রাজবাড়ী প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৬ মার্চ ২০২৬ ১৮:৫৯ পিএম
দৌলতিয়া বাসডুবিতে মা, ভাগ্নের সাথে মারা গেছেন জাবি শিক্ষার্থী আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান। ছবি: ফেসবুক থেকে
২১ জেলার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাট—যেখানে প্রতিদিন মানুষের ভিড়, ব্যস্ততা আর যাতায়াতের স্রোত। সেই চেনা ঘাটই বুধবার বিকালে রূপ নেয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডির মঞ্চে। পদ্মা নদীতে বাস ডুবে প্রাণ হারান ২৭ যাত্রী। তাদেরই একজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান—স্বপ্নবাজ, মেধাবী ও প্রাণবন্ত এক তরুণ, যার জীবন থেমে গেল নির্মম বাস্তবতায়।
ঈদের ছুটি কাটিয়ে পরিবারের সঙ্গে আনন্দময় সময় শেষে ঢাকায় ফিরছিলেন রাইয়ান। সঙ্গে ছিলেন তার মা রেহানা আক্তার, চিকিৎসক বোন ডা. নুসরাত জাহান খান এবং আদরের আট বছরের ভাগ্নে তাজবিদ। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। দৌলতদিয়া ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসটি হঠাৎ পদ্মার গভীরে তলিয়ে যায়—মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায় একটি পরিবার।
রাইয়ান, তার মা এবং ছোট্ট তাজবিদ আর ফিরে আসেননি। জীবনের কঠিনতম বাস্তবতা নিয়ে ফিরে আসেন শুধু বোন নুসরাত—একসঙ্গে হারান মা, ভাই ও সন্তানকে। তার চোখে এখন শুধু শোক, শূন্যতা আর অসহায় নিঃশব্দ আর্তনাদ।
আহনাফ তাহমিদ খান রাইয়ান ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। মেধা, যুক্তি আর স্বপ্নে ভরপুর এই তরুণ সহপাঠীদের কাছে ছিলেন আলাদা এক পরিচিত নাম। স্কুলজীবন থেকেই বিতর্কচর্চায় যুক্ত ছিলেন, জাতীয় পর্যায়ে অংশ নিয়ে অর্জন করেছেন সাফল্য। বিশ্ববিদ্যালয়েও বিতর্ক আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে যুক্তির আলোয় সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
শুধু একাডেমিক পড়াশোনাতেই নয়, সামাজিক দায়িত্ববোধেও ছিলেন অগ্রণী। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনসহ নানা সামাজিক উদ্যোগে সরব ছিলেন রাইয়ান। অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা, সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া—এসব ছিল তার নিত্যদিনের কাজ। বন্ধু ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন অনুপ্রেরণার প্রতীক।
কিন্তু সেই স্বপ্নবাজ তরুণের জীবন থেমে গেল হঠাৎই—একটি অব্যবস্থাপনার নির্মম পরিণতিতে।
দুর্ঘটনার রাতেই মরদেহ পৌঁছে দেওয়া হয় তাদের বাড়িতে। পুরো বাড়িজুড়ে তখন শুধু কান্না, আহাজারি আর শোকের ভারী নীরবতা। মাত্র কয়েক মাস আগেই গত ডিসেম্বর মাসে বাবাকে হারিয়েছিল পরিবারটি। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই আবার এমন আঘাত, যেন একের পর এক দুঃখের ঢেউ ভেঙে পড়ছে তাদের জীবনে।
রাইয়ানের সহপাঠী রাজিয়া বলেন, “ক্লাস ফাইভ থেকে আমরা একসঙ্গে বিতর্ক করেছি। রাইয়ান ভাই সবসময় বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখতেন। এমন একজন মানুষকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ। এটা শুধু দুর্ঘটনা নয়, অব্যবস্থাপনার ফল”।
রাজবাড়ী ডিবেট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক উদ্দিন বলেন, “রাইয়ান ছিল অত্যন্ত মেধাবী ও সম্ভাবনাময়। সে একজন অর্থনীতিবিদ হতে চেয়েছিল। সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে সে খুবই সক্রিয় ছিল। তার এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না”।
এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাজবাড়ী জেলা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য অ্যাডভোকেট গোলাম মোস্তফা। শোক জানিয়েছে জাবি প্রশাসনও।