× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

মহাবিপদ সংকেত হয়ে উঠছে হাম

হাসনাত শাহীন

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ১২:০৭ পিএম

হাম আক্রান্ত শিশু মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

হাম আক্রান্ত শিশু মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

প্যারামক্সিভাইরাস গোত্রের মর্বিলিভাইরাসের অন্তর্গত ‘মিজলস মর্বিলিভাইরাস’ দ্বারা সৃষ্ট অত্যন্ত ছোঁয়াচে ও মারাত্মক সংক্রামক রোগের নাম হাম। দেশে প্রতিদিনই এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে ঢাকা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং পাবনায় একাধিক শিশু মারা গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ এতটাই বেড়েছে যে, শয্যার অভাবে অনেক হাসপাতালে রোগীরা মেঝে ও করিডোরে অবস্থান করছেন। স্বাস্থ্যকর্মীরাও রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

সোমবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতালে সরেজমিন দেখা গেছে, প্রতিদিনই হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে রেফার্ডকৃত রোগীরাও এসব হাসপাতালে আসছে।

শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নতুন করে খোলা হাম রোগের ওয়ার্ডে কথা হয় নোয়াখালী থেকে আসা হাম রোগে আক্রান্ত চাঁদনী আক্তার নামের এক শিশুর মা মুনিয়া আক্তারের সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে জানান, চাঁদনীর গত ৫ দিন ধরে জ্বর ছিল। প্রথমে নোয়াখালী হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। নোয়াখালী থেকে গত রবিবার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে মেয়েকে ভর্তি করিয়েছি। এখানের ডাক্তার ও নার্সরা বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা দিচ্ছেন। 

কয়েক বেড পরে সাত মাস বয়সী ছেলে সাফওয়ানকে দেখাশোনা করছেন মা সুমাইয়া আক্তার। তিনি এসেছেন সাভারের আমীনবাজার থেকে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ২২ মার্চ এখানে শিশু বিভাগে ছেলেকে ভর্তি করাই। তখন তার নিউমোনিয়া ছিল। পরে হাম হয়। এখানকার নার্স-ডাক্তারদের আন্তরিক সেবায় রবিবার থেকে একটু জ্বর কমেছে।

হাসপাতালের কর্মরত নার্সদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, গত ২৯ মার্চ থেকে হাম ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত (গত রবিবার বিকাল পর্যন্ত) এ ওয়ার্ডে ২০ জন রোগী ভর্তি হয়েছে। আমরা সরকারের নির্দেশমতো ভালো চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করছি।

শ্যামলীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও খোলা হয়েছে হাম ওয়ার্ড। এখানের কর্মরত নার্স ও ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে জানান গেছে, সেখানে গতকাল সোমবার বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ১৮ জন হামে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এখানে কথা হয় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল থেকে রেফার্ডকৃত ‘তাসবিদ’ নামের এক শিশুর চাচা আশরাফুল আলমের সঙ্গে। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, তাসবিদের বয়স ৭ মাস। গত কয়েক দিন ধরে তার খুব জ্বর। প্রথমে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ভর্তি করাই। রবিবার রাত ৮টায় এখানে এসেছি। এখন তাসবিদের চিকিৎসা চলছে। 

এদিকে প্রতিদিনের প্রতিবেদক এবং স্বাস্থ্য বিভাগ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর হাম রোগে অন্তত ৩৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মার্চ মাসেই ৩২ শিশু মারা গেছে। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক রোগ হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি ২১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ৬ জন, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫ জন, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ জন এবং রাজশাহী ও পাবনায় ১ জন করে শিশু মারা গেছে। তবে বিভিন্ন জেলা ও বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য যুক্ত করলে, এ বছর হাম রোগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ৪৬ বা তারও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার উপসর্গ নিয়ে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগের বয়স ১৫ মাসের নিচে। গতকাল সোমবার সরেজমিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, হাসপাতালের ৯ নম্বর ওয়ার্ড ও শিশু রোগ বহির্বিভাগে রোগীর ভিড় বেড়েছে। হাম ও হামজনিত নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে এক সপ্তাহে মোট ২০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

রংপুর

রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত চার শিশু ভর্তি রয়েছে। রোগীদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, বর্তমানে ৪ শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। 

বরিশাল

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, বরিশাল বিভাগে এ পর্যন্ত ২০৬ হাম আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে ৭৭ জন চিকিৎসাধীন। জানুয়ারি থেকে মার্চÑ এই তিন মাসে ৭ জন শিশু হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

সিলেট

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম জানান, বর্তমানে হামে আক্রান্ত ১৬ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

চাঁদপুর

চাঁদপুরে হামে আক্রান্ত ২৩ শিশুকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিন শিশু এ রোগে মারা গেছে বলে জানিয়েছেন চাঁদপুর সিভিল সার্জন নূরে আলম দ্বীন। 

মুন্সীগঞ্জ

মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে ৩ জন হামের রোগী ভর্তি রয়েছে বলে সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।

গোপালগঞ্জ

হামের উপসর্গ নিয়ে তুবা ইসলাম তোহা নামে ১০ মাসের এক কন্যাশিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। গত ২৭ মার্চ দুপুর ঢাকার মালিবাগের বিএনকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মৃত্যু হয়। সে মুকসুদপুর উপজেলার হোগলাডাঙ্গা গ্রামের তুহিন শেখের মেয়ে।

রাজশাহী

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এক দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে আরও ৫০ জন। রামেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান জানান, গত জানুয়ারি থেকে সোমবার সকাল পর্যন্ত হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৮০ জন। এর মধ্যে হাম পজিটিভ রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩৫ জন। হাম শনাক্ত হওয়া আরও একজন মারা গেছে। তবে উপসর্গ নিয়ে গত তিন মাসে ২৯ জন মারা গেছে, যাদের পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

বগুড়া

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ৩৬ জনের নমুনা পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুজনের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে এবং তারা ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে উঠেছে।

এদিকে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হামের টিকার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে গত রবিবার এক অনুষ্ঠানে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি অভিযোগ করেছেন, গত আট বছর ধরে অতি সংক্রামক এই রোগটির টিকা না দেওয়ায় এখন হামের প্রকোপ আবার দেখা দিচ্ছে। তবে রিউমর স্ক্যানার টিম জানিয়েছে, স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই দাবি সত্য নয়। গতকাল সোমবার দুপুরে তাদের ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর উপপরিচালক মো. শাহরিয়ার সাজ্জাদ বলেন, অনেক শিশু ৯ মাস বয়সে প্রথম ডোজ নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হচ্ছে। তাই টিকাদানের সময়সূচি পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সর্বশেষ ২০২০ সালে হামের টিকাদান ক্যাম্পেইন চালিয়েছিল; ২০২৪ সালে নতুন ক্যাম্পেইন করার পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। তবে এপ্রিলে নতুন ক্যাম্পেইন চালানোর কথা রয়েছে। গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স-গ্যাভির সহায়তায় সারা দেশে হাম টিকাদান ক্যাম্পেইন পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

শাহরিয়ার সাজ্জাদ জানান, সাধারণত প্রতি চার বছর অন্তর একটি বিশেষ হামের টিকা কর্মসূচি (ক্যাম্পেইন) পরিচালিত হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে এটি হয়েছিল। ২০২৪ সালে দেশের পরিস্থিতির জন্য টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া গত বছর স্বাস্থ্য সহকারীদের ধর্মঘটের কারণে তিনবার নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়েছিল। ভিটামিন-এ এবং কৃমিনাশক বড়ি খাওয়ানোর কর্মসূচি নিয়মিত না হওয়ায় শিশুদের পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে। এটাও হামের সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এ-সংক্রান্ত ডাটাবেজ থেকে জানা যায়, অন্তত ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রতিবছরই এই টিকার প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। এই হার কখনোই ৭০ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালের কোনো তথ্য এই ডাটাবেজে নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা বিভাগের (ইপিআই) নিজস্ব ড্যাশবোর্ডের তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে হামের টিকাদান হার কখনোই ৮১ শতাংশের নিচে নামেনি। তবে ২০২৫ সালে এই হার দাঁড়িয়েছে ৫৬.৫ শতাংশে। তবে টিকা কার্যক্রমের সাথে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ড্যাশবোর্ডের তথ্য অসম্পূর্ণ। অর্থাৎ গত ৮ বছরে হামের টিকা সরকার দেয়নি বলে যে দাবি ছড়াচ্ছে তা সঠিক নয়। ২০২০ সালেও সরকার হামের টিকার কর্মসূচির আওতায় টিকা দিয়েছে। 

অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেন্দ্রীয় পর্যায়ে হামের টিকার মজুদ প্রায় শেষ। মাঠপর্যায়ে মাত্র এক মাসের সরবরাহ রয়েছে। তবে বিশেষ ক্যাম্পেইনের জন্য প্রয়োজনীয় টিকা এরই মধ্যে দেশে এসে পৌঁছেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ঈদুল আজহার আগে বা পরে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হতে পারে।

হামের সংক্রমণের ক্ষমতা (আরও) অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের সংক্রমণ (এনসেফালাইটিস) হতে পারে। ডা. লুৎফুন্নেসা বলেন, হামের সুনির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই, মূলত জটিলতাগুলোর চিকিৎসা করা হয়। শিশুদের চোখের ক্ষতি রোধে ভিটামিন-এ এবং পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা জরুরি।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা