× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

৭২ বছরেও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ, হাওয়াই মিঠাই নিয়ে দ্বারে দ্বারে আব্দুর রশিদ

সাইফুল হক মোল্লা দুলু, মধ্যাঞ্চল

প্রকাশ : ০১ এপ্রিল ২০২৬ ১৮:০৩ পিএম

যে বয়সে নাতি-নাতনীদের নিয়ে বাড়িতে গল্পগুজব করে অবসরে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে পথে নেমেছেন আব্দুর রশিদ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

যে বয়সে নাতি-নাতনীদের নিয়ে বাড়িতে গল্পগুজব করে অবসরে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে পথে নেমেছেন আব্দুর রশিদ। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

৭২ বছর বয়সেও থেমে নেই জীবনযুদ্ধ। বয়সের ভারে নুজ্ব। শরীর নুইয়ে পড়েছে, কপালে বার্ধক্যের গভীর ভাঁজ। যে বয়সে নাতি-নাতনীদের নিয়ে বাড়িতে গল্পগুজব করে অবসরে সময় কাটানোর কথা, সেই বয়সে জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতাকে সঙ্গী করে পথে নেমেছেন এক বৃদ্ধ। পিঠে ঝোলানো হাওয়াই মিঠাইয়ের কাঁচের বাক্স, হাতে লম্বা কাঠি, তাতেই ঝুলছে রঙিন হাওয়াই মিষ্টি। এই সামান্য পুঁজিতেই কিশোরগঞ্জের অলিগলি আর জনবহুল এলাকাতে ঘুরে ফেরি করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন বৃদ্ধ আব্দুর রশিদ। ​

রঙিন মিঠাইয়ের আড়ালে ধূসর জীবনের কালো ছায়া। আব্দুর রশিদ সকাল হতে না হতেই শুরু করেন তাঁর নিত্যদিনের পথচলা। কাঁধে বাঁশের লাঠিতে ঝোলানো বাক্সে সাজানো থাকে গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই। শিশুদের কাছে যা এক টুকরো রঙিন মেঘের মতো আনন্দের, সেই মিঠাই ফেরি করা মানুষটির জীবন কিন্তু মোটেও রঙিন নয়। তীব্র রোদ কিংবা ঝড় বৃষ্টি কোনো কিছুই তাঁকে ঘরে আটকে রাখতে পারে না। কারণ ঘরে ফিরলে তাঁর পথ চেয়ে বসে থাকে অভাবী সংসারের সদস্যরা। এভাবেই ​অভাবের তাড়নায় বিরামহীন পথচলা।

​অনুসন্ধানে জানা যায়, জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জ উপজেলার গুণেরতলা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রশিদ এখন থাকেন কিশোরগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের পাশে একটি ভাড়া বাসায়। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও দায়িত্বের ভার তাকে থামতে দেয়নি। তাই গ্রামের ভিটেমাটি ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন শহরে—শুধু দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তার আশায়। প্রতিদিন সকালে শহরে ঘুরে ঘুরে তিনি এই মিঠাই বিক্রি করেন। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে চাল-ডাল আর স্ত্রীর ঔষধের খরচ জোটে।


সরেজমিনে জেলা শহরের গুরুদয়াল মুক্তমঞ্চ এলাকায় গিয়ে দেখা মেলে তার। আশপাশে মানুষের আনাগোনা, ব্যস্ততা—কিন্তু সেই ভিড়ের মাঝেও তিনি আলাদা। কারণ তার হাঁটা ধীর, কণ্ঠ ক্লান্ত, আর চোখে স্পষ্ট এক ধরনের নিরুপায় নীরবতা। জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক সৈনিক ​প্রতিটি দরজায় কড়া নেড়ে তিনি খুঁজে ফেরেন ক্রেতা। তাঁর এই সংগ্রামী জীবন সমাজের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে। তবুও তিনি হার মানতে নারাজ। যতক্ষণ শরীরে শেষ রক্তবিন্দু আছে, ততক্ষণ তিনি ঘাম ঝরিয়ে উপার্জন করতে চান।

বৃদ্ধ আব্দুর রশিদেট ‘হাওয়াই মিঠাই’ বিক্রি করতে দেখে অনেকেই স্মৃতিকাতর হয়ে ওঠেন, মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। এমনই একজন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার যশোদল ইউনিয়নের ভূবিরচর গ্রামের বাসিন্দা সবুজ মিয়া। সবুজ মিয়া বলেন, “ছোটবেলার সেই ‘হাওয়াই মিঠাই’য়ের স্বাদ এখনো মনে আছে। তাই এখনো ‘হাওয়াই মিঠাই দেখলেই কিনে বান্ধবীদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মজা করে খাই। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে বাজার করতে গেলে প্রথমেই হাওয়াই মিঠাইয়ের বায়না ধরতাম। মুগ্ধ হয়ে দেখতাম, কী মধুরই না ছিল সেই সব দিনগুলি”।

তাইফা সাইফ দোলা​ বলেন, "এক সময় তো চারপাশেই হাওয়াই মিঠা পাওয়া যেত, কিন্তু এখন আর চোখেই পড়ে না। আজ মুক্তমঞ্চে ঘুরতে এসে যখন হঠাৎ এটি দেখলাম, তখন আর লোভ সামলাতে পারলাম না। আসলে ছোটবেলায় আমরা প্রচুর হাওয়াই মিঠা খেতাম; সেই স্বাদটা আজও ভোলার নয়। অনেকদিন পর এটি খাওয়ার সুযোগ পেয়ে মনটা সত্যিই আনন্দে ভরে গেছে"।

তবে এই ক্রেতাদের আনন্দে আনন্দিত হকে পারেনে না আব্দুর রশিদ। বয়সের ভারে শরীরে নেই পূর্বের কর্মস্পৃহা। নিজের মুখেই জানালেন জীবনের গল্প।


 “এই বয়সে আর কাজ করতে ইচ্ছা করে না,” ধীর কণ্ঠে আব্দুর রশিদ বলেন, “শরীরে আগের মতো বল পাই না, অল্প হাঁটলেই বুক ধড়ফড় করে। কিন্তু ঘরে বসে থাকলে তো হাঁড়ি চড়বে না। এক সময় আমার দিনকাল অন্যরকম ছিল বড় করে মহিষের ব্যবসা করতাম, সাথে হালের আবাদও ছিল। তবে জীবন তো আর এক জায়গায় থেমে থাকে না। এখন বয়স হয়েছে, তাই আবাদের কঠিন পরিশ্রম ছেড়ে দিয়েছি। নিজের আবাদী জমি এখন না থাকলেও মাথা গোঁজার নিজস্ব ভিটেমাটিটুকু আছে”।

তিনি আরও বলেন, “​আমার তিন সন্তান, দুই মেয়ে আর এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি, তারা এখন যার যার সংসারে। ছেলে এখন নিজের মতো কাজ করে, গরু পালে। আমি চেয়েছি এই বয়সেও যেন কারো ওপর বোঝা হয়ে না থাকি, তাই নিজের উপার্জনে আলাদাভাবেই চলি। ​এখন জামালপুরের বাইরে যেখানে আছি, এখানকার মানুষজন খুব ভালো। কোনো ঝামেলা নেই, শান্তিতে ব্যবসা করা যায়। প্রতিদিন সকাল ৯টার দিকে বাসা থেকে হাওয়াই মিঠাই বিক্রির জন্য বের হয়। বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিক্রি কর “।

এই শহরের হাজারো মানুষের ভিড়ে আব্দুর রশিদের মতো মানুষরা প্রায় অদৃশ্য। অথচ তাদের প্রতিদিনের সংগ্রামই আমাদের চোখে দেখায়—বৃদ্ধ বয়স মানেই সবসময় বিশ্রাম নয়, অনেকের জন্য সেটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। সমাজের একটু সহানুভূতি, সামান্য সহায়তা হয়তো বদলে দিতে পারে তার শেষ জীবনের গল্প।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা