ফসিহ উদ্দীন মাহতাব
প্রকাশ : ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৭ এএম
আপডেট : ২৯ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৮ এএম
সচিবালয়। ফাইল ছবি
সচিব পদে সর্বসাম্প্রতিক নিয়োগ ঘিরে প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা-সমালোচনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত একাধিক কর্মকর্তাই আবারও পদোন্নতির তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে একই ধারার প্রভাব বজায় থাকায় প্রশ্ন উঠছেÑ তাহলে কি কেবল সরকারই বদলেছে, প্রশাসনিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটেনি?
বিশ্লেষকরা বলছেন, গত ২৫ মার্চ মধ্যরাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একযোগে যে ৯ জন কর্মকর্তাকে সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন করা হয়েছে তাদের কেউ কেউ বিগত সরকারের আমলে যেমন নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর ও অধিদপ্তরে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও এসব কর্মকর্তাই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে ছিলেন। তাদের কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সরকারে একটি বিশেষ দলের ‘গুপ্ত সমর্থক’ হিসেবেও আলোচিত হয়েছেন। ওই সময় তাদের কেউ কেউ বিভাগীয় কমিশনার পোস্টিং পেয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর তারা ভোল পাল্টে ‘গুপ্ত বিএনপি সমর্থক’ বনে গেছেন এবং প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন।
প্রসঙ্গত, সদ্য সচিব পদে পদোন্নতি ও পদায়ন পাওয়া ৯ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৮ জন নিয়মিত ক্যাডারের এবং একজন চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তা। নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি বিলুপ্ত বিশেষায়িত ইকোনমিক ক্যাডার থেকেও দুজনকে সচিব করা হয়েছেÑ যা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তিনজন সচিবের দপ্তর পুনর্বিন্যাস এবং তিনজনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
পদায়নের তালিকায় দেখা যায়, বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে রয়েছেÑ অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর।
প্রজ্ঞাপনে চুক্তিতে নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব নিয়ামত উল্লাহ ভূঁইয়াকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এবং বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের নাসরিন জাহানকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে বদলি করা হয়েছে। সংসদ বিষয়ক সচিবালয়ের সচিব কানিজ মাওলাকে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগে পদায়ন করা হয়েছে। গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সচিব পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৩ জনকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ৯ জন সচিবের মধ্যে বিসিএস ১১তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের মো. দেলোয়ার হোসেনকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে, ১৫ ব্যাচের ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়াকে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ সচিবালয়ে, ফাহমিদা আখতার এনডিসিকে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে এবং ১৭তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা যথাক্রমে কাজী আনোয়ার হোসেনকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগে, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএসএফএ) সাবেক চেয়ারম্যান জাকারিয়া সরকারকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে, মোহা. রায়হান কাওছারকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে, মো. মোখতার আহমেদকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে এবং ইয়াসমীন পারভীন এনডিসিকে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সপ্তম ব্যাচের (প্রশাসন) এসএম এবাদুর রহমানকে এক বছরের চুক্তিতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব করা হয়। প্রশাসনের একটি অংশ মনে করছে, এই নিয়োগে স্বচ্ছতা ও ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তারা সাধারণত নির্দিষ্ট প্রকল্পভিত্তিক কাজ, পরিকল্পনা ও মূল্যায়নে দক্ষ হলেও মাঠ প্রশাসন পরিচালনায় তাদের অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম। ফলে একটি পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক দায়িত্ব পালনে তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এ কারণে ইকনোমিক ক্যাডারের দুজন কর্মকর্তাকে সচিব পদে উন্নীত করা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সাবেক আমলা ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুস সবুর প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, সচিবের কাজ শুধু নীতিনির্ধারণ নয়; আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক নেতৃত্বÑ সবকিছুই সামলাতে হয়। সেখানে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ধরনের নিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে প্রশাসনের কার্যকারিতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সচিব নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনের ভেতরের সূত্র বলছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ ছাত্রজীবন থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী হিসেবে, আবার কেউ বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তারা গোপনে প্রভাবশালী একটি মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে নতুন ক্ষমতাসীনদের অনুগত হয়ে ওঠেন। এই ‘ভোল পাল্টানো’ সংস্কৃতি প্রশাসনের পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই নিয়োগে একজন সাবেক কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিকভাবে সচিব পদে বসানো হয়েছেÑ যিনি অতীতে স্বেচ্ছায় চাকরি ছেড়ে বিদেশি সংস্থায় যোগ দিয়েছিলেন। তাকে নিয়ে আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছিল, যেখানে তার মেধা স্বীকার করা হলেও বিগত সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে উল্লেখ ছিল। এরপরও সেই প্রতিবেদন উপেক্ষা করে তাকে পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। অনেকেই বলছেন, ‘যিনি একবার সিস্টেম ছেড়ে গেছেন, তাকে আবার চুক্তিতে এনে শীর্ষ পদে বসানো হলে মেধাবী ও নিষ্ঠাবান ক্যারিয়ার কর্মকর্তারা কি নিরুৎসাহিত হবেন না?’
সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে সেইসব কর্মকর্তাদের কাছ থেকে, যারা বিগত সরকারের আমলে পদোন্নতি ও পদায়নে বঞ্চিত ছিলেন। একজন বঞ্চিত কর্মকর্তা বলেন, তারা ভেবেছিলেন ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়েছে। তাই এবার বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে অন্তত মেধা ও সততার মূল্যায়ন হবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সরকার বদলেছে, ভাগ্য নয়। তাদের মতে, এই ধরনের সিদ্ধান্ত প্রশাসনের ভেতরে হতাশা ও অনিশ্চয়তা বাড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রযন্ত্রের কার্যকারিতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সচিব পদে নিয়োগ শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে যদি স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও ভারসাম্য নিশ্চিত না হয়, তাহলে তার প্রভাব পড়বে জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও। তাদের মতে, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে পেশাদারত্ব, অভিজ্ঞতা ও সততাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভেতরে যে চাপা অসন্তোষ তৈরি হয়েছে, তা যদি দ্রুত দূর না করা হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।