকলেও কৃষি অর্থনীতিবিদ না হওয়া সত্ত্বেও প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল ক্যাডারের উচ্চপর্যায়ের পদগুলো দখল করে আছেন প্রশাসন ক্যাডারের যুগ্ম সচিব ও উপ-সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের উপ-পরিচালক শাহানা আখতার জাহান বিগত সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়ে ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও ৫ম গ্রেডের উপ-পরিচালক পদে কর্মরত রয়েছেন। অন্যদিকে খুলনা বিভাগের উপ-পরিচালক পদে রয়েছেন মোছা. শাহনাজ বেগম, যিনি কয়েক মাস আগে অন্য অধিদপ্তরে বদলি হলেও পুনরায় তদবির করে খুলনাতেই ফিরে এসেছেন। এ ছাড়া এসব কর্মকর্তা অধিদপ্তরের চলমান বিভিন্ন প্রকল্পে মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত হয়ে অতিরিক্ত অর্থ আয় করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে রাজশাহী বিভাগের উপ-পরিচালক শাহানা আখতার জাহানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। অধিদপ্তরের সবচেয়ে বড় দুটি প্রকল্প— এসএসিপি ও পার্টনার প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বও প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসা উপসচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
ডিজি নেই ১৪ মাস : কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (মহাপরিচালক, বীজ উইং) নাসির-উদ-দৌলা, যিনি প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য। মহাপরিচালক পদটি ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে প্রায় ১৪ মাস ধরে শূন্য রয়েছে এবং নাসির-উদ-দৌলা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে এই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। কর্মব্যস্ততার কারণে তিনি খামারবাড়ীর অফিসে প্রায়ই উপস্থিত হতে পারেন না। ফলে অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের যেকোনো কাজের জন্য ফাইল নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যেতে হয়। সাংবাদিকরাও প্রয়োজনের সময় তাকে ফোনে যোগাযোগ করতে পারছেন না। ফলে কৃষিপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার দায়িত্বপ্রাপ্ত এ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম কার্যত তদারকিহীন হয়ে পড়েছে। মহাপরিচালকের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
জনবল সংকটও তীব্র : কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের ৭টি পরিচালক ও ১৫টি উপ-পরিচালকসহ মোট ৯৮২ জন জনবলের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৭০০ জন। ৭টি পরিচালক পদে দুটি শূন্য। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী, প্রথম শ্রেণির ২২৮টি পদের মধ্যে কর্মরত ৮৪ জন, দ্বিতীয় শ্রেণির ৫৩ পদের মধ্যে ২৭ জন, তৃতীয় শ্রেণির ৪০২ পদের মধ্যে ৩২১ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ২৯৯ পদের বিপরীতে ২৬৮ জন কর্মরত রয়েছেন।
সরকারি চাকরি আইন ২০১৮ ও কৃষি ক্যাডার অনুযায়ী, পরিচালক ও উপ-পরিচালকদের কৃষি অর্থনীতিতে ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী পরিচালক হতে হলে কমপক্ষে ৪ বছরের উপ-পরিচালক বা ১৪ বছরের ক্যাডার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। উপ-পরিচালক হতে হলে ৫ বছরের সিনিয়র এগ্রিকালচার মার্কেটিং অফিসার ও ১০ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন এবং সিনিয়র এগ্রিকালচার মার্কেটিং অফিসার হতে হলে ৫ বছরের অ্যাসিস্ট্যান্ট এগ্রিকালচার মার্কেটিং অফিসারের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া অ্যাসিস্ট্যান্ট এগ্রিকালচার মার্কেটিং অফিসারের জন্য ৫ বছরের অভিজ্ঞতা বা ১৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, যেখানে ১০ শতাংশ পদোন্নতি ও ৯০ শতাংশ রিক্রুটমেন্টের বিধান রয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, পদোন্নতি না দিয়ে বাইর থেকে জনবল নিয়োগ দেওয়ায় তাদের মনোবল ভেঙে যাচ্ছে। পাশাপাশি, বাইর থেকে পদায়িত কর্মকর্তারা অফিসকে বেকার সময় কাটানোর জায়গা হিসেবে ব্যবহার করছেন। তারা সকালে আসে, বিকালে বেরিয়ে যায়, কোনো কাজে অংশগ্রহণ করেন না এবং কোনো জবাবদিহিতাও নেই।
সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধান : কৃষি বিপণন অধিদপ্তরে গত ১৪ মাস ধরে কোনো মহাপরিচালক নেই। ফলে কার্যক্রম কার্যত স্থবির। এ বিষয়ে পদক্ষেপ জানতে চাইলে কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, অচিরেই অধিদপ্তরের কার্যক্রম সচল করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখানে যেসব সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে সমাধান করা হবে।
অধিদপ্তর বর্তমানে প্রশাসনের ডাম্পিং স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিভিন্ন সময়ে গিয়ে দেখা যায়, কর্মরত বিপুলসংখ্যক জনবল অলস সময় কাটাচ্ছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজ না থাকলে কাজ সৃষ্টি করতে হবে। সেখানে সক্ষম জনবল থাকলে তারা কাজ সৃষ্টি করতে পারবে।