নুর মোহাম্মদ মিঠু
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ১০:১৮ এএম
দৌলতদিয়ায় নদীতে পড়ে যাওয়া বাসের নিখোঁজ যাত্রীদের খোঁজে শুক্রবার তৃতীয় দিনের মতো তল্লাশি চালান ডুবুরিরা। ছবি: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
ফেরিতে ওঠার আগে যানবাহন থেকে যাত্রী নামানো বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে নিয়ম স্পষ্ট, নির্দেশনাও স্পষ্টÑ কিন্তু বাস্তবে এই নির্দেশনা কাগুজেই সীমাবদ্ধ। দেশের নৌপথে এই নিরাপত্তা বিধি কার্যত অকার্যকর। আর সেই অবহেলার চরম মূল্য গুনতে হয়েছে পদ্মার বুকে। গত ২৫ মার্চ বিকালে যাত্রীসহ ফেরিতে ওঠার সময় সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি বাস পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে যায়। চোখের পলকে নদীর গভীরতায় তলিয়ে নিভে যায় ২৬টি তাজা প্রাণ।
দুর্ঘটনায় স্পষ্টভাবে নিয়ম ভঙ্গের একাধিক চিত্রের কথা উল্লেখ করে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনাটি নিছক দুর্ঘটনা নয়। এটি সরাসরি নিয়ম-নির্দেশনা অমান্যের ফল। তাদের দাবি, এ দুর্ঘটনার দায় এড়ানোর সুযোগ সংশ্লিষ্ট কারোরই নেই।
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র বলছে, দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, নজরদারির ঘাটতি এবং নিয়ম ভাঙার কারণেই রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে বাসডুবির ঘটনা ঘটেছে। ফেরীতে ওঠার আগে যাত্রী নামানোর স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও দৌলতদিয়াসহ খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের কোনো ফেরিঘাটেই এ নিয়ম মানা হয় না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ম মানলে হয়তো এত প্রাণহানি হতো না। নৌ নির্দেশনা মূলত ঘাট সংশ্লিষ্টদের গাফিলতিতেই সীমাবদ্ধ হয়ে রয়েছে কাগজে।
পদ্মায় সৌহার্দ্য পরিবহনের যাত্রীবাহী বাসটি নদীর গভীরে তলিয়ে যাওয়ার পরই স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেন ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরিরা। উদ্ধার অভিযানে স্থানীয় জনসাধারণ ও কোস্ট গার্ডের ডুবুরিরাও অংশন নেন। দুর্ঘটনাকবলিত বাসটি থেকে বেরিয়ে যাত্রীদের কেউ কেউ সাঁতরে তীরে উঠলেও অধিকাংশই বাসের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে একে একে উদ্ধার হয় তাদের নিথর দেহ।
বাংলাদেশ নৌ আইন অনুযায়ী লঞ্চঘাট বা ফেরিঘাটে একটি ফেরি আনলোড হওয়ার পরই যাত্রীবাহী যানবাহন ফেরিতে উঠতে পারে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সড়ক বন্ধ থাকা সত্ত্বেও বাসটি সেই পথ ধরে যাওয়ার পরই সোজা নদীতে পড়ে যায়। যাত্রী ওঠানামার নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিআইডব্লিউটিএর পক্ষ থেকে কোনো বিধি মানা হয়নি। ঘাটকর্মীরাও বলছেন, ‘ফেরি প্রস্তুত না থাকলেও বাসটি সামনে চলে আসে এবং নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়।’ অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল আইন ২০১৯ অনুযায়ী যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্ব, কিন্তু এই ঘটনায় তাদেরও কোনো কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়েনি।
শুধু তাই নয়, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের অভিযোগ লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারের নির্দেশনাও ছিল উপেক্ষিত। পন্টুনে ছিল না কোনো নিরাপত্তা রেলিং, শক্ত গার্ড রেল বা জরুরি স্টপার। স্থানীয়রা বলেন, ঘাটে নামার রাস্তায় বড় গর্ত ও উঁচু ঢিবির কারণে বাসটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি পানিতে পড়ে যায়। সরেজমিন দেখা গেছে, অ্যাপ্রোচ সড়কের অবস্থা একেবারেই ভগ্নদশা, যেন দুর্ঘটনার ফাঁদ পেতে রাখা।
এদিকে দুর্ঘটনার পর দৌলতদিয়া ঘাটে দায়িত্বরত বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তারাও যেন মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তাদের বিরুদ্ধে উদ্ধার অভিযানে অনীহা, পাশে থাকা উদ্ধারকারী জাহাজ হামজাকে না পাঠানো, অন্যান্য সংস্থাকে সহযোগিতা না করা, এমন একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এমনকি দীর্ঘদিনের দাবির পরও পন্টুনে রেলিং না বসানো, অ্যাপ্রোচ সড়ক মেরামতের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়েও তারা মুখ খুলছেন না। উল্টো দায় চাপানোর চেষ্টা চলছে বিআইডব্লিউটিসির ওপর। জানা যায়, ২০১৯ সালে দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া ঘাট উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পের জন্য ১৩৫১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বরাদ্দের সাত বছর পরও প্রকল্পের কোনো দৃশ্যমান কাজ দেখা যায়নি, যদিও এরই মধ্যে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৯৫ থেকে ১০০ কোটি টাকা।
তবে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে একাধিক ত্রুটির কথা স্বীকার করে বলেছেন, ‘পন্টুনে শিগগিরই রেলিং বসানো হবে এবং সংশ্লিষ্টদের আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।’
এদিকে দুর্ঘটনার পর নির্দেশনা অমান্যের বিষয়ে জানার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তার একান্ত সচিব সেলিম আহমেদ ও ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল কুদ্দুস জানান, ‘আগামী রোববার মন্ত্রণালয়ে এলে স্যারের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন। এ ছাড়া সম্ভব না।’
সরকার দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে দুটি আলাদা তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেবেন। তবে সাধারণের প্রশ্ন, এই কমিটি কি সত্যিই দায় নির্ধারণ করবে, নাকি অন্যান্য তদন্ত কমিটির মতোই এবারও চাপা পড়ে যাবে প্রতিবেদন?