তানভীর হাসান
প্রকাশ : ২৮ মার্চ ২০২৬ ০৮:৩৫ এএম
আইজিপি, র্যাব ডিজি, এসবি, এপিবিএন ও সিআইডি প্রধানের পর এবার পুলিশের মাঠ ও মধ্যম পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল আসছে। গ্রাফিক্স: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
আইজিপি, র্যাব ডিজি, এসবি, এপিবিএন ও সিআইডি প্রধানের পর এবার পুলিশের মাঠ ও মধ্যম পর্যায়ে বড় ধরনের রদবদল আসছে। রদবদল ঘটতে চলেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, চারটি রেঞ্জের ডিআইজি, পুলিশ সদর দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাসহ ২৯ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদে। ভোটের আগে লটারির মাধ্যমে পদায়ন প্রক্রিয়া এবং কয়েকজন কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী সপ্তাহেই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খুলনা রেঞ্জের বর্তমান ডিআইজি বিগত আওয়ামী লীগের শাসনামলে দুই জেলার এসপি ছিলেন। কিন্তু তার বাড়ি বগুড়া হওয়ার তথ্য ব্যবহার করে নির্বাচনের পর ভোল পাল্টে তিনি সরকারদলীয় হয়ে গেছেন। সিলেটের বিশ্বনাথেও বাউল গানের আসরে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় পুলিশ সুপারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহের বর্তমান এসপির ভূমিকাও ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এ রকম আরও অনেক এসপির বিরুদ্ধে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের হয়ে ভূমিকা রাখার অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে এই রদবদল অনিবার্য হয়ে উঠেছে।
সূত্র জানায়, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী খোদা বখস চৌধুরী ও পুলিশ সদর দপ্তরের তৎকালীন একজন ডিআইজি (বর্তমান অতিরিক্ত আইজিপি) তাদের অনুগত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন পছন্দের জায়গায় পোস্টিং দিয়ে গেছেন। এই কর্মকর্তারা তাদের মর্জি অনুযায়ী কাজ করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন।
অন্যদিকে বিগত আওয়ামী শাসনামলের সুবিধাভোগী অনেক কর্মকর্তাও দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকার পর নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই ভোল পাল্টে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধাজনক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যেই এদের চিহ্নিত করেছে এবং তাদের তালিকা করে সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। এ তালিকা অনুযায়ীই রদবদল হতে চলেছে বলে জানিয়েছে পুলিশের ঊর্ধ্বতন সূত্র।
পুলিশের একাধিক সূত্র বলছে, এর আগে লটারির কথা বলা হলেও সেটি নিরপেক্ষ ছিল না। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চাহিদা অনুযায়ীই তখন বেশিরভাগ পদায়ন ঘটেছিল। নির্বাচনের আগে ও পরে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে সেই প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ২৪ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনায় ৬৪ জেলার এসপি পদের পদায়ন চূড়ান্ত করতে প্রথমবারের মতো ‘ম্যানুয়াল লটারি’ পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়। লটারির আগে ২৫, ২৭ ও ২৮তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে একটি ‘ফিট লিস্ট’ তৈরি করা হয়। এরপর ২৬ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে ৬৪ জেলার নতুন এসপি পদায়নের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। কিন্তু বিগত সংসদ নির্বাচন পরিচালনার সময় খুলনা রেঞ্জ ও সিলেট, হবিগঞ্জ, রংপুর, ঝিনাইদহসহ অন্তত ২৯ জন এসপির রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এতে লটারির মাধ্যমে পদায়ন প্রক্রিয়াও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
পুলিশ সূত্র জানায়, লটারির পুরো প্রক্রিয়াই ছিল অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত। কারণ ক্যাটাগরি নির্ধারণেই স্বচ্ছতা রক্ষা করা হয়নি। ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলায় কর্মরত কর্মকর্তারা পুনরায় ‘এ’ ক্যাটাগরির জেলাতেই বদলি হয়েছেন। ফলে সুবিধাভোগীদের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিতই থাকে। অন্যদিকে নির্বাচনের আগে জেলায় পোস্টিং পেতে আগ্রহী ছিলেন, এমন অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে লটারির তালিকায়ই রাখা হয়নি। এতে তারা নিজেদের বঞ্চিত মনে করছেন। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের ঘনিষ্ঠ বা সুবিধাভোগী হিসেবে পরিচিত অনেক কর্মকর্তাকেও এই লটারির মাধ্যমে পুনর্বাসন করা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একটি সূত্র জানায়, লটারি অনুষ্ঠানের সময় ভারপ্রাপ্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী উপস্থিত থাকলেও নেপথ্যে ছিলেন খোদা বখস ও তৎকালীন একজন ডিআইজি। এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু এত উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের উপস্থিতির পরও লটারি প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক থামেনি। উল্টো সময় যত গড়াচ্ছে, ক্ষোভ তত তীব্র হচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘লটারির কারণে এসপি পদে নিয়োগ পাওয়া ছয়জন কর্মকর্তাকে যোগদান থেকেই বিরত রাখা হয়Ñ যা একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এতে পুরো প্রক্রিয়ার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে।’ তিনি জানান, গত ১৫ বছর ধরে ‘ডাম্পিং পোস্টিং’য়ে থাকা অনেক কর্মকর্তাকেও এই লটারির তালিকার বাইরে রাখা হয়। ফলে বঞ্চিত কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে হতাশা দেখা দিয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে কিছু না বললেও অভ্যন্তরীণ আলোচনায় লটারিকে ‘প্রহসন’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে অনেকের মতে, ‘ক্ষোভ প্রশমনের চেষ্টা’ হিসেবে পুলিশে রদবদল ঘটতে চলেছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, আগের বিতর্কিত পদায়নের প্রভাব কাটাতে এবং মাঠপর্যায়ে নতুন বার্তা দিতে এ পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
যে কারণই হোক, একযোগে এত বড় পরিসরে রদবদল পুলিশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বিশেষ করে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বাহিনীর ভেতরে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, আস্থা এবং নিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনার মতো বড় চ্যালেঞ্জ থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে এ রদবদল বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে অনেক আবার মনে করছেন, এই রদবদল শুধু প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়Ñ এটি পুলিশের অভ্যন্তরীণ সংকট, বিতর্ক এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের প্রতিফলন।