× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

অ্যাম্বুলেন্স নেই বহু কারাগারে

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১১:৩৪ এএম

অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থ বন্দিদের জরুরি চিকিৎসা পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

অ্যাম্বুলেন্স সংকটের কারণে দেশের কারাগারগুলোতে অসুস্থ বন্দিদের জরুরি চিকিৎসা পরিবহন ঝুঁকির মুখে পড়ছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ

গত বছরের পাঁচ অক্টোবর সকালের কথা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লেন নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছইবুর রহমান (৬০)। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার জানালেন তার মৃত্যু ঘটেছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটের ছইবুর রহমানের ছোট ছেলে হাবিব আলী ও নাতি মিনহাজুল ইসলাম জানান, ছইবুর ছিলেন কানসাটের একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ। কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তারা জানতে পেরেছেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ার পর ছইবুরকে রাজশাহী কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তবে সেখানে পৌঁছার আগেই তার মৃত্যু হয়। হাবিব আলী অভিযোগ করেন, সময়মতো চিকিৎসা না হওয়ায় তার বাবা মারা গেছেন।

কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে এমন মৃত্যুর ঘটনা একটি বা দুটি নয়, বরং অনেক। আর এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ত্বরান্বিত হচ্ছে কারাগারগুলোয় পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স না থাকার কারণে। ফলে অসুস্থ হয়ে পড়া অনেকে রাস্তায়ই মারা যাচ্ছে। কারা প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ তথ্য বলছে, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়. নতুনও নয়। গুরুতর অসুস্থ বন্দিদের উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা হাসপাতাল বা মেডিকেল কলেজে নেওয়ার পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এর একটি বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে কারাগারে পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্সের অভাব। অথচ ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত কয়েকবার নতুন অ্যাম্বুলেন্স কেনার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া প্রস্তাব বারবার আটকে গেছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায়।

এ বিষয়ে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, ~এ নিয়ে আমরা নতুন করে প্রস্তাব পাঠিয়েছি। এর আগে অর্থ মন্ত্রণালয় আর্থিক সীমাবদ্ধতার কথা বলে ফাইল ফেরত পাঠিয়েছিল। ২০২২ সাল থেকে তারা বারবার খুবই প্রয়োজনীয় বেসিক অ্যাম্বুলেন্স চেয়ে আসছেন। অ্যাম্বুলেন্স না থাকায় অনেক সময় অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটছে। এতে তাদের ওপর আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।" তিনি বলেন, “কারা অধিদপ্তর অনেক সময় এই পরিস্থিতি নিয়ে বিব্রত হচ্ছে। অভিযোগ উঠছে বন্দি বিনা চিকিৎসায় মারা গেছে। কিন্তু হাসপাতালে নেওয়ার পথেই যদি সমস্যা হয়, তাহলে কিছু করার থাকে না।”

৭৪ কারাগারে অ্যাম্বুলেন্স মাত্র ২৩টি

সরকারের নথিপত্র সূত্রে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ১৫টি কেন্দ্রীয় ও ৫৯টি জেলা কারাগার রয়েছে। অর্থাৎ মোট কারাগার ৭৪টি। এই কারাগারগুলোর অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ৪৩ হাজার ১৫৭ জন হলেও বাস্তবে বন্দি সংখ্যা প্রায় ৭৮ হাজার। অনেক সময় তা ৯০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু এত বন্দির চিকিৎসা পরিবহনের জন্য রয়েছে মাত্র ২৩টি অ্যাম্বুলেন্স। এগুলোর মধ্যে টিওঅ্যান্ডইভুক্ত অ্যাম্বুলেন্স ১৫টি এবং প্রকল্পের আওতায় পূর্বে পাওয়া ৮টি। অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ কারাগারেই নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স নেই। ফলে অনেক সময়ই অসুস্থ বন্দিদের রিকশা, ভ্যান বা সাধারণ গাড়িতে করে হাসপাতালে পাঠাতে হয়। 

কারা কর্মকর্তারা বলছেন, এমন চিকিৎসা ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি থেকে বেরিয়ে আসতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা বিভাগের নির্দেশে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে ‘অ্যাম্বুলেন্স, নিরাপত্তা সংক্রান্ত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহন সংগ্রহের মাধ্যমে কারা অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্প নেওয়া হয়। এতে প্রাথমিকভাবে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাবের পাশাপাশি পর্যায়ক্রমে দেশের সব কারাগারের জন্য পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স সংগ্রহের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। 

চার বছর ধরে ঝুলে আছে প্রস্তাব

কারা অধিদপ্তর সূত্র জানাচ্ছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রথমবার ১০৭টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পরে বাজেট সংকোচনের নির্দেশ আসে। এরপর পরিকল্পনা সংশোধন করে ৪৬টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও অনুমোদন মেলেনি। পরে নতুন প্রস্তাবে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার পরিকল্পনা করা হয়। সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় প্রায় ২৭-২৮ কোটি টাকা। কিন্তু মাঝে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসসহ চার বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও কোনো অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়নি। নতুন সরকারের আমলে বিষয়টি নিয়ে কারা অধিদপ্তর সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। 

কারা অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, কারা অধিদপ্তরের অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাব অন্তত পাঁচবার ফেরত পাঠানো হয়েছে। এখন এটি আবারও পুনর্বিবেচনার জন্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে।

মৃত্যুর পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (এএসকে)-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে বা পথে মৃত্যু ঘটেছে ১১২ জন বন্দির। কারা অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হাসপাতালে ১,৫৭৭ জন এবং সেখানে যাওয়ার পথে ৪৯১ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে বছরভিত্তিক মৃত্যুর তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে ১৮৫ জন, ২০২৩ সালে ১৫৫, ২০২৪ সালে ১২০ এবং ২০২৫ সালে ১৭২ জন মারা গেছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিসংখ্যান কারাগারের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও মানবাধিকার গবেষক ড. মো. সহিদুজ্জামান বলেন, “কারাগারে থাকা বন্দিরাও রাষ্ট্রের নাগরিক এবং তাদের চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার একটি মৌলিক মানবাধিকার। কারাগারের মতো সংবেদনশীল জায়গায় অ্যাম্বুলেন্স না থাকা ভয়ংকর বিষয়। এর ফলে অপ্রত্যাশিত মৃত্যুঝুঁকি বাড়ে। এটি শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্বের সঙ্গেও জড়িত একটি বিষয়।”

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. গাজী সিরাজুল ইসলাম বলেন, “কারাগারে থাকা বন্দিরা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা নিতে পারেন না। তাই তাদের চিকিৎসাসেবা সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল।’ তার মতে, ‘যদি গুরুতর অসুস্থ বন্দিকে হাসপাতালে নিতে দেরি হয় এবং পথে মৃত্যু ঘটে, তাহলে আইনি প্রশ্নও তৈরি হতে পারে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) কাজী শরীফ বলেন, কারাগার শুধু একটি বন্দিশালা নয়; এটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন প্রশাসনিক স্থাপনা। অসুস্থ বন্দিকে রিকশা বা সাধারণ গাড়িতে হাসপাতালে নেওয়া হলে নিরাপত্তা প্রটোকল বজায় রাখা কঠিন হয়ে যায়। এতে চিকিৎসা ঝুঁকির পাশাপাশি নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ে।

দেখা যাচ্ছে, দেশের কারাগারগুলোতে অ্যাম্বুলেন্স সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা হলেও সমাধানের উদ্যোগ প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে আছে। অথচ ন্যূনতম প্রয়োজন মেটাতে জরুরি ভিত্তিতে ৪৪টি অ্যাম্বুলেন্স কেনার প্রস্তাবও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় থমকে আছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা হাজারো বন্দির জরুরি চিকিৎসা পরিবহন ব্যবস্থা কবে নিশ্চিত হবে।

শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা