নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৩৩ এএম
শেখ মামুন খালেদ এবং আফজাল নাছের। কোলাজ, প্রতিদিনের বাংলাদেশ
কোনো অভিযোগ ছাড়াই ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের তুলে এনে কোটি কোটি টাকা আদায় করতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ ও একই সংস্থার সাবেক পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মো. আফজাল নাছের। এভাবে দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদ গড়ে তুলেছেন তারা। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হেফাজতে রিমান্ডে থাকা এই দুই কর্মকর্তা এরকম নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য দিচ্ছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। সূত্রমতে, বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী গুমের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথাও মামুন স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির জয়েন্ট কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রথম দিকে তারা চুপ থাকলেও এখন মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তাদের কাছ থেকে ইলিয়াস আলী গুমসহ নানা বিষয়ে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক এই দুই সেনা কর্মকর্তার কাছ থেকে একাধিক ব্যক্তির নামও উঠে আসছেÑ তারা বিভিন্ন সময়ে নানা অপকর্মে যুক্ত ছিল। তাদের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, যাদের নাম এসেছে তাদের অনেকেই এখনও দেশে রয়েছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় যেকোনো সময় তাদের বিরুদ্ধেও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, এক-এগারো পরবর্তী সময়ে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয়ের ভেতরে থেকে এই দুই কর্মকর্তা ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের টার্গেট করতেন। প্রথমে নজরদারি ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, এরপর হঠাৎ করে তুলে নিয়ে যাওয়া হতো অজ্ঞাত স্থানে। সেখানে চলত নির্যাতন, ভয়ভীতি ও মানসিক চাপ প্রয়োগ। অনেক ক্ষেত্রে সাজানো হতো জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার নাটক, আবার কখনও গুমের ভয় দেখিয়ে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হতো। শেষ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের পরই মিলত মুক্তি। রিমান্ডে তারা এমন অসংখ্য ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন, যা তদন্তকারীদের বিস্মিত করছে।
শুধু ব্যক্তি পর্যায়ে নয়, বড় প্রকল্প ঘিরেও অর্থ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। জলসিঁড়িতে আবাসিক প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সক্রিয় অনুসন্ধানে রয়েছে। শেখ মামুন খালেদের নিজের এবং স্ত্রী নিগার সুলতানা খালেদের নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হলে হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির চিত্র সামনে আসতে পারে, যার বড় অংশ এখনও অদৃশ্য।
পরিবারকেন্দ্রিক প্রভাববলয়ের দিকটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা ও দুদক সূত্র। ডিজিএফআই পরিচালক থাকার সময় শেখ মামুন খালেদের স্ত্রী মেহের নিগার পাপিয়া এবং শ্যালক আমিনুল ইসলাম অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দুই মেয়ে ইমানি ও ইলমা বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। বিদেশে তাদের সম্পদ পাচারের দিকটিও খতিয়ে দেখছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।
অন্যদিকে আফজাল নাছেরের বিরুদ্ধেও একই ধরনের চাঁদাবাজি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে তিনি এখনও স্পষ্ট স্বীকারোক্তি না দিয়ে বিভিন্নভাবে তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছে রিমান্ড সংশ্লিষ্ট সূত্র। তবুও তার সম্পদ, আর্থিক লেনদেন ও অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে সমান্তরাল তদন্ত চালাচ্ছে গোয়েন্দা সংস্থা ও দুদক। তদন্তকারীদের একটি সূত্র জানাচ্ছে, সময়ের ব্যবধানে তার অপকর্মের পূর্ণাঙ্গ চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
দেশের বহুল আলোচিত গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গেও এই দুই কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা উদ্ঘাটিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনায় রিমান্ডে মুখ খুলেছেন শেখ মামুন খালেদ। তিনি দাবি করেছেন, টিপাইমুখ বাঁধ এবং ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট চুক্তির বিরোধিতায় আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়ায় ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। আরও বিস্ফোরক অভিযোগের মধ্যে রয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং এতে র্যাবও অংশ নেয়। ঘটনার আগে ও পরে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে ব্যক্তিগত গাড়িচালকসহ নিখোঁজ হন ইলিয়াস আলী। সে সময় ডিজিএফআই প্রধান ছিলেন শেখ মামুন খালেদ। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি স্বীকার করেছেন, গুমের অভিযানে ডিজিএফআইয়ের দুজন মেজর প্রযুক্তিগত সহায়তা দেন এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা আগে থেকেই পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতেন। যদিও গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পুরো অভিযানটি তার নির্দেশনাতেই পরিচালিত হয় এবং ডিজিএফআই ও র্যাবের একটি বিশেষ দল এতে অংশ নেয়।
এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবন থেকে উচ্ছেদের ঘটনাসহ আরও বেশকিছু বিষয়ে স্পর্শকাতর তথ্য দিয়েছেন তিনি। এক-এগারোর কুশীলব হিসেবে পরিচিত লে. জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গ্রেপ্তারের পরপরই মামুন খালেদ ও আফজাল নাছেরকে গ্রেপ্তার করা হয়Ñ যার ফলে পুরো তদন্ত নতুন গতি দিয়েছে।
বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন সংশ্লিষ্ট একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে রিমান্ডে রয়েছেন শেখ মামুন খালেদ। প্রথম দফায় ৫ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হলে পুনরায় ৭ দিনের আবেদন করা হয়, আদালত ৬ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একইভাবে আফজাল নাছেরকেও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে ডিবি।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ নাসিরুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেপ্তার সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যার ফলে তদন্ত নতুন করে গতি পাচ্ছে।’