নুপা আলম, কক্সবাজার
প্রকাশ : ০৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২১ এএম
গত ১ এপ্রিল থেকে ‘নিড-বেসড’ পদ্ধতিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে খাদ্য সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের খাদ্য সহায়তা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। গত ১ এপ্রিল থেকে ‘নিড-বেসড’ বা প্রয়োজন ভিত্তিক নতুন পদ্ধতিতে তিনটি ক্যাটাগরিতে এই সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে। তবে এ সিদ্ধান্তের ফলে ক্যাম্পগুলোতে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নতুন এই সিদ্ধান্তটি মানবিক সংকট ঘনীভূত করবে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নতুন ব্যবস্থায় আগের সমহারে ১২ ডলারের পরিবর্তে পরিবারভেদে ৭, ১০ ও ১২ ডলার হারে মাসিক খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ডব্লিউএফপির তথ্যমতে, সবচেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ১৭ শতাংশ রোহিঙ্গা পাচ্ছেন ৭ ডলার, ৫০ শতাংশ পাচ্ছেন ১০ ডলার এবং অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৩৩ শতাংশ পাচ্ছেন ১২ ডলার (বিশেষ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ৩ ডলারসহ)। মূলত আন্তর্জাতিক অর্থায়নের চরম ঘাটতির কারণেই এই পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।
উখিয়া ক্যাম্পের বাসিন্দা লাল মতি জানান, তার ১২ সদস্যের পরিবারের জন্য ৭ ডলারের সহায়তা একেবারেই অপর্যাপ্ত। আয়ের কোনো উৎস না থাকায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের। ক্যাম্প-৩-এর বাসিন্দা আব্দুল শুক্কুর অভিযোগ করেন, সহায়তা কমানোর বিষয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। এ ছাড়া অভিযোগ জানানোর সঠিক প্রক্রিয়া সম্পর্কেও তারা অন্ধকারে আছেন।
আগে চাল, ডাল, তেল, চিনি ও পেঁয়াজসহ বিভিন্ন পণ্য দেওয়া হলেও বর্তমানে খাদ্য তালিকায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনেক প্রয়োজনীয় পণ্য তালিকা থেকে বাদ পড়ায় রোহিঙ্গাদের বাইরে থেকে চড়া দামে খাদ্য কিনতে হচ্ছে। ক্যাম্পের বাসিন্দা রায়জু, ছেনুয়ারা বেগম ও মোহাম্মদ ইদ্রিস জানান, সামান্য এই সহায়তা দিয়ে পুরো মাস চলা অসম্ভব। এর ফলে ক্যাম্পে চরম হাহাকার তৈরি হয়েছে।
আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ক্যাটাগরি ভিত্তিক সহায়তা প্রদান রোহিঙ্গাদের মধ্যে বৈষম্য ও বিভেদ তৈরি করছে। এতে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি ঘটতে পারে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ। যেসব পরিবারে কর্মক্ষম সদস্য আছে বা অন্য কোনো উপায়ে আয় করার সুযোগ রয়েছে, তাদের সহায়তার পরিমাণ কমানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) ডাটাবেজ ব্যবহার করা হচ্ছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান জানান, ২০১৭ সালের পর যেখানে রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় বছরে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলারের তহবিল থাকত, সেখানে ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০০ মিলিয়নে। চলতি বছরে প্রয়োজন প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার হলেও কত অর্থায়ন পাওয়া যাবে তা এখনও অনিশ্চিত।
তিনি বলেন, ২০১৭ সালে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, প্রায় সাড়ে ৭ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তখন মোট সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮ থেকে ৯ লাখে। পরবর্তীতে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০ হাজার শিশু জন্ম নেওয়ায় এই সংখ্যা বেড়েই চলেছে। এ ছাড়া ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে নতুন করে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। বর্তমানে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ, তবে অনিবন্ধিত আরও অনেক রোহিঙ্গা রয়েছে, যার নির্দিষ্ট হিসাব নেই।
তিনি আরও বলেন, ২০১৭ সালের পর আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতাগোষ্ঠীর সহায়তায় বড় পরিসরে ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। সে সময় যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার বার্ষিক আকার ছিল প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার, যার ৬০-৭০ শতাংশ অর্থায়ন পাওয়া যেত। কিন্তু গত কয়েক বছরে এ সহায়তা কমতে থাকে এবং ২০২৫ সালে তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
খাদ্য সহায়তা কমে যাওয়ায় ক্যাম্পগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে সতর্ক করে মো. মিজানুর রহমান বলেন, প্রয়োজনীয় অর্থায়ন না পেলে বড় ধরনের মানবিক সংকট দেখা দিতে পারে। খাদ্য সহায়তা কমে গেলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে, পুষ্টিহীনতা বাড়বে এবং অনেকেই জীবিকার সন্ধানে ক্যাম্পের বাইরে যেতে বা অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে ক্যাম্পগুলোতে চুরি-ডাকাতিসহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।