আশরাফুল ইসলাম কহিনুর, হবিগঞ্জ
প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:২২ এএম
নবীগঞ্জের হাওরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
সবুজ ধানক্ষেত আর নীরব হাওরের বুক চিড়ে পড়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী। হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের শ্রীমতপুর গ্রামের পাশের নিতনী বিলে প্রায় ৮৪ বছর ধরে অযত্ন-অবহেলায় পড়ে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বিধ্বস্ত একটি যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষ। ইতিহাসের এই নিদর্শন আজও সংরক্ষণের অপেক্ষায়।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝখানে মাটির ওপর উঁকি দিচ্ছে বিমানের ভাঙা ধাতব অংশ। স্থানীয়দের ধারণা, দৃশ্যমান অংশের নিচে মাটির গভীরে এখনও চাপা পড়ে আছে বিমানের বড় একটি অংশ। ইতিহাসের এই নিঃশব্দ সাক্ষী দেখতে মাঝেমধ্যেই দূরদূরান্ত থেকে কৌতূহলী মানুষ ছুটে আসে।
এলাকার প্রবীণদের ভাষ্যমতে, ১৯৪২ সালের দিকে আশ্বিন মাসের এক সকালে একটি যুদ্ধবিমান কালিয়ারভাঙ্গা ও শ্রীমতপুর গ্রামের আকাশে বার বার চক্কর দিতে থাকে। কিছুক্ষণ পর বিকট শব্দে সেটি নিতনী বিলের হাওরে ভূপাতিত হয়। প্রচণ্ড শব্দে আতঙ্কিত মানুষ ছুটে এলেও ঘন ধোঁয়ার কারণে কিছুই দেখতে পায়নি। ধোঁয়া কাটতে লেগেছিল কয়েক দিন। এমনকি দুর্ঘটনার ছয় দিন পরও বিমানের ভেতরে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে বলে জানান অনেকে।
ঘটনার পর বিমানের অংশ সংগ্রহের আশায় কয়েকজন নৌকাযোগে সেখানে গেলে ঘটে আরেক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। হঠাৎ বিমানের ভেতরে থাকা একটি মিসাইল বিস্ফোরিত হলে শ্রীমতপুর গ্রামের সাজিদ মিয়া ও খালেক মিয়া ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এই ঘটনার পর পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন কেউ ওই স্থানের আশপাশে যেতে সাহস পাননি।
শতবর্ষী কৃষক মাতাব মিয়া ও ইউসুফ মিয়াসহ প্রবীণরা জানান, বিস্ফোরণের পর বহু বছর ধরে মানুষ ওই জমির পাশ দিয়েও যাতায়াতে ভয় পেতেন। আজও সেখানে গেলে অনেকের মনে সেই ভয়ের স্মৃতি জেগে ওঠে।
স্থানীয়দের দাবি, দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সময়ে সরকারি একটি বাহিনী এসে একাধিক বোমা ব্যবহার করে বিমানের কিছু অংশ ধ্বংস করে। পরে স্থানীয়রা কিছু ধাতব অংশ সংগ্রহ করলেও বিমানের বড় অংশ মাটির নিচেই থেকে যায়। সময়ের ব্যবধানে সেই ধ্বংসাবশেষকে ঘিরেই আবার শুরু হয় স্বাভাবিক কৃষিকাজÑ ধান চাষে সবুজ হয়ে ওঠে চারপাশ।
অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন সময় সরকারি সংস্থার কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করলেও এখনও পর্যন্ত ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার বা সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। স্থানীয়দের মতে, এটি কেবল একটি বিধ্বস্ত বিমান নয়Ñ এটি বিশ্ব ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। যথাযথ উদ্যোগ নিয়ে নিদর্শনটি উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হলে এখানে গড়ে উঠতে পারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক স্থান। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক বিস্মৃত অধ্যায়ের কথা।
সবুজ ধানক্ষেতের মাঝে নীরবে পড়ে থাকা এই ধ্বংসাবশেষ তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়Ñ এটি সংরক্ষণের অপেক্ষায় থাকা এক মূল্যবান ইতিহাস।