মো. বোরহানউদ্দিন মাহমুদ
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:৫৭ এএম
সাইফুজ্জামান চৌধুরী। ফাইল ফটো
ভুয়া কোম্পানি, কাগুজে ব্যবসা, কৃষককে ‘নামধারী মালিক’ বানিয়ে ব্যাংক লুট, তারপর সেই টাকা বিদেশে পাচার করে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার পরিবার সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। দুদক ও সিআইডির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে দুর্নীতির এ চালচিত্র; পাশাপাশি বিদেশে তার সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলার এবং অর্থ পাচারের সত্যতাও পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে আদালত বিশ্বের ৯ দেশে ছড়িয়ে থাকা তার ৮৯৮টি বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোকের নির্দেশও দিয়েছেন। দুদক ও সিআইডির তদন্তে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পাচার এবং শত শত কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতসহ ভূমিধস সব দুর্নীতির অভিযোগও মিলেছে।
দুদক সূত্র জানায়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বিচ্ছিন্ন নয়; বরং সুপরিকল্পিত আর্থিক জালিয়াতির বিস্তৃত নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুদকের একাধিক মামলা ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ভুয়া কোম্পানি, ব্যাংক হিসাব এবং সাধারণ মানুষকে ব্যবহার করে তিনি ও তার সহযোগীরা বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এসব দুর্নীতির পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রথম ধাপে এই চক্রের বিরুদ্ধে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) থেকে ৩১ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে দুদক চারটি মামলা করেছে। এসব জালিয়াতির ক্ষেত্রে কৌশল ছিল গ্রামের সাধারণ কৃষকদের ভুয়া পরিচয়ে ব্যবসায়ী বানিয়ে তাদের নামে হিসাব খুলে ঋণ তোলা।
এই প্রতারণার অংশ হিসেবে ইউনুস নামের এক কৃষককে ‘ইউনাইটেড ট্রেডিং’ নামক একটি সংস্থার মালিক দেখিয়ে ভুয়া মোবাইল নম্বর ও স্বাক্ষরবিহীন ফরমে হিসাব খোলা হয়। তারপর সেখান থেকে ৯ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়। একইভাবে নুরুল বাশারকে ‘বাশার ইন্টারন্যাশনাল’-এর মালিক দেখিয়ে ৮ কোটি টাকা, ফরিদুল আলমকে ‘ইউনিক এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক দেখিয়ে ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং আইয়ুবকে ‘মোহাম্মদিয়া এন্টারপ্রাইজ’-এর মালিক দেখিয়ে ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এসব মামলায় সাইফুজ্জামান, তার স্ত্রী ও ভাইবোনসহ তার একাধিক স্বজনকে আসামি করা হয়েছে। এসব হিসাবই খোলা হয়েছিল ভুয়া তথ্য দিয়ে বৈধ স্বাক্ষর ছাড়াই।
অনুসন্ধানের দ্বিতীয় ধাপে আরও বড় পরিসরে জালিয়াতির চিত্র উঠে আসে। ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে ৪৭ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৩৮ জনের বিরুদ্ধে সাতটি মামলা করে দুদক। অভিযোগ অনুযায়ী, ইউসিবির বিভিন্ন শাখার সাবেক পরিচালক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। তারা কৃষক, দিনমজুর, দর্জি, সেলসম্যানসহ সাধারণ মানুষকে ব্যবসায়ী সাজিয়ে তাদের নামে হিসাব খুলে ৪৬ কোটি ৭৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করে।
চকবাজার শাখা থেকে হোছন ট্রেডিংয়ের নামে ৭ কোটি ৫০ লাখ, কর্ণফুলী এম্পোরিয়ামের নামে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং জহির ইন্টারন্যাশনালের নামে ৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা তোলা হয়। পোর্ট শাখা থেকে ক্যাটস আই করপোরেশনের নামে ৬ কোটি ৯৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা, পাহাড়তলী শাখা থেকে শাহ ট্রেডিংয়ের নামে ৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং হারুন অ্যান্ড সন্সের নামে ৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়। বহদ্দারহাট শাখা থেকেও মল্লিক অ্যান্ড ব্রাদার্সের নামে আরও ৬ কোটি টাকা লোপাট করা হয়।
তৃতীয় ধাপে ‘ইম্পেরিয়াল ট্রেডিং’ নামের একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৪১ কোটি ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ সামনে আসে। আরামিট গ্রুপের এজিএম আব্দুল আজিজকে মালিক সাজিয়ে এই কোম্পানি তৈরি করা হয়, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই।
আত্মসাৎ করা হয় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে এক ডিলে ৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ইউসিবি কামাল বাজার শাখা থেকে ১৭টি ভুয়া ডিলে ৪১ কোটি ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ইউসিবি সদরঘাট শাখা থেকে ৯টি ডিলে ৪২ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রতিটি ঘটনায় পৃথকভাবে একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করা হয়েছে।
দেশের ভেতরে জালিয়াতির এই অর্থ পরে পাচার হয়েছে বিদেশেÑ এমনটাই বলছে সিআইডি। প্রায় ১২০০ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্ত্রী রুকমীলা জামানের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৬টি ফ্ল্যাট কিনেছেন তিনি, যেগুলোর মূল্য ৩৩ কোটি ৫৬ লাখ ৫৭ হাজার ১৬৮ দিরহাম।
স্ত্রীর নামেও দুবাইয়ে মূল্যবান সম্পত্তি রয়েছে সাবেক এই ভূমিমন্ত্রীর। দুবাই ইসলামিক ব্যাংক, জনতা ব্যাংক ও ফার্স্ট আবুধাবি ব্যাংকের হিসাব ব্যবহার করে প্রায় ৩১১ কোটি টাকার লেনদেন করা হয়েছে তার তত্ত্বাবধানে। এই অর্থ দিয়ে রাস আল খাইমাহ ইকোনমিক জোনে ‘জেবা ট্রেডিন এফজেডই’ ও ‘র্যাপিড রেপটর এফজেডই’ নামে দুটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে; যার জন্য কোনো সরকারি অনুমতি নেওয়া হয়নি।
তদন্তকারীদের সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করেছে সাবেক ভূমিমন্ত্রীর বিদেশে গড়ে তোলা সম্পদের পরিমাণ; যা তার ভূমিধস দুর্নীতির সুস্পষ্ট প্রমাণ। আদালত ইতোমধ্যে ৯টি দেশে থাকা তার ৮৯৮টি বাড়ি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট ও দোকান ক্রোকের নির্দেশ দিয়েছেন। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৫১৮টি সম্পদের মূল্য ২৭ কোটি ১৮ লাখ পাউন্ড; যুক্তরাষ্ট্রে ৪০টির মূল্য ৩ কোটি ৫৭ লাখ ডলার; কম্বোডিয়ায় ১১৭টির মূল্য ৪৩২ কোটি টাকা; আরব আমিরাতে ৫৯টির মূল্য প্রায় ৬৯৮ কোটি টাকা; ভিয়েতনামে ৩৩টির মূল্য ১৬৩ কোটি টাকা; মালয়েশিয়ায় ৪৭টির মূল্য ৩১৩ কোটি টাকা; থাইল্যান্ডে ২৩টির মূল্য ১৩৬ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভারতে তার ৯টি এবং ফিলিপাইনে ২টি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রে তার মালিকানাধীন জেডটিএস প্রোপার্টিজ ও তানয়ীম প্রোপার্টিজে বিনিয়োগও অবরুদ্ধ করা হয়েছেÑ যেগুলোর মধ্যে ১২২ কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে।
এ ছাড়া ১০২ কোটি টাকার শেয়ার, ৫৭৬ কোটি টাকার বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার, ৪৪ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব এবং ৯৫৭ বিঘা জমিও অবরুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্রতিমন্ত্রী এবং ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ভূমিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে এই সম্পদের বিস্তার ঘটেÑ এমন অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিষয়টি সামনে এলে শুরু হয় তদন্ত। দুদুক ও সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ শুধু ব্যক্তিকেন্দ্রিক দুর্নীতির চিত্র নয়, বরং রাষ্ট্রীয় আর্থিক ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে গড়ে ওঠা বিস্তৃত দুর্নীতির বিবরণ।