আসাদুজ্জামান সম্রাট
প্রকাশ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৪১ এএম
জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলের সাউন্ড সিস্টেমের পুরোটাই পাল্টে ফেলা হচ্ছে। ফাইল ফটো
একের পর এক বিভ্রাট ও কয়েক দফা সংসদ কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর জাতীয় সংসদের প্লেনারি হলের সাউন্ড সিস্টেমের পুরোটাই পাল্টে ফেলা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম পুরো সিস্টেম পাল্টানোসহ ইতঃপূর্বে এর সংস্কার কাজের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এর আগে একজন নির্বাহী প্রকৌশলীকে সংসদের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
জাতীয় সংসদের সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী ও ইএম জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আশ্রাফুল হক সোমবার জাতীয় সংসদে স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন তার সঙ্গে। এ সময় স্পিকার দেশের সর্বোচ্চ হাউসের সংস্কার কাজের ক্ষেত্রে অবহেলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন। তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জাতীয় সংসদ ভবনের তারা অধিবেশন কক্ষ, শপথ কক্ষ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সংসদ উপনেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ ও হুইপদের কক্ষসহ নয় তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষই তছনছ হয়। সংসদ এলাকায় অবস্থিত স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও হুইপদের ভিআইপি বাসভবনসহ সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বাড়িগুলোতেও ভাঙচুর ও লুটপাট চলে। ঘটনার প্রায় এক মাস পরে জাতীয় সংসদ সচিবালয় সংসদ ভবন ও সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষয়ক্ষতির একটি তালিকা প্রস্তুত করেÑ যাতে শুধু বৈদ্যুতিক খাতেই ক্ষতি চিহ্নিত করা হয় ৭৩ কোটি টাকা। সিভিল ও ইলেকট্রো মেকানিক্যাল ক্ষয়ক্ষতি প্রায় ১৫০ কোটি টাকার হলেও নির্মাণ ও সংস্কারের জন্য এই পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
জাতীয় সংসদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত গণপূর্ত অধিদপ্তর ক্ষয়ক্ষতি ও সংস্কারের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছিল। তাতে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল, যার সংস্থান করতে পারেনি অধিদপ্তরটি। তবে জাতীয় সংসদ সচিবালয় থেকে সমপরিমাণ অর্থের নির্মাণ ও সংস্কারের নির্দেশনা ছিল। তাতে সংসদ ভবনের ভেতরে বিভিন্ন ব্লকের মেইন সার্ভিস লাইন, ক্ষতিগ্রস্ত সুইচ, সকেট, পয়েন্ট ওয়্যারিং, এলইডি লাইট, টিউবলাইট, সার্কিট ব্রেকার সরবরাহ ও পুনঃসংস্কারকরণে স্বল্পমেয়াদি অনেক কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
ভবনের প্ল্যানারি হলের ক্ষতিগ্রস্ত এসআইএস সিস্টেম সরবরাহ ও স্থাপনের জন্য ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ ধরা হলেও বাজেটস্বল্পতার কারণে তা জোড়াতালি দিয়ে রিপেয়ার করা হয়েছে। মাত্র ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করায় এর স্থায়িত্ব এবং কার্যক্ষমতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন উঠেছিল।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী দিনেই সাউন্ড সিস্টেমে বিপর্যয় হয়। নবনির্বাচিত স্পিকার (এসআইএস) সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহার করে কথা বলতে পারেননি। সেদিন ২০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়েছিল। পরে স্পিকার হ্যান্ড মাইক ব্যবহার করে তার উদ্বোধনী বক্তৃতা করেন। এ ঘটনার পরে সপ্তাহখানেক সাউন্ড সিস্টেম ভালোভাবে কাজ করলেও গত রোববার আবারও বিপত্তি দেখা দেয়। এ পর্যায়ে স্পিকার মাইক বিভ্রাটের জন্য ২০ মিনিট, মাগরিবের নামাজের জন্য ২০ মিনিটসহ ৪০ মিনিটের জন্য সংসদ অধিবেশন মুলতবি করেন। প্রায় ১ ঘণ্টা ১৮ মিনিট পর সংসদের অধিবেশন শুরু হয়।
মাগরিবের নামাজের বিরতির পর অধিবেশন শুরু হলে স্পিকার মাইক বিভ্রাটের কারণ সংসদকে জানান। তিনি বলেন, তিনি জেনেছেন, দুটি কারণে এই বিভ্রাট। একটি কারণ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষুব্ধ জনতা সংসদের আসবাবপত্র তছনছ করেছে। আরেকটি কারণ হলো সংসদে মাইক সিস্টেম যারা স্থাপন করেছে, সেগুলোর আদৌ কোনো ওয়ারেন্টি ছিল কি না, এর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাওয়া যাচ্ছে না।
স্পিকার বলেন, ‘আমি সংসদের সচিবকে নির্দেশ দিয়েছি, এ ব্যাপারে একটি তদন্ত কমিটি করে প্রকৃত তথ্য জানানোর জন্য। কারণ, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ এই হাউস, এই জাতীয় সংসদে এভাবে বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটাÑ এটা আমাদের জাতির জন্য, রাষ্ট্রের জন্য কলঙ্কজনক।’
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে গতকাল সোমবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সঙ্গে দেখা করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পুরো টিম। তার আগে জাতীয় সংসদের প্ল্যানারি হলে দিনভর সংস্কার কাজ করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা। এ সময়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে হাউস চালানো অনেকটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় দ্রুত সময়ের মধ্যে বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাউন্ড সিস্টেম প্রতিস্থাপনের নির্দেশ দেন স্পিকার। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় চলতি অধিবেশন শেষ হওয়ার পরপরই এর কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন স্পিকার। তিনি বলেন, ‘এই অধিবেশন শেষে আপনারা এক মাসের মতো সময় পাবেন। এই সময়ের মধ্যেই পুরো সিস্টেমটা প্রতিস্থাপন করতে হবে।’ তিনি জানান, বাজেট অধিবেশনের আগেই নতুন সাউন্ড সিস্টেম দিতে হবে।
বিষয়টি স্বীকার করে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্পিকার মহোদয়ের নির্দেশে বিশ্বের সর্বাধুনিক এসআইএস সিস্টেম বসানো হবে। আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে সারা বিশ্বে খোঁজ নিয়ে তা সংগ্রহের চেষ্টা করব।’
জাতীয় সংসদ ভবনের সাউন্ড সিস্টেমের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী আর কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, ‘এখানে সুপারভিশনে কিছু সমস্যা তো ছিল। প্রকৌশলগত জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তার অভাব আমাদের রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আরও কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’ তবে কার কার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানাননি।