নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬ ০৯:১৯ এএম
সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা। ছবি: সংগৃহীত
নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও থামছে না কর্মসংস্থানের আশায় মরিয়া তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ সাগরপথে ইউরোপযাত্রা। উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে দেশের শত শত তরুণকে। সিলেট, সুনামগঞ্জ, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরÑ দেশের এই চার জেলার তরুণদের মধ্যে বিপদসঙ্কুল পথে হলেও কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশযাত্রার এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রতিবছরই প্রাণ হারাচ্ছে বিশ্বের, বিশেষত বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষ। এমনকি লাশও আর মিলছে না অনেকের। তবু থামছে না এই ভয়ংকর মরণযাত্রা। চক্রের দালালরা লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে ভাগ্যান্বেষণের জন্য জীবনবাজি রাখা তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে নির্যাতন, বন্দিদশা আর অনিশ্চিত মৃত্যুর দিকে। সর্বশেষ ২৭ মার্চ গ্রিস উপকূলে ১৮ বাংলাদেশির মৃত্যু আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এই চক্রের নির্মমতাকে।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, বাংলাদেশ-লিবিয়া রুটে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্রের শিকড় ছড়িয়ে আছে গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পর্যন্ত। এতে জড়িত স্থানীয় দালাল, লিবিয়াভিত্তিক এজেন্ট এবং আন্তর্জাতিক পাচারকারীদের সমন্বিত নেটওয়ার্ক। এমনকি সাবেক সেনা কর্মকর্তা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অনিবন্ধিত ট্রাভেল ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ততার তথ্যও মিলেছে। যাদের মূল হোতা হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে সাবেক এমপি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর।
এদিকে সর্বশেষ ঘটনার অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই বেদনাদায়ক ভয়ংকর ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ইচ্ছাগাঁও গ্রামের আজিজুল ইসলাম। বর্তমানে লিবিয়ায় অবস্থান করে বাংলাদেশিদের গ্রিসে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করছেন এই ব্যক্তি। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ১২ জনের পরিবারের কাছ থেকে তিনি দুই কিস্তিতে জনপ্রতি প্রায় ১২ লাখ টাকা করে আদায় করেন। অর্থ নেওয়ার পরও তাদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করা হয়নি; বরং ঠেলে দেওয়া হয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ পথে।
একইভাবে মাদারীপুরভিত্তিক আরেক চক্রনেতা মো. মোতালেব মাতব্বর দীর্ঘদিন ধরে এই পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলেন। তবে গত জানুয়ারিতে তিনি সিআইডির হাতে গ্রেপ্তার হয়ে বর্তমানে কারাগারে। যদিও তার নেটওয়ার্ক এখনও সক্রিয়। তার সহযোগীরা এজেন্টের মাধ্যমে একই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। মোতালেব মাতব্বরের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলাও রয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, মানব পাচার চক্র সাধারণত তিন স্তরে কাজ করে। প্রথম স্তরে থাকে স্থানীয় দালালরাÑ যারা গ্রামাঞ্চলের তরুণদের বিদেশে উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলে। দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে লিবিয়াভিত্তিক এজেন্টরাÑ যারা বিদেশযাত্রার পর তরুণদের আটকে রেখে নির্যাতন চালায় এবং পরিবার থেকে মুক্তিপণ আদায় করে। তৃতীয় স্তরে রয়েছে আন্তর্জাতিক পাচারকারীরাÑ যারা ভূমধ্যসাগরে নৌযান পরিচালনা করে থাকে। এদের বেশিরভাগই লিবিয়া, সুদান বা চাদের নাগরিক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সিন্ডিকেটের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এদের মূল হোতা হিসেবে অভিযুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী মানব পাচার মামলায় গ্রেপ্তারের পর বর্তমানে রিমান্ডে রয়েছেন। তার মালিকানাধীন ‘ফাইভ স্টার এন্টারপ্রাইজ’-এর আড়ালে চার জেলায় অসংখ্য ট্রাভেল এজেন্সি সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ প্রতারিত হয়েছেন। অনেকে শুধু নিঃস্বই হননি, প্রাণও হারিয়েছেন।
গোয়েন্দা তালিকায় পাচারকারী হিসেবে বিমান কর্মকর্তা মিজানুর রহমান শিশিরের নামও রয়েছে। গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর ওসমানী বিমানবন্দরে জাল নথিপত্রে ইউরোপে মানব পাচারের অভিযোগে তিনি আটক হন। তার সহযোগী কৃষ্ণ সুধাও নজরদারিতে রয়েছেন। এই চক্রটি শুধু সীমান্তে নয়, বিমানবন্দর ও কাগজপত্র জালিয়াতির স্তরেও বিস্তৃত বলে জানিয়েছে গোয়েন্দা সূত্র।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স ইউনিট জানিয়েছে, মানব পাচার করে অর্জিত বিপুল অর্থ হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই ও মালয়েশিয়ায় পাচার হচ্ছে। ঢাকাসহ চার জেলায় থাকা বেশকিছু নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ট্রাভেল এজেন্সি এই অর্থ পাচারে জড়িত। সংস্থাটি বলছে, এই চক্রের সদস্যরা শুধু মানব পাচার সিন্ডিকেটেই সীমাবদ্ধ নয়, অর্থনৈতিক অপরাধেও যুক্ত।
ইউরোপীয় সীমান্তরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ভূমধ্যসাগর হয়ে ৩৩৯৫ জন অবৈধ অভিবাসী ইউরোপীয় ইউনিয়নে প্রবেশ করেছেন, যাদের বড় অংশই বাংলাদেশি, সোমালিয়ান ও পাকিস্তানি। একই সময়ে বিভিন্ন রুটে প্রায় ১২ হাজার অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করেছেন। যদিও এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় ৫২ শতাংশ কম, তবে মৃত্যুহার বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। মাত্র দুই মাসেই ভূমধ্যসাগরে প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় ৬৬০ জন।
লিবিয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এই মরণযাত্রাকে দালালরা ‘গেম’ নামে অভিহিত করে। যেখানে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের আটকে রাখা হয়, সেগুলোকে বলা হয় ‘গেমঘর’। বাস্তবে গেমঘরগুলোই ভয়ংকর বন্দিশালা। যেখানে নেই আলো, বাতাস, পর্যাপ্ত খাবার বা পানি। সামান্য পানি চাইলেও চলে মারধর। নির্যাতনের মাত্রা এতই ভয়াবহ যে, সেখানেই অনেকের মৃত্যু ঘটে।
সম্প্রতি লিবিয়ার এমন গেমরুম নির্যাতনে নিহত হয়েছেন মাদারীপুরের ইলিয়াস হাওলাদার (২৫) ও ফারুক হাওলাদার (৩৫)। তাদের সেখানে আটকে রেখে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে ইলিয়াসের পরিবারের কাছ থেকে ২০ লাখ ও ফারুকের পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা আদায় করা হয়। মৃত্যুর পরও এক সপ্তাহ বিষয়টি গোপন রেখে এই অর্থ আদায় করা হয়।
সর্বশেষ ২৭ মার্চে সংঘটিত ঘটনায় যারা মারা গেছেন, তাদের ১২ জনই বাংলাদেশের সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। তবে মোট ৪৩ জনকে ছোট একটি নৌকায় করে গ্রিসের উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিলÑ যাদের ৩৮ জনই বাংলাদেশি। বড় নৌকায় পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও দালালরা কার্যত তাদের জোর করে ঝুঁকিপূর্ণ ছোট নৌকায় তুলে দেয়। কোনো জিপিএস বা যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় দীর্ঘ সময় সমুদ্রে ভাসতে থাকেন তারা। অসুস্থ হয়ে কেউ মারা গেলে দুই সুদানি দালালের নির্দেশে সে লাশ সাগরেই ফেলে দেওয়া হয়। সূত্রমতে, গত ২১ মার্চ লিবিয়ার তবরুক বন্দর থেকে নৌকাটি যাত্রা করে। এখনও লিবিয়ার বিভিন্ন ‘গেমঘরে’ বহু বাংলাদেশি বন্দি হয়ে আছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শ্যামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, মানব পাচার চক্র বাংলাদেশ ও লিবিয়াÑ উভয় দেশেই সক্রিয়। উন্নত জীবনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিপজ্জনক পথে পাঠিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে পাচারকারীরা। সরকার ইতোমধ্যে চক্রের শিকড় খুঁজে বের করতে নির্দেশ দিয়েছে এবং জানিয়েছে যে, প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিচার নিশ্চিত করা হবে। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোও ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে।