জঙ্গল সলিমপুর
আবু রায়হান তানিন, চট্টগ্রাম
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ১২:২৪ পিএম
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানকালে সেনা সদস্যদের সতর্ক অবস্থান। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযানের পর প্রশাসন এলাকায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথা বললেও সেখানকার মূল নিয়ন্ত্রক ইয়াসিন আলী এখনও অধরাই রয়েছেন। স্থানীয়দের দাবি, ইয়াসিন ও তার বাহিনী এখনও জঙ্গল সলিমপুর এলাকাতেই আছেন। সেখানে সবকিছুই আছে আগের মতোই। শুধু পুলিশের টহল বেড়েছে। এরই মধ্যে আশপাশের পাহাড়ে ঘাঁটি গেড়ে সব নিয়ন্ত্রণ করছেন ইয়াসিন। পাশাপাশি বিভিন্ন জনকে ফোন করে ফের দৃশ্যপটে ফেরার কথাও বলছেন।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাত থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর সাধারণ বাসিন্দাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে আসে। তবে কয়েক সপ্তাহের মাথায় ফের এলাকাবাসীর মনে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর সদস্যরা পলাতক থাকলেও তারা বিভিন্ন সময় মানুষকে ফোনে হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। বিশেষ করে ছিন্নমূলে এসে বিভিন্ন জনের গরু ও ছাগল চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। এলাকায় যে বিদ্যুৎব্যবস্থা রয়েছে, তা ফের তারা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা জানায়, সরকার-নির্ধারিত বিদ্যুৎ দামের থেকে সাধারণ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি টাকা আদায় করা হচ্ছে। আগেও যেখানে বিল দিতাম এখনও সেখানে বিল দিই। পানির লাইন অনেকে গভীর নলকূপ বসিয়ে দিচ্ছে। এটা প্রত্যেকের নিজস্ব ব্যবসা। ব্যক্তিভেদে ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়াসিনসহ তার বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গল সলিমপুর থেকে পালিয়ে প্রথমে আকবরশাহ থানাধীন শাপলা আবাসিক এলাকা এবং সংলগ্ন ১ নম্বর ঝিল, বেলতলীঘোনা ও নাছিয়াঘোনা এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে। পরে অভিযানের মুখে সেখান থেকে সরে জঙ্গল সলিমপুরে নবীনগর এবং পাশে থাকা চাকমাপাড়া নামে পরিচিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান করে তারা। সেখান থেকে তারা জঙ্গল সলিমপুর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। এর ফলে এলাকাবাসীর মনে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরের কী পরিস্থিতিÑ এ প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান বাবুর্চি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, একদমই ঠান্ডা। পুলিশ প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসিয়েছে। ঢোকার সময় কাউকে সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদ করে, অনেক সময় করে না। আর ভেতরে পুলিশ টহল দিচ্ছে। এর বাইরে সবকিছুই আগের মতোই আছে।
এ বিষয়ে একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা মনে করেন ইয়াসিন ও তার বাহিনী আশপাশেই আছে। কারণ অভিযানের সময় চারপাশের রাস্তায় চেকপোস্ট বসানো হয়েছিল। এর বাইরে পাহাড়ি জঙ্গল দিয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ থাকলেও সরার চেয়ে সেখানে অবস্থান নেওয়াই বেশি নিরাপদ তাদের জন্য। সাম্প্রতিক সময়ে আলীনগর ও আশপাশের অনেকের গরু ও ছাগল চুরি হচ্ছে। এতে তাদের ধারণা দৃঢ় যে, ইয়াসিন বাহিনী পাহাড়ি জঙ্গলেই আছে। আর খাবার প্রয়োজনে রাতে এসে তারাই এগুলো নিয়ে যাচ্ছে।
গত ১৫ মার্চ চট্টগ্রাম মহানগর বস্তিবাসী সমন্বয় সংগ্রাম পরিষদ নামে একটি সংগঠনের সভাপতি মো. ছায়েদুল হক ছাদু জঙ্গল সলিমপুরে ছিন্নমূলে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন, ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সোহেল রানা শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে এসব কার্যক্রম চালু রেখেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইনচার্জ সোহেল রানা বলেন, এলাকার বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুবিধা যাতে স্বাভাবিক থাকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের ফলে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তারা এসব অপপ্রচার চালাচ্ছে। ইয়াসিন এখনও জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় আছেনÑ স্থানীয়দের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ইয়াসিন সেখানে আছে না বের হয়ে গেছে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারব না। তবে আলীনগরে তার নিয়ন্ত্রণ এবং অবস্থান নেই এটা নিশ্চিত।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে অভিযানের সময় শাপলা আবাসিক এলাকা ও আশপাশে চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়, ফলে সন্ত্রাসীরা প্রবেশ করতে পারেনি। বর্তমানে ওই এলাকায় তাদের কোনো আস্তানার তথ্য নেই এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক। চেকপোস্টের মাধ্যমে সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি চলছে।
গত ৯ মার্চ ভোর থেকে জঙ্গল সলিমপুর ঘেরাও করে দিনব্যাপী অভিযান চালান সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর প্রায় চার হাজার সদস্য। অভিযানে ব্যবহার করা হয় হেলিকপ্টার ও ডগ স্কোয়াড। আলোচিত সেই অভিযানে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করাসহ ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ইয়াসিন, রোকন, মশিউর রহমান, নুরুল হক ভান্ডারি, গাজী সাদেক, গোলাম গফুরসহ কয়েকজন ‘সন্ত্রাসী’ পলাতক রয়েছেন।
অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরে দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প করেছে পুলিশ। এসব ক্যাম্পে সাড়ে তিন শতাধিক র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, সলিমপুর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি জঙ্গল। এক দশক আগে নোয়াখালী, হাতিয়া, বরিশালের বিভিন্ন উপকূলীয় অঞ্চল এলাকায় নদীভাঙনের শিকার জলবায়ু উদ্বাস্তুরা ভূমিহীন হয়ে সীতাকুণ্ডের গহিন জঙ্গলে পাহাড় কেটে আলীনগর নামে একটি বসতি গড়ে তোলে। শহরের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এই এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সেখানে গড়ে ওঠে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। রাজনৈতিক নেতাদের পৃষ্ঠপোষকতায় এই এলাকা থেকে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালানো হয়। ফলে পটপরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যায় এখানকার পরিবেশও। দীর্ঘ সময় ধরে এলাকাটি ইয়াসিন আলী নিয়ন্ত্রণ করছিলেন। ২০২২ সালে ইয়াসিন আলী প্রশাসনের অভিযানে গ্রেপ্তার হলে কিছু সময় শান্ত ছিল এলাকাটি। তবে ৫ আগস্টের পর আবার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেন ইয়াসিন। অন্যদিকে এলাকায় আধিপত্য তৈরিতে সচেষ্ট হন চট্টগ্রাম উত্তর জেলা যুবদলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রোকন উদ্দিন। এমন পরিস্থিতিতে দুপক্ষের আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বের জের ধরে ওই এলাকায় দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছিল।