ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ১২:০৮ পিএম
আবহাওয়া ভবন। ছবি: সংগৃহীত
এপ্রিল সাধারণত বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেরও উষ্ণতম মাস। এ মাসে মৃদু থেকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহের নজির রয়েছে। গত দুই এপ্রিল থেকে দেশে মৃদু ও মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। এদিন দেশের ২৩ জেলায় তাপপ্রবাহ শুরু হয়। সূচনা দিনেই বগুড়ায় হিটস্ট্রোকে আবু সামাদ (৫৫) নামে এক রিকশাচালকের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শুক্রবার তাপপ্রবাহের পরিধি বেড়ে ২৮ জেলায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। তাপপ্রবাহের কারণে ধান উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভার পড়ার সমূহ আশঙ্কা। একই সঙ্গে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে চলে গেলে আম উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বর্তমানে গাছে গুটি আম রয়েছে। তা ছাড়া জ্বর, সর্দি-কাশি ও ডায়রিয়া জাতীয় রোগবালাই ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
এক দিনের ব্যবধানে তাপমাত্রা বেড়েছে সাড়ে ৪ ডিগ্রি
এক ও দুই এপ্রিলের মধ্যে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা বেড়েছে সাড়ে চার ডিগ্রি পর্যন্ত বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, এক এপ্রিল কুড়িগ্রামে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩০ ডিগ্রি। দুই এপ্রিল তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪.৫ ডিগ্রি। আবার সর্বনিম্ন তাপমাত্রাও সাড়ে ৪ ডিগ্রি বেড়েছে। প্রথম দিন কুমিল্লায় তাপমাত্রা ছিল ২০ ডিগ্রি ও পরের দিন তা বেড়ে ২৫ ডিগ্রিতে দাাঁড়ায়।
আবহাওয়া অধিপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. বজলুর রশিদ বলেন, বৃহস্পতিবারে শুরু হওয়া তাপপ্রবাহ কোথাও মৃদু ও কোথাও মাঝারি পর্যায়ের ছিল। এটি সোমবার পর্যন্ত কমে যেতে পারে। আবার এক সপ্তাহ পরে দীর্ঘ সময় ধরে তাপ প্রবাহ বয়ে যেতে পারে। এ সময় অস্বস্তিটা বেশি হতে পারে।
দেশের ২৮ জেলায় তাপপ্রবাহ, সর্বোচ্চ চুয়াডাঙ্গায়
আবহাওয়া অধিদপ্তর গতকাল সন্ধ্যা ৬টায় জানিয়েছে, তাপমাত্রা দ্বিতীয় দিন দেশের ২৮ জেলায় বিস্তৃতি লাভ করেছে। এসব জেলার মধ্যে রয়েছেÑ ঢাকা বিভাগের ঢাকা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মানিকগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম বিভাগের রাঙামাটি, চাঁদপুর, বরিশাল বিভাগের বরিশাল ও পটুয়াখালী।
খুলনা বিভাগের ১১ জেলার খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, কুমারখালীর, মেহেরপুর, মাগুরা ও চুয়াডাঙ্গা। রাজশাহী বিভাগের ৮ জেলার রাজশাহী, বগুড়া, নওগাঁ, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ ও জয়পুরহাট।
গতকাল শুক্রবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায়। জেলাটিতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ৩৯.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় বাতাসের আর্দ্রতা ছিল ৩১ শতাংশ। বৃহস্পতিবার তাপমাত্রা ছিল ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
তাপমাত্রার এই ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষ পড়ছে বিপাকে। বিশেষ করে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘরের বাইরে বের হতে চাইছেন না। তীব্র রোদে শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক এবং কৃষকরা কাজ করতে গিয়ে কাহিল হয়ে পড়ছেন । জেলার কোথাও কোথাও সড়কের পিচ গলে গেছে।
এদিকে টানা তাপপ্রবাহে সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রখর রোদ ও ভ্যাপসা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। প্রয়োজন ছাড়া কেউ ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন খেটে খাওয়া দিনমজুর ও শ্রমজীবী মানুষ।
উপজেলার ভুইয়াগাতী এলাকার ভ্যানচালক মো. কাওছার আলী বলেন, এই গরমে রাস্তায় বের হওয়া যায় না।
ঢাকাতেও দুদিন ধরে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। গতকাল শুক্রবার হওয়ায় রাস্তাঘাটে লোকজন কম ছিল। তেল নেওয়ার জন্য দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষা করছিলেন শহিদুল ইসলাম নামের এক চালক। তিনি বলেন, অত্যধিক গরমে অবস্থা কাহিল। এমনিতেই তেলের সংকট। আবার শুরু হয়েছে তাপপ্রবাহ। জীবন অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
গতকাল রাজধানীতে তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৪ ডিগ্রি। সরেজমিন দেখা যায়, গতকাল দুপুরে গরমে মানুষের মধ্যে অস্বস্তি বিরাজ করছে। অনেকেই গরম থেকে বাঁচতে রাস্তার পাশে থাকা শরবতের দোকানগুলোতে ভিড় জমিয়েছে। তা ছাড়া তরমুজের বিক্রিও বেড়ে গেছে।
৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা ধানের জন্য ক্ষতিকর
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সিনিয়র সায়েন্টিস্ট ও অ্যাগ্রো-ক্লাইমেট চেঞ্জ এক্সপার্ট ড. মোহাম্মদ কামরুজ্জামান মিলন বলেন, বর্তমানে ধানের থোড় আসছে। এই সময় তাপপ্রবাহ ধানের জন্য ক্ষতিকর। কেননা ৩৫ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা থাকলে তাহলে ধান চিটা হয়ে যাবে। তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ক্ষেতে পানি ধরে রাখতে হবে। কেননা ধানের জন্য আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে দিনের বেলায় ৩৫ ডিগ্রির নিচে ও রাতে ২৬ ডিগ্রির নিচে থাকলে উৎপাদন ভালো হয়।
রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মো. আরিফুর রহমান বলেন, বর্তমানে গাছে আম গুটি অবস্থায় আছে। এ অবস্থায় আদর্শ তাপমাত্রা হচ্ছে ২৫ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সহনশীল তাপমাত্রার মধ্যে সর্বনিম্ন হচ্ছে ১৫ ডিগ্রি ও সর্বোচ্চ ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ১৫ ডিগ্রির নিচে তাপমাত্রা হলে গুটির বৃদ্ধি কমে যায়। আম ঝরে যেতে পারে। আবার ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির বেশি হলে গুটি ছোট আকার ধারণ করবে।
তিনি বলেন, রাজশাহীতে এখন পর্যন্ত ৪০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা ওঠেনি। মো. আরিফুর রহমানের প্রত্যাশা এ বছর কোয়ালিটি সম্পন্ন আম উৎপাদন হবে। এতে বিদেশে রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, চৈত্র মাস গরম শুরু হয়ে গেছে। গরমের সঙ্গে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়ছে। এতে কর্মজীবী মানুষের কষ্ট বাড়ছে। তাপপ্রবাহের কারণে কৃষক, কৃষি শ্রমিক, রাস্তাঘাটে কাজ করা শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষকে রোদে কাজ করার সময় দীর্ঘক্ষণ একই কাজ করা যাবে না। কিছুক্ষণ পর পর বিরতি দিয়ে কাজ করতে হবে। মাথায় কোনো কিছু দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে।
তিনি বলেন, গরমের সময় রাস্তায় শরবতের নামে নানা পানীয় জাতীয় পণ্য বিক্রি হয়Ñ এসব খাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কেননা এসবের পানি ও উপকরণ অনেক সময় স্বাস্থ্যসম্মত থাকে না। তা ছাড়া রাস্তায় ফল-ফলাদি খাবার থেকেও বিরত থাকতে হবে। বাইরে গেলে ঘর থেকে ফোটানো পানি নিয়ে বের হবেন। এসব পানি অবশ্যই টগবগে ফোটানো হতে হবে।
রাস্তাঘাটে খাবার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে এই প্রবীণ চিকিৎসক বলেন, রাস্তাঘাটে খাওয়া-দাওয়া থেকে সাবধান থাকতে হবে। কেননা অনেক সময় খাবার নষ্ট থাকে। এতে করে রোগবালাই হতে পারে। বিশেষ করে ডায়রিয়ার মতো রোগ হতে পারে। বাচ্চাদের প্রতি বিশেষ নজর রাখতে হবেÑ যাতে ফাস্টফুড জাতীয় খাবার না খায়।
গরম জাতীয় রোগ বাড়ে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গরমে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, অ্যাজমার মতো রোগ বেড়ে যায়। আর এখন দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোগীদের আলাদা রাখতে হবে।