হাসনাত শাহীন
প্রকাশ : ০৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৩৯ এএম
আর কয়েকদিন পরই পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষে ব্যবসার হিসাব লেখা হবে নতুন খাতায়। ব্যাবসায়ীদের চাহিদার যোগান দিতে সেই খাতা প্রস্তুত করছেন কারিগররা। শুক্রবার পুরান ঢাকায়। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
বাঙালির মহোৎসবের দিন পহেলা বৈশাখ। দেশের সব জাতি-গোষ্ঠী তাদের স্ব স্ব সংস্কৃতি তুলে ধরে এবারের বর্ষবরণ করতে উচ্ছ্বাস, আবেগ আর উল্লাসে নতুন করে জেগে উঠবে। ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’Ñ রবীন্দ্রনাথের চিরায়ত বাঙালি চেতনার এই গানের সঙ্গে চির নতুনের ডাকে পহেলা বৈশাখের ভোরে জেগে উঠবে নগর-বন্দর-গ্রাম-গঞ্জের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত। আনন্দ শোভাযাত্রা, নাচ, গান, আবৃত্তি, নাটক, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পালাগান, গম্ভীরা, বাউলগানসহ আবহমান বাংলার লোকজ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে রাজধানীবাসী ‘বঙ্গাব্দ ১৪৩৩’কে বরণ করবে। সে লক্ষ্যে বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের আয়োজনে বের করা হবে বৈশাখের সবচেয়ে বড় এই আয়োজন বর্ণিল শোভাযাত্রা। ‘নববর্ষের ঐকতান, গণতন্ত্রের পুনরুত্থান’ শীর্ষক প্রতিপাদ্য সামনে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে এখন চলছে এই আনন্দ শোভাযাত্রা’র প্রস্তুতি।
বিদায় ঘনিয়ে এসেছে ঋতুরাজ বসন্তের। আর কয়েক দিন পরেই শেষ হবে বসন্ত ঋতুর শেষ মাস ‘চৈত্র’। প্রকৃতিতেও বেজে উঠেছে চৈত্রের বিদায়ের সুর। সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা, অগ্নিস্নানে সূচি হোক ধরা’Ñ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই পঙ্ক্তিতে উজ্জীবিত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত হয়ে উঠেছে আনন্দ শোভাযাত্রার প্রস্তুতিতে। গতকাল শুক্রবার (চৈত্রের ২০ তারিখ) দুপুরে চারুকলা অনুষদে গিয়ে দেখা গেছে তারই আবহ। শিক্ষার্থীরা দলবেঁধে শোভাযাত্রার জন্য বিভিন্ন মোটিফ প্রস্তুত করছেন। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের শোভাযাত্রার প্রধান পাঁচটি মোটিফ হচ্ছেÑ লালঝুঁটির মোরগ, দোতারা, ঘোড়া, পাখি ও পায়রা।
এ বিষয়ে চারুকলা অনুষদের ডিন ও শোভাযাত্রা উদযাপন পরিষদের সদস্য সচিব অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল জানান, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসানের পর জনসাধারণের বহুল কাঙ্ক্ষিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জনমনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। এবারের শোভাযাত্রায় থাকবে না কোনো রাজনৈতিক চেতনার প্রতীক। সর্বস্তরের মানুষের অন্তর্ভুক্তি ও গণতন্ত্রের উত্তরণের বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়ে উৎসবের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশাল আকৃতির লালঝুঁটির মোরগ, পায়রা, দোতারা, ঘোড়া ও মাছÑ এই পাঁচটি মোটিফ এবারের শোভাযাত্রায় প্রাধান্য পেয়েছে বলে জানালেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের অধ্যাপক কাওসার হাসান টগর। তিনি বলেন, গ্রামবাংলার মানুষ মোরগের ডাক শুনেই ভোরবেলায় ঘুম থেকে জেগে ওঠে। পায়রা শান্তির প্রতীক। আর বিগত সময়ে বাউল সম্প্রদায়ের প্রতি নানা রকমের হামলা ও তাদের অপদস্থ করার চেষ্টা চলেছে। শোভাযাত্রায় দোতারার প্রতীক বহনের মধ্য দিয়ে বাউলদের প্রতি সংহতি প্রকাশের বিষয়টি থাকবে।
এদিকে বৈশাখ উদ্যাপনের অন্যতম কার্যক্রম হিসেবে চারুকলার বকুলতলায় বাংলা বছরের শেষ দিন চৈত্রসংক্রান্তির ও নববর্ষ বরণের সাংস্কৃতিক কর্মসূচিও হাতে নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ। ১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি উদ্যাপনের মধ্য দিয়ে শুরু হবে এ অনুষ্ঠানÑ বেলা ৩টা থেকে নাচগানের এ আয়োজন চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। আর ১৪ এপ্রিল সকালে বের হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা।
বাংলা নববর্ষকে বর্ণাঢ্য আয়োজনে রাঙিয়ে তুলতে ১৯৮৯ সাল থেকে চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে রাজধানীতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। শোভাযাত্রাটি ফুটিয়ে তোলা হয় ঐতিহ্যবাহী লোকসংস্কৃতি ও লোকশিল্পের বিভিন্ন চরিত্র ও প্রতীকের মাধ্যমে। বিশ্বের অন্যতম সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা ২০১৬ সালে ইউনেস্কোর কালচারাল হেরিটেজের গর্বিত স্বীকৃতি অর্জন করে।
প্রসঙ্গত, গত ৩১ মার্চ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদযাপন কমিটির সভায় প্রতিপাদ্য, শোভাযাত্রার প্রতীক ও কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হয়েছে।
গতবার মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম পরিবর্তন করে আনন্দ শোভাযাত্রা নামকরণ করা হলেও এবারের শোভাযাত্রার নাম এখনও ঠিক করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন ও নববর্ষ উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখ চঞ্চল। তিনি জানান, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় সভায় পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রার নাম চূড়ান্ত করা হবে।